নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ-সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে ও জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীব মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে ৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বোরবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে তাকে আত্মীয়-স্বজনদের জিম্মায় দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে সজীবকে ডিবিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার বক্তব্য যাচাই বাছাই করার পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

সজীবকে আটক ও ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কারও মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটকের পর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এমপিপুত্রের জন্য এক রকম আইন আর সাধারণের জন্য আইনের প্রয়োগ আরেক রকম-সেটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিএনপি’র হাই কমান্ডের উচিত সজীবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া। আবার কারও মতে, যাচাই-বছাই করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজীবকে ছেড়ে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক ও নাগরিক কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রফিউর রাব্বি বলেন, ‘সংসদ সদস্যের ছেলেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটেকর পর ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে ভুল বার্তা যাবে। যারা চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মে জড়িত তারা উৎসাহিত হবে। এ ঘটনায় আইন যে সবার জন্য সমান নয়, সেটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংসদ-সদস্যের ছেলে বলেই কি তাকে ছেড়ে দেয়া হলো- সেই প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের বেলায় কি আইনের প্রয়োগ এমন হতো? বিগত সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি মন্ত্রী, এমপির ছেলে-মেয়েদের বেলায় আইন প্রয়োগ এক ধরনের। সাধারণ মানুষের জন্য আইন আরেক ধরনের। এই সরকারের আমলেও যদি আইনের প্রয়োগ পূর্বের মতো হয়, তাবে সরকারকে আখেরে গিয়ে পস্তাতে হবে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি দুই ভাবে দেখি। একটি হলো দল, আরেকটি সরকার। একজন এমপির পুত্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠায় দল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। একজন মানুষ দীর্ঘ ২০-৩০ বছর দলীয় কর্মকাণ্ড করে দলীয় পদ-পদবি পায়। কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দল যখন পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করে- এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে অভিযোগ যাচাই বাছাইয়ের জন্য আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আবার প্রয়োজন মনে করেছে ছেড়ে দিয়েছে।’ এ ব্যাপারে সংসদ-সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের বক্তব্য হলো, ‘আমার ছেলে কেন চাঁদাবাজি করতে যাবে? আমার কি সম্পদ কম আছে। সামাজিকভাবে আমাকে ও সজীবকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি মহল ষড়যন্ত্রে নেমেছে। আমার দলের কয়েকজন নেতাও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত। ডিবি পুলিশ সজীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের অভিযোগের প্রমাণ পায়নি বলেই তাকে ছেড়ে দিয়েছে।’

জানা যায়, মেঘনা শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী, সিদ্ধিগঞ্জের ওয়াসা প্রজেক্ট, আদমজী ইপিজেড ভেতরে অবস্থিত একটি গার্মেন্ট কারখানাকে কেন্দ্র করে সজীবের বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ স্বারষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জমা পড়ে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিজ বাসা থেকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সজীবকে আটক করে। এরপর নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিএমপির ডিবি কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

সজীবের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ : সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জে এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা সজীবের কাছে এখন জিম্মি। বাবার প্রভাব খটিয়ে ধরাকে সরাজ্ঞান করেন তিনি। এলাকায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জমি বেচাকেনার দালালি, ওয়েস্টেজ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক সরবরাহ, পরিবহণ সরবরাহ, বিভিন্ন কারখানার বালু ভরাট, মেঘনা নদীতে থেকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন, বাল্কহেডে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, গার্মেন্টের ঝুটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, মামলাবাণিজ্যসহ সবকিছুতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ সজীবের হাতে। তার প্রভাবে নিজ দলের নেতাকর্মীরা কোণঠাসা। এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয় সজীব বা তার মনোনিত ব্যক্তির মাধ্যমে করতে হয়।

সজীবের এই অপকর্মের অন্যতম সহযোগী আবুল বাশার বাদশা, সেলিম হোসেন দিপু. মাসুদ রানা, জসিম বাবু এবং হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ডালিম। মূলত এই পাঁচজন সজীবের পক্ষে পুরো সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ দাপিয়ে বেড়ায়। প্রতিটি খাত তাদের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিটি ইউনিয়ন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে উঠানো চাঁদা তারা সজীবের হাতে তুলে দেয়।

