আমানুর রহমান
নির্বাচনী উৎসবের কোলাহল থেমেছে। পোস্টার-ব্যানারের ভিড় সরে গিয়ে এখন সময় এসেছে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। এই ‘গণরায়’ বা ম্যান্ডেট শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসানো নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত। নবনির্বাচিত সরকার এবং সংসদ সদস্যদের কাছে এখন দেশ ও জাতির প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। জনগণ চায় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বরং দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং কাঠামোগত পরিবর্তন।
নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো সুশাসন। উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সুশাসনের অভাবে সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাতে অনেক সময় বাধা সৃষ্টি হয়। জাতি প্রত্যাশা করে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। সকল দলের অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখার মানসিকতা এবং দুর্নীতি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা, তারা বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। সিন্ডিকেট ভাঙা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃচ্ছ্রসাধন নীতির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে মানুষের জীবনমান মাপা যায় না; বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনলেই নতুন সরকারের অর্থনীতির আসল পরীক্ষা হবে।
সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভূমিকা নিয়ে জনগণের মনে দীর্ঘদিনের কিছু ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে। জনগণ চায়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু ঢাকায় ফ্ল্যাট বা প্লট বরাদ্দের পেছনে না ছুটে, বরং নিজের এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সহযাত্রী হবেন। সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা। সংসদকে কার্যকর করতে হলে বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। জনগণ আর ‘হাঁ-না’ ভোটের সংসদ দেখতে চায় না; তারা যুক্তিনির্ভর প্রাণবন্ত সংসদ চায়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘ মিছিল দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা এমন শিক্ষানীতি ও শিল্পনীতি গ্রহণ করবে যা কর্মমুখী হবে। মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ রোধে দেশে গবেষণার সুযোগ ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। তরুণরা যেন হতাশা থেকে মাদকের দিকে না ঝুঁকে, পরিবর্তে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
নির্বাচন আসলে বিভেদ তৈরি করে। কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই রাষ্ট্রনায়কের কাজ। বিজয়ী দলকে মনে রাখতে হবে, তারা শুধু তাদের ভোটারদের সরকার নয়, বরং সমগ্র ১৭ কোটি মানুষের সরকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গণতন্ত্র মানে শুধু পাঁচ বছর পর পর ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে হলো জবাবদিহিতা। নবনির্বাচিত সরকার ও সংসদ সদস্যদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার মালিক হল জনগণ। আজকের এই বিজয় তখনই সার্থক হবে, যখন সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে কথা বলতে পারবে, ন্যায়বিচার পাবে এবং রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। আগামী পাঁচ বছর হোক বৈষম্যহীন, উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর; এটাই নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জাতির বিনীত প্রত্যাশা।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট।