বিপন্ন মাছের অস্তিত্ব রক্ষাসহ মৎস্য সম্পদ সমৃদ্ধকরণে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা গত ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সাতক্ষীরা থেকে দক্ষিণের কুয়াকাটা হয়ে পূর্ব-দক্ষিণের টেকনাফ পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় তটরেখা এবং সমুদ্র অভ্যন্তরের ২শ নটিক্যল মাইল পর্যন্ত ‘একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা’র ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬০ বর্গ কিলোমিটারে ছোট-বড় নানা প্রকারের ৪৭৫ প্রজাতির মাছ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সমুদ্র এলাকায় ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া, ৫ প্রজাতির কচ্ছপ ও ১৩ প্রজাতির প্রবালসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী আমাদের সমুদ্রসম্পদকে সমৃদ্ধ করেছে।

সমুদ্র এলাকায় ৫৮ দিন মৎস্য আহরণে এ নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও র‌্যাব ছাড়াও নৌ এবং জেলা পুলিশকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে। এলক্ষ্যে ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং বরিশাল ও চট্টগ্রামে জেলে, মৎস্যজীবী ও গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, সমুদ্র এলাকায় প্রায় ৫.১৬ লাখ জেলে ২৫৫টি বাণিজ্যিক ট্রলার ছাড়াও প্রায় ৩৩ হাজার ইঞ্জিনচালিত ও ৩৫ হাজার ইঞ্জিনবিহীন নৌকায় নানা সরঞ্জামের সাহায্যে মৎস্য আহরণ করে থাকে। অধিদপ্তরের মতে, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত প্রায় ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে এককভাবে সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৩০ লাখ টনের মতো। সাগরে আহরিত মাছের ৪৫ ভাগ ইলিশ, ৪৯ ভাগ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ এবং চিংড়ির পরিমাণ ৬ ভাগ।

তবে ২০১৫ সাল থেকে বঙ্গোপসাগরে আমাদের একান্ত অথনৈতিক এলাকায় মৎস্য আহরণে বিভিন্ন মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা শুরুর পরে মাছের প্রপ্যতা ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের প্রায় ৬ লাখ টন থেকে ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৭ লাখ ৬০ হাজার টনে উন্নীত হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে তা ক্রম হ্রাসমান। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে দেশের সামুদ্রিক মাছের প্রাপ্যতা ৬ দশমিক ৭০ লাখ টনে হ্রাস পেয়ে পরবর্তী অর্থ বছরে তা ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬২৩ টনে নেমে এসেছে। মৎস্য অধিদদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দু’ বছরের ব্যবধানে সাগর এলাকায় মাছের প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে প্রায় সাড়ে ৭৭ হাজার টন। সাগরে মাছের আহরণজনিত উৎপাদন হ্রাসের হার ১০ ভাগেরও বেশি। এমনকি সাগরে ইলিশের উৎপাদনও ২০২১-২২ সালে ৩,২১,৮৭১ টন থেকে ’২৩-২৪ অর্থ বছরে ২,৮০,৯১৮ টনে হ্রাস পেয়েছে, যা দু’ বছর আগের তুলনায় প্রায় ৪১ হাজার টন কম এবং আগের দুটি বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৮ ভাগ কম বলে জানা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে আলাপ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, সাগরে মাছে আহরণজনিত উৎপাদন হ্রাসের বিষয়টি সত্যি হলেও এর সাথে অনেক বিষয় জড়িত। আমরা সেসব বিষয়ে নিবিড়ভাবে অনুসন্ধানসহ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি। অতিসম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে আমাদের অর্থনৈতিক সীমায়ও বিস্তারিত জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। তার ফলাফলের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়ে কর্মকর্তাগণ বলেন, ‘শংকিত হবার কিছু নেই। তবে বিজ্ঞানীদের পরামর্শে সরকার মৎস্য আহরণ সীমিতকরণসহ যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তা অনুসরণ করলে আমাদের দুঃশ্চিন্তার কিছু থাকবে না’ বলেও জানান দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ।
বিশে^র সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ অফুরন্ত নয়। তাই সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য সকল ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তাকে বিবেচনায় রেখে বিগত বছরগুলোতে আহরণ বৃদ্ধি পেলেও প্রজাতির গুণগতমান অবনমন লক্ষ করছেন বিজ্ঞানীগণ। এর ফলে মৎস্য সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্নস্তরের অংশীজনের মাছের সীমিত সম্পদ নিয়ে অসম প্রতিযোগিতা এবং আয় বৈষম্যও বেড়েছে।

মৎস্য বিজ্ঞানীগণ ‘বিশাল এলাকার জলরাশির মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং সুষ্ঠু ও বিজ্ঞানসম্মত সহনশীল আহরণ নিশ্চিত করে বছরের পর বছর সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন অব্যাহত এবং বংশবৃদ্ধিসহ মজুদ অক্ষুণœ রাখার ওপর গুরুত্ব’ দিয়েছেন। এক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীগণ আমাদের একান্ত বাস্তবতা ও পরিবেশকে বিবেচনায় নিয়ে সামুদ্রিক মৎস্যব্যবস্থাপনা নীতি ও কৌশল প্রণয়নেরও তাগিদ দিয়েছেন।
এমনকি সাগরে ১৫ এপ্রিল থেকে ১২ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধের সময়কালের অধিকাংশই ঝড়Ñঝঞ্ঝাসহ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় অতিবাহিত হবে। ইতোপূর্বে উপকূলের বিশাল জেলে ও মৎস্যজীবীদের অভিযোগ ছিল, ‘বাংলদেশের সমুদ্র এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও এসময়ে ভারতে নিষিদ্ধ না থাকায় সে দেশের জেলেরা অবাধে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় প্রবেশ করে মাছ লুটে নেয়’। এক্ষেত্রে মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকেই প্রতিবেশী দেশের সাথে সমতা রেখে সাগরে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধর সময় পুনর্বিবেচনায় নিয়ে গত বছর থেকে তা এগিয়ে আনার পাশাপাশি ৬৫ দিনে স্থলে ৫৮ দিনে হ্রাস করা হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে এখন ১৫ এপ্রিল থেকে ৪৫ দিন মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে মিয়ানমার সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জুন থেকে আগষ্ট পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সে দেশের জেলেদের আগ্রাসন অব্যাহত থাকার আশংকা রয়েছে।

বঙ্গোপাসাগরে ৫৮ দিনের আহরণ নিষিদ্ধের সময়ে উপকূলের ১৪টি জেলার ৬৯টি উপজেলার ৩ লাখ ১২ হাজার ৫শ জেলে পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি করে ৫৮ দিনের জন্য ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি করে সর্বমোট ২৪ হাজার ১৬৬ টন চাল বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করেছে সরকার। আগামী ৩১ মে’র মধ্যে এসব চাল বিতরণ সম্পন্ন করারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

লেখক: বরিশাল ব্যুরো প্রধান, দৈনিক ইনকিলাব



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews