আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠটা পরিচিত মারারা স্টেডিয়াম নামে। স্টেডিয়ামের বয়স খুব বেশি নয়, মাত্র ৩৫ বছর। ডারউইনের এ মাঠেই তিন দিন পর বাংলাদেশ আবার অস্ট্রেলিয়ার মাঠে টেস্ট খেলবে ২৩ বছর পর। যে মাঠ বাংলাদেশের জন্য ফিরিয়ে আনছে অনেক স্মৃতি। মারারায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসের শুরু বাংলাদেশকে দিয়েই। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড ট্যুর সিরিজের প্রথম টেস্ট হয়েছে মারারা স্টেডিয়ামে, যেখানে বাংলাদেশ হেরেছিল ইনিংস ও ১৩২ রানের ব্যবধানে। এক বছর পর, ২০০৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই মাঠে দ্বিতীয় ও সর্বশেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জেতে ১৪৯ রানে।
২০০৮ সালে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশ দল আবারও যায় ডারউইনে, খেলেছে মারারায়। একটি ওয়ানডে বাংলাদেশ এই মাঠে খেলেছিল ২০০৩ সালের সফরেও। সব মিলিয়ে চারটি ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট খেলে বাংলাদেশই মারারা স্টেডিয়ামে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা বিদেশি দল। ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ ১৭ বছরের বিরতি শেষে ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি দিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফেরে মারারায়। এরপর এবার খেলবে বাংলাদেশ দল।
এমন একটি ভেন্যুতে খেলতে রোমাঞ্চিত বাংরাদেশ দল। সেই দলের একজন তাসকিন আহমেদ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২০১২ সালের যুব বিশ্বকাপ খেলেছিলেন এই পেসার। পরে ২০১৫ সালে ওয়ানডে আর ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তার একই অভিজ্ঞতা ছিল। অস্ট্রেলিয়ায় খেলাটা তাই তাসকিনের জন্য নতুন নয়। তবে এবার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে তাসকিনের- প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামবেন তিনি। বাংলাদেশ যখন ২০০৩ সালে সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিল, তাসকিনের তখন বয়স ছিল মাত্র আট বছর। যেকোনো পেসারের জন্যই স্বপ্নের অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলা। গতকাল ডারউইনের সংবাদ সম্মেলনে সেই রোমাঞ্চ টের পাওয়া গেল তাসকিনের কণ্ঠেও, ‘অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলতে এখানে আসতে পেরে সত্যি সম্মানিত বোধ করছি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা দল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’
১৩ আগস্ট ডারউইনে প্রথম টেস্টে মাঠে নামবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া, ২২ আগস্ট ম্যাকাইতে হবে দ্বিতীয় টেস্ট। এই দুই ম্যাচে বাংলাদেশের কাজটা কতটা কঠিন হবে, তা কিছুটা টের পাওয়া গেছে প্রস্তুতি ম্যাচেই। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে তারা ম্যাচ হেরেছে ইনিংস ব্যবধানে। তবে আপাতত সেই ধাক্কা ভুলে সামনের দিকে তাকাচ্ছেন তাসকিন, ‘হেরে যাওয়ার অনুভূতিটা অবশ্যই সুখকর ছিল না। তবে ক্রিকেটে এমনটা হতেই পারে। আমরা এখনো এখানকার কন্ডিশন ও উইকেটের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ম্যাচটা হেরে গেলেও ভালো একটা প্রস্তুতি হয়েছে।’ তবে অস্ট্রেলিয়ায় দুই টেস্টের সিরিজটা যে সহজ হবে না, তা মনে করিয়ে দিয়েছেন তাসকিন, ‘তাদের মাটিতে ও তাদের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেট খেলা আমাদের সব ক্রিকেটারের জন্য অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। আমাদের জন্য সিরিজটা নিশ্চিতভাবেই সহজ হবে না, তবে আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে আশাবাদী।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এখন পর্যন্ত ৬ টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে মিরপুরে বাংলাদেশ জয় পেয়েছিল। বাকি ৫ ম্যাচেই হারতে হয়েছে, ৩টি আবার ইনিংস ব্যবধানে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০০৩ সালের সর্বশেষ সিরিজেও দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। যদিও দুই দলের সর্বশেষ দেখায় সুখস্মৃতি আছে বাংলাদেশের, মিরপুরে গত জুনে ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ জিতেছিল ২-১ ব্যবধানে। ওই সিরিজ থেকেও দুই টেস্টের আগে অনুপ্রেরণা নিতে চান তাসকিন, ‘সবাই মিলে দারুণ একটা সিরিজ খেলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় পেয়েছিলাম, তাদের বিপক্ষে খেলতে আমাদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে সেটা। তবে হোম ও অ্যাওয়ে কন্ডিশনের মধ্যে তো বড় ফারাক থাকেই, দেখা যাক এবার কী হয়।’
তবে স্বাগতিকদের কাছেও ডারউইনের উইকেট হয়ে উঠেছে কিছুটা অচেনা। ম্যাচের আগে এখনো উইকেট দেখেননি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা ব্যাটার ট্রাভিস হেড। ফলে ম্যাচে পরিস্থিতি বুঝে পরিকল্পনা সাজানোর কথাই বলছেন তিনি। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে হেড বলেন, ‘আমি এখনো উইকেট দেখিনি, কারণ আমরা আজ সকালে এখানে এসেছি। তবে গত বছর এখানে টি-টোয়েন্টি খেলেছি এবং উইকেট ভালো ছিল। গত বছর এ দলের ম্যাচগুলোতেও উইকেট ভালো ছিল বলে শুনেছি। তাই এই মুহূর্তে এটি আমাদের জন্য অজানা।’ উইকেট দেখার পরই ম্যাচের সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে চান হেড, ‘আগামী কয়েক দিনে আমরা উইকেট দেখব এবং এটি কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা করার চেষ্টা করব। বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের হয়তো পুরো সপ্তাহজুড়েই সমস্যা সমাধান করতে হবে। তবে আমি নিশ্চিত, দুই দলের জন্যই বিষয়টি একই রকম হবে। গত কয়েক বছরে আমরা যখনই এখানে এসেছি, উইকেট ভালো ছিল।’
বাংলাদেশের জন্য এই সিরিজটি যেমন দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার কাছেও এটি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে প্রতিপক্ষের নাম বা ভেন্যু বিবেচনায় নিয়ে কোনোভাবেই সিরিজটিকে হালকাভাবে দেখছে না অস্ট্রেলিয়া। হেডের কথাতেও সেটিই স্পষ্ট, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের কারণে প্রতিটি সিরিজই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপনাকে ভালো খেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ অস্ট্রেলিয়ার একজনের জন্যও এই মাঠে টেস্ট খেলাটা হবে অন্য রকম আবেগের। প্রথম টেস্টের একাদশে থাকলে ডারউইনের ঘরের ছেলে জ্যাক ওয়েদারাল্ড প্রথমবার টেস্ট খেলতে নামবেন চেনা দর্শকদের সামনে। কে জানত, ২৩ বছর আগে যে বালক ওয়েদারাল্ড বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দেখেছিল দর্শক হয়ে, সেই ওয়েদারাল্ডই নর্দার্ন টেরিটোরির প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার হবেন একদিন!