সরেজমিন মেঘনা শিল্পাঞ্চল ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেঘনা শিল্পাঞ্চলে অর্ধশত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়া এখানে রয়েছে বেশ কিছু বিদ্যুৎ উপাদন কেন্দ্র। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ উপাদন কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ, মাটি ভরাট সব কিছু সজীবের হাতে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েস্টেজ মালামালের ব্যবসা, শ্রমিক সরবরাহ, জমি বেচাকেনা, বালু ভরাট, কোম্পানির হয়ে মানুষের জমি জোরপূর্বক ভরাট, বাউন্ডারি দেওয়াল টেনে দেওয়াসহ বিভিন্ন অপকর্মের নেতৃত্ব দেয় সজীবের পক্ষে মাসুদ রানা, যুবদল নেতা আলী নুর, আব্দুল জলিল জুয়েল, মাসুদ, জসিম বাবু, মুকবুল, শাহনুর, নাজির, আল আমিন প্রধান ও আরিফ। এদের মধ্যে ভয়ংকর হলো-আবুল বাশার বাদশা। নারায়ণগঞ্জ সাব রেজিস্ট্রি অফিসে এই আবুল বাশার বাদশা লোক লাগিয়ে রেখেছে, যাতে অন্য কেউ কোনো কোম্পানির কাছে জমি বিক্রি করতে না পারে। কোনো কোম্পানির কাছে জমি ক্রয় করলে তাদের হাত দিয়ে বেচাকেনা করতে হয়।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরদিন ৬ আগস্ট থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত মেঘনা টোলপ্লাজায় রশিদ ছাড়া টাকা আদায় করে সে টাকা লুটে নেন সজীব ও তার বাহিনী। তিন দিনে প্রায় আড়াই কোটি টাকা লুটে নেন তারা। মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে ২০-২৫টি ড্রেজার বসিয়ে রাতের আঁধারে বালু লুটের অভিযোগ রয়েছে সজীবের বিরুদ্ধে। মেঘনা গ্রুপের সব ইউনিটের ঝুট, রিজেক্ট টাইলস, সিমেন্টের ব্যাগ, শিপইয়ার্ডের লোহা নাম মাত্র টাকায়, কখনো কখনো টাকা ছাড়াই লুটে নেয় সজীব বাহিনী।

অভিযোগ রয়েছে, আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় আল মোস্তফা গ্রুপের প্রধান ফটক বন্ধ করে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন সজীব। টাকা পাওয়ার পরদিনই বেড়া তুলে নেওয়া হয়। এ কাজে সজীবকে সহযোগিতা করেন সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সদস্য আলী নূর, পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল। পানি শোধন প্লান্ট ওয়াসার জমি থেকে রাতের আঁধারে সজীবের নেতৃত্বে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মামুন মিয়া ও যুবদল নেতা সোহাগ মিয়া বালু কেটে বিক্রি করছেন।

এ ব্যাপারে মাসুম রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নই। সোনারগাঁয়ের মানুষে সঙ্গে কথা বলে তদন্ত করে দেখতে পারেন।’ বিএনপি নেতা আব্দুল জলিল বলেন, ‘সজীবের হয়ে কোনো গ্রুপের টাকা পয়সা লেনদেনের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই।’

কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে থাবা : এখানকার রহিম স্টিল মিলস, অনন্ত গার্মেন্টস, এসএফ গার্মেন্টসের ঝুটের ব্যবসা, বেঙ্গল গ্রুপ, অলিম্পিক ব্যাটারি, পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ সজীব সিন্ডিকেটের হাতে। এসব কারখানার ওয়েস্টেজ মালামাল নিয়ন্ত্রণ করে লিটন হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি সজীবের ঘনিষ্ঠ কুতুবপুরের ডালিম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাঁচপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা জানান, কাঁচপুরে যারা দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তারা কেউ মিল ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারেছন না। যারা এমপি বা তার ছেলের ঘনিষ্ঠ তারাই সব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিএনপির কোনো আন্দোলন সংগ্রামে না থেকেও হত্যা মামলার আসামি ডালিম এখন কাঁচপুরের ডন। কাঁচপুর-সিদ্ধিরগঞ্জে সজীবের পক্ষে ট্রাক স্ট্যান্ড, মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাতে চাঁদাবাজিসহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে ডালিম, রুবেল ও সেলিম হোসেন দীপু। অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডালিমে সঙ্গে কথা বলার জন্য তার ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews