বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের খবর যখন সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মা-বাবার মনে ভয় তৈরি হয়। নিজের সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সবাই। সম্প্রতি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তরের যাচাইয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদনে পুলিশের এই তথ্য তুলে ধরে। শুধু ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ বললে যেমন পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না, তেমনি এখনো যারা ফিরে আসেনি তাদের বিষয়টিও কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। মনে হয়, এই ঘটনাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যার একটি বড় অংশ আড়ালে রেখে দেব। শিশুরা কেন নিখোঁজ হচ্ছে, কোন পরিবারগুলো বেশি ঝুঁকিতে আছে, বাবা-মা কোথায় থাকেন, তাঁরা কী কাজ করেন, শিশুটিকে দেখাশোনা করার মতো কেউ আছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরও আমাদের খুঁজতে হবে। কারণ অনেক সময় একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এর পেছনে থাকে পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ঘাঁতি।
বাংলাদেশের নি¤œ আয়ের পরিবারগুলোর দিকে একটু তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। একজন বাবা হয়তো রিকশা চালান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন কিংবা গার্মেন্টে চাকরি করেন। কেউ দিনমজুর, কেউ ফুটপাতে ছোঁ ব্যবসা করেন। তাঁদের জীবনের প্রতিটি দিন হিসাব করে চলতে হয়। বাবা যদি একদিন কাজে না যান, সেই দিনের আয় কমে যায়; মা কাজে না গেলে সংসারের আরেকটি প্রয়োজন অপূর্ণ থেকে যায়। এই পরিবারের শিশুকে সারাদিন দেখাশোনা করার জন্য আলাদা একজন মানুষ রাখার সামর্থ্য থাকে না। তখন শিশুটি কোথায় থাকে? কখনো ঘরের সামনে, কখনো বড় ভাই-বোনের কাছে, কখনো প্রতিবেশীর নজরদারিতে। ছোট্ট শিশুটি খেলতে খেলতে একটু দূরে চলে যেতে পারে, কারও পেছনে পেছনে হাঁটতে পারে, কোনো খাবার বা খেলনার প্রলোভনে অপরিচিত কারও সঙ্গে যেতে পারে, কিংবা পরিবারের সঙ্গে কোথাও গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। এত ছোঁ একটি শিশুর নিজের নাম, ঠিকানা বা বাবা-মায়ের ঠিকানা বলার সক্ষমতা না থাকলে তাকে খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্যেও শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা এবং একা চলাচলের সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো কারণের কথা বলা হয়েছে। এই বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাই শুধু অপরাধের আশঙ্কা নয়, শিশুর পরিচর্যা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এখানে একটি কঠিন প্রশ্ন আছে, আমরা কি দরিদ্র বাবা-মাকে বলব, তাঁরা কাজে যাবেন না, সারাদিন সন্তানকে দেখাশোনা করবেন? তাঁরা যদি কাজে না যান, সংসারে খাবার আসবে কীভাবে? যে বাবা রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, তিনি যদি সন্তানকে দেখার জন্য প্রতিদিন ঘরে বসে থাকেন, তাহলে তাঁর পরিবার চলবে কীভাবে? যে মা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন, তিনি কাজ ছেড়ে দিলে সন্তানকে হয়তো কাছে রাখতে পারবেন, কিন্তু সেই সন্তানের খাবারের ব্যবস্থা করবেন কীভাবে? তাই শুধু বাবা-মায়ের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে সমাধান হবে না। দরকার এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে বাবা-মা কাজও করতে পারবেন এবং সন্তানও নিরাপদে থাকবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা এবং কোনো অনৈতিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জা বা ভয়ে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার মতো কারণ পাওয়া গেছে। এখানে আমাদের পরিবারকেও নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তানকে শুধু স্কুলে পাঠানো, খাওয়ানো ও প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। সে কী ভাবছে, কার সঙ্গে মিশছে, স্কুলে কোনো চাপ আছে কিনা, পরিবারের কোনো বিষয়ে সে কষ্ট পাচ্ছে কিনা, এসব জানার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে কিশোর বয়সে একজন সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা অনেক সময় তাকে একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
