(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সুদ উচ্ছেদের ফলে বণ্টনক্ষেত্রে যে জুলুম ও বে-ইনসাফি দেখা দিয়েছিল তার অবসান ঘটে, বন্ধ হয়ে যায় দারিদ্র্য বৃদ্ধির পথ। বস্তুত সুদ এমনি একটি ধ্বংসকারী অর্থ বিষয়ক রীতি যে, ভোগবাদী পাশ্চাত্যেও এর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত রয়েছে। এরিস্টটল সুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘একটা টাকা আর একটা টাকার জন্মদান করতে পারে না।’ প্লেটোও সুদকে সমর্থন করেননি। পেটার্স বলেন, ‘অর্থ হল বন্ধ্যা এবং এর উপর সুদ ধার্য করা অযৌক্তিক।’ সুদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘আল্লাহ্ সুদকে হারাম করেছেন।’ মহানবী (সা.) সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কার্যাদির মাঝে যাবতীয় অসৎ কাজের ভেতর সুদকে সবচেয়ে পাপের জিনিস বলে গণ্য করেছেন। মূলত সুদের মত সমাজ-বিধ্বংসী অর্থনৈতিক হাতিয়ার আর দুটি নেই। মহানবী (সা.) সুদের ব্যাপারে এতই কঠোর ছিলেন যে, তিনি বলেন, ‘সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক ও সাক্ষী অভিশপ্ত। তারা সকলেই এক পর্যায়ভুক্ত।’ এ ছাড়াও সুদের ব্যাপারে তাঁর আরও কঠোর বাণী রয়েছে।

নিয়ন্ত্রিত ব্যয় বিধান: অপরিমিত সম্পদ ব্যয় দারিদ্র্যের একটি অন্যতম কারণ। মহানবী (সা.) সম্পদ ব্যয়ে মিতাচারী হবার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ও পবিত্র কুরআনে মিতব্যয়ী হতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘প্রাপ্য দেবে আত্মীয়-স্বজনকে এবং মিসকিন ও পর্যটককেও। কিন্তু কিছুতেই অপব্যয় করবে না।’ আল্লাহ্ আরও বলেন, ‘অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ আল্লাহ্ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থাবলম্বনের কথা বলেছেন এভাবে, ‘আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না, কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়।’ মহানবী (সা.)-ও সম্পদ ব্যয়ে মধ্যম পন্থাবলম্বনের কথা বলেছেন।

পতিত ভূমি আবাদের নির্দেশ: মহানবী (সা.) পতিত ভূমি আবাদ করণকে দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম মাধ্যমরূপে গ্রহণ করেছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, ‘যখন রাসুল (সা.) মদীনায় পৌঁছেন তখন তিনি সেখানকার যে সকল জমি, যেগুলোতে পানি পৌঁছাত না এবং পতিত পড়ে থাকত সেগুলো নিজ ইচ্ছামত মুসলমানদের মাঝে বণ্টন করে দেন।’ ভূমিতেই মহান আল্লাহ্ মানুষের প্রাচুর্যের ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ্ বলেন, ‘সে মহান সত্তা আল্লাহ্ যমীনকে তোমাদের জন্য নরম সমতল অনুগত বানিয়ে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা সে যমীনের সর্বদিক ও পরতে-পরতে পৌঁছাতে চেষ্টা কর, আর সেখান থেকে পাওয়া আল্লাহর রিজিক তোমরা ভক্ষণ কর। আর শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই তোমাদের উত্থান ঘটবে।’ এ জন্যই মহানবী (সা.) পতিত ভূমি আবাদে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং এ ব্যাপারে সবাইকে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, ‘যার অতিরিক্ত জমি রয়েছে সে তা হয় নিজে চাষ করবে, অন্যথায় তার কোন ভাইয়ের দ্বারা চাষ করাবে অথবা তাকে চাষ করতে দেবে।’ মহানবী (সা.) পতিত জমি কেবলমাত্র চাষ করতেই বলেননি, বরং উৎসাহ দেয়ার জন্য পতিত জমিতে চাষকারীর মালিকানারও স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে লোক পোড়ো ও অনাবাদী জমি আবাদ ও চাষযোগ্য করে নেবে সে তার মালিক হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে জলাশয়ে কোন মুসলিম কোনদিন পদার্পণ করেনি, সেখানে যে প্রথম পৌঁছাবে তার অধিকার তারই।’ পতিত জমি আবাদকে মহানবী (সা.) এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে, তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি বলেন, ‘জমি আবাদ না করলে তিনবছর পর তার কোন অধিকার থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর যে শুধু সীমানা নির্ধারণ করে রেখেছে অথচ তার চাষ করেনি, তিন বছর পর তাতে তার আর কোন অধিকার নেই।’

দানশীলতার বিকাশ: দারিদ্র্য বিমোচনে মহানবী (সা.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হল মুসলমানদের মাঝে দানশীলতার বিকাশ। এর মাধ্যমে মহানবী (সা.) দারিদ্র্য নিরসনে এক যুগান্তকারী ইতিহাস স্থাপন করেন। মানুষের চরিত্রের একটা বড় দিক হল সে সবকিছু নিজের কাছে রাখতে চায়। কৃপণতার কুঞ্চনে ক্রমেই সে সঙ্কুচিত হতে থাকে। এ গ্রাসের প্রবণতা দূর করে মহানবী (সা.) দানশীলতার প্রবর্তন করেন। মহানবী (সা.) কৃপণতাকে নিকৃষ্ট মানসিক রোগ বলে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং প্রয়োজনাতিরিক্ত সব কিছু দান করে দেয়ার জন্য মহানবী (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ্ বলেন, ‘লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, তারা কি ব্যয় করবে? বলে দিন উদ্ধৃত সবকিছু।’ আল্লাহ্ আরও বলেন, ‘এবং তাদের ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক রয়েছে।’ মহানবী (সা.) দানশীলতার প্রতি সবাইকে উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি যদি তোমার উদ্বৃত্ত সম্পদ আল্লাহর ওয়াস্তে দান করো তা তোমার জন্য উত্তম। আর যদি তা থেকে বিরত থাক তবে তাতে তোমার অকল্যাণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমার ধন-সম্পদে সমাজের অধিকার রয়েছে।’ মহানবী (সা.)-এর সময়ে তাঁর সাহাবী (রা)-রা দানশীলতার চরম দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যকার দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। ইমাম মুসলিম উল্লেখ করেছেন, ‘রাসূল (সা.) একবার একটি নওমুসলিম গোত্রের জন্য সাহায্যের কথা বললে সবাই তাদের জন্য ছুটে আসেন। কেউ খাদ্য, কেউ কাপড় নিয়ে আসেন। আর একজন আনসারী বেশ বড় পরিমাণের অর্থ দান করেন। একটি ঘটনার কথাতো সুবিদিত যে, বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুসলমানরাই উদারতার সঙ্গে খাদ্য ও বস্ত্র দান করেছিলেন।’

যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন: যাকাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। এতে শুধু ব্যক্তি বা সমাজই নয়, রাষ্ট্রও সমানভাবে উপকৃত হয়। দারিদ্র্য মানবতার এক নম্বর শত্রু। যে কোন দেশের ও সমাজের জন্য এটা একটা জটিল সমস্যা। দারিদ্র্যের ফলে সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, পরিণামে দেখা দেয় মারাত্মক সামাজিক সংঘাত। অধিকাংশ সামাজিক অপরাধও ঘটে দারিদ্র্যের জন্য। এ সকল সমস্যার সমাধানকল্পে মহানবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে যাকাতের বিধান প্রাপ্ত হন। যাকাত মহান আল্লাহর হুকুম এবং অন্যতম মৌলিক ফরজ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের এটি একটি। যাকাত ইসলামী অর্থনীতির মূল স্তম্ভ ও ইসলামী রাষ্ট্রের রাজস্বের অন্যতম উৎস। এটি একটি সমাজকল্যাণমূলক বিধান।

আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশে কোন ব্যক্তি কর্তৃক কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তার কোন নির্দিষ্ট মালের নির্ধারিত অংশের স্বত্ব অর্পণ করাকে যাকাত বলা হয়। পবিত্র কুরআনের বিরাশি স্থানে যাকাতের কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তোমরা যে যাকাত প্রদান কর তাই বৃদ্ধি পায়।’ যাকাত দানের ফলে যাকাত দাতার অবশিষ্ট ধন ও সেইসঙ্গে তার আত্মারও পরিশুদ্ধি ঘটে। আল্লাহ্ বলেন, ‘আপনি এদের সম্পদ থেকে যাকাত দিন। এর মাধ্যমে এদের পবিত্র করুন, এদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর আপনার দু’আ তাদের জন্য প্রশান্তি স্বরূপ।’ মহানবী (সা.) যাকাত দানের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সওয়াবের আশায় যাকাত দেবে সে তার সওয়াব অবশ্যই পাবে। যে ব্যক্তি পরিশোধ করতে নারাজ হবে আমরা তা অবশ্যই আদায় করব এবং তার মালের অর্ধেক (জরিমানা স্বরূপ) বাজেয়াপ্ত করব। এটা আমাদের প্রাচুর্যময় মহান আল্লাহর সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তসমূহের অন্যতম।’

ফিতরার প্রবর্তন: পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদের দিন বিত্তশালীদের উপর গরিব-দুঃখীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে যে বিশেষ দানের নির্দেশ রয়েছে তাকে সাদকাতুল ফিতর বলা হয়। সাদকাতুল ফিতর সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, ‘হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) মুসলমানদের প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন ব্যক্তি, নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, সকলের উপর সাদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। যাকাতের তুলনায় ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত অনেকাংশে সহজ ও শিথিল। প্রত্যেক বিত্তবানকে তার নিজের এবং পরিবারবর্গ ও পোষ্যদের পক্ষ থেকে ফিতর আদায় করতে হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত অর্থ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য সমাজে সুষম-ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর অর্থ-ব্যবস্থার প্রচলনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন। (সমাপ্ত)