ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফন শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ককে বিদায় জানানোর অনুষ্ঠান ছিল না। লাখো মানুষের ঢল দেখিয়ে দিয়েছে, তাঁর গড়ে তোলা রাজনৈতিক ও আদর্শিক কাঠামো এখনো অটুট।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি রোববার (১২ জুলাই) জানিয়েছে,রাশিয়ার রুডিএন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনুষদের প্রভাষক এবং রুশ সরকারের অধীন ফাইন্যান্সিয়াল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞ ফারহাদ ইব্রাগিমভ তাঁর ভাষ্যে এমন মূল্যায়ন করেছেন।

গত ৯ জুলাই খামেনিকে তাঁর জন্মশহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়। এর আগে তেহরান, কোম, ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় কয়েক দিন ধরে শোকানুষ্ঠান চলে। সবশেষে মাশহাদে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের বিশাল সমাগম হয়।

১৯৮৯ সাল থেকে টানা প্রায় চার দশক ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি দেশটির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত পথ নির্ধারণ করেছেন। তারও আগে তিনি ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরানের বিপ্লব-পরবর্তী ইতিহাস, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাইরের চাপ, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিকাশ এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ নীতির সাথে তাঁর নেতৃত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

অনেক ইরানির কাছে খামেনি শুধু রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ধর্মীয় পথপ্রদর্শক, রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থপতি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় তাঁর শহীদ হওয়াকে সমর্থকদের কাছে রাজনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি ধর্মীয় শোকেও পরিণত হয়েছে। সরকারি ও জনপরিসরে তাঁকে ক্রমেই ‘মহান শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জানাজায় মানুষের বিপুল উপস্থিতিকে কেবল সরকারি উদ্যোগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মতে, লাখো মানুষকে শুধু নির্দেশ দিয়ে রাস্তায় নামানো সম্ভব নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কফিনবাহী গাড়ির এক ঝলক দেখার চেষ্টা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগেরই প্রকাশ।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, জানাজায় প্রায় আড়াই কোটি মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে তেহরানের কিছু সূত্র প্রায় দুই কোটি মানুষের কথা বলেছে। বিরোধী গোষ্ঠী ও ইসরাইলপন্থী প্রচারণামাধ্যম এ সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স-এর মতো পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমও বিশাল জনসমাগমের বিষয়টি স্বীকার করেছে। ইব্রাগিমভের বলেন, সরকারি হিসাব কিছুটা কম-বেশি হলেও কয়েক মিলিয়ন মানুষের উপস্থিতিই প্রমাণ করে, খামেনির আদর্শ এখনো সমাজের বড় একটি অংশের সমর্থন পায়।

তবে এ কথা ঠিক ইরানি সমাজ একরৈখিক নয়। অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক অসন্তোষ, নিষেধাজ্ঞার চাপ ও সংস্কারের দাবি রয়েছে। কিন্তু একই সাথে সমাজকে পুরোপুরি দমিয়ে রাখা একটি কাঠামো হিসেবেও ইরানকে দেখার সুযোগ নেই। বহু ইরানির কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র শুধু একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা, বাইরের চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং নিজেদের সভ্যতাগত পরিচয় রক্ষার প্রতীক।

পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি অনাস্থা, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা এবং স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে ইরানকে প্রতিষ্ঠার নীতিতে খামেনি অটল ছিলেন। তাঁর আমলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ায়, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা জোরদার করে এবং প্রতিরোধনীতিকে পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে পরিণত করে।

খামেনির মৃত্যুর পর অনেকেই নেতৃত্বের সংকট বা রাষ্ট্রযন্ত্রে অচলাবস্থার আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু শোকানুষ্ঠান ও রাষ্ট্রের কার্যক্রম উল্টো দেখিয়েছে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর মতে, খামেনির উত্তরাধিকার কেবল একজন নেতার স্মৃতি নয়; এটি একটি আদর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তির নাম। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ‘দুর্বল ইরান’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং দেখিয়েছে, খামেনির মৃত্যু হলেও তাঁর গড়ে তোলা রাজনৈতিক প্রকল্প এখনো বহাল আছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews