মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সামরিক শক্তি আরও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। হাজার হাজার মার্কিন প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। প্যারাট্রুপাররা নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে রওনা দিয়েছে। ইরানে ট্রাম্পের স্থল অভিযানের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা কয়েক হাজার অতিরিক্ত নাবিক, মেরিন ও ‘স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স’ -এর সঙ্গে যুক্ত হবে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন মেরিন সদস্য ওই অঞ্চলে পৌঁছেছেন। এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি না খুললেও ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে চান। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলছেন, নিজস্ব শর্ত ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই যুদ্ধের অবসান হবে। গতকাল ইরানের ইসফাহানে গোলাবারুদের ডিপোতে বাংকার বাস্টার বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে কুয়েতের তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরান।
গতকাল ভোরে ইসফাহানে একটি বিশাল গোলাবারুদের ডিপোতে ২ হাজার পাউন্ডের (৯০৭ কেজি) ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা জানান, এ হামলায় বিপুলসংখ্যক ‘পেনিট্রেটর মিউনিশন’ বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসকারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ইরানে ক্যানসারের ওষুধ কারখানায় হামলা চালিয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনী। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পায়াব রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জাভেদ জারিফ বলেন, ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় দেশটির অন্যতম বৃহত্তম একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে ক্যানসাররোধী, চেতনানাশক এবং অন্যান্য ওষুধ উৎপাদন করা হয়। শয়তানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে মরিয়া হামলাকারীরা ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। পাল্টা অভিযানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বন্দরের বহির্নোঙরে জ্বালানি তেল বোঝাই একটি বিশাল জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে জাহাজটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং এর মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, দুবাই বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় ‘আল-সালমি’ নামের জাহাজটিতে এ হামলা চালানো হয়। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। জাহাজটির ২৪জন ক্রু সদস্য নিরাপদ রয়েছেন। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত এমকিও-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান। দেশটির ইসফাহান শহরের আকাশে গোয়ান্দা নজরদারি চালানোর সময় এটি ভূপাতিত করা হয় বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
অন্যদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে ইসরায়েলের ৪ সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। এক বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছেন।
ইরান হরমুজ প্রণালি না খুললেও যুদ্ধ বন্ধ করতে চান ট্রাম্প, প্রতিবেদন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান শেষ করতে আগ্রহী। ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প মনে করছেন এই মুহূর্তে জলপথটি জোরপূর্বক উন্মুক্ত করার চেষ্টা করলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টারা মনে করছেন, মার্কিন সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধ্বংস করা।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, এই লক্ষ্য সফলভাবে পূরণ হয়েছে। এখন তারা বৈরী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করবেন। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ বাণিজ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে সমাধানের পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়ে তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিকেই এখন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
নিজস্ব শর্ত ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই যুদ্ধের অবসান হবে, ইরানের প্রেসিডেন্ট : যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসনের চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসী যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত ইরানের নিজস্ব শর্ত ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের সর্বশেষ অবস্থা এবং জরুরি সেবাগুলো সচল রাখার বিষয়ে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি বলেন, যারা দৃঢ়ভাবে দেশ রক্ষা করছে এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলছে তাদের এই প্রতিরোধ ও প্রচেষ্টা জাতির গৌরবময় ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানে ৩০০টিরও বেশি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং ৭৬০ স্কুলে হামলা : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ৯০ হাজার ৬৩টি আবাসিক ইউনিট, ৩০৭টি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা কেন্দ্র এবং ৭৬০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশটিতে চলমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে ২৪ হাজারের বেশি মানুষ।