সমাধানের ক্ষেত্রে মনে হয়, স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ শিশুযতেœর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে বস্তি, শ্রমজীবী এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে কমিউনিটি চাইল্ডকেয়ার সেন্টার করা দরকার। সেখানে শিশুরা দিনের নির্দিষ্ট সময় নিরাপদ পরিবেশে থাকবে। বাবা-মা কাজে যাবেন, আবার সন্তান কোথায় আছে তা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ কমবে। স্কুলকেও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। শিশুর স্কুল শুরু ও শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে বাবা-মায়ের কর্মঘণ্টার মিল সবসময় থাকে না। তাই স্কুলের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য নিরাপদ আফটার-স্কুল কেয়ার চালু করা গেলে অনেক পরিবারের সমস্যা কমতে পারে। শিশু স্কুল থেকে বের হয়ে রাস্তায় ঘুরবে না; বাবা-মা কাজ শেষ করে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
এক্ষেত্রে লন্ডনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু দিক আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। আমি লন্ডনে থাকার কারণে এখানকার কিছু ব্যবস্থা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। যুক্তরাজ্যে যোগ্য পরিবারগুলো ‘চাইল্ড বেনিফিট’-এর মতো সহায়তা পায়। আবার ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইংল্যান্ডে ‘ইউনিভার্সাল ক্রেডিট’ গ্রহণকারী পরিবারের সব শিশুর জন্য বিনামূল্যে স্কুল খাবারের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব ব্যবস্থা পরিবারকে তাদের সন্তান পালনের দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে না, কিন্তু কঠিন সময়ে রাষ্ট্র পরিবারের ওপর থাকা কিছু চাপ ভাগ করে নেয়। অবশ্য লন্ডন আর বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, করব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো আমাদের চেয়ে অনেক আলাদা। তাই সেখানকার কোনো ব্যবস্থা হুবহু বাংলাদেশে প্রয়োগ করার কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়। তবে মূল ধারণাটি আমাদের গ্রহণ করতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা ও পরিবারের কল্যাণকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশে এটি করতে হলে প্রথমে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যারা কর দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন, তাঁদের নিয়মিত কর দিতে হবে। রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়াতে হবে। সেই রাজস্ব যেন সঠিকভাবে জনগণের কাজে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে হলে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন।
বর্তমান সরকার ধীরে ধীরে এমন একটি সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগোতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে থাকার কারণে সেখানকার প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অনেক কিছু কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, সব ক্ষেত্রেই মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়। তবে একটি দেশ পরিবর্তন করা একদিনের কাজ নয়। একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিকল্পনা তৈরি, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। তাই আমরা যেমন সরকারের কাছে কাজ চাইব, তেমনি ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সহযোগিতাও দিতে হবে। সমালোচনা থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, জবাবদিহিও থাকবে; কিন্তু দেশের স্বার্থে কার্যকর উদ্যোগকে সহযোগিতা করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
শিশু নিখোঁজের সমস্যার সমাধানও তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। পুলিশকে আরও দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে, পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে, স্কুলকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে এবং রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন রিকশাচালক বাবা সকালে কাজে বের হয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে, তাঁর সন্তান নিরাপদে আছে। একজন গার্মেন্টকর্মী মা জানবেন, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে তিনি তাঁর সন্তানকে ঠিক আগের জায়গাতেই পাবেন। একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তানও যেন নিরাপদে বড় হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
উন্নয়ন শুধু বড় রাস্তা, সেতু বা ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন সাধারণ মানুষ তাঁর সন্তানকে নিরাপদে বড় করতে পারবেন। একটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো, এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে শিশুটি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে আসে। কারণ, একটি শিশু যখন হারিয়ে যায়, তখন শুধু একজন সন্তান হারায় না একটি পরিবার; তার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক: রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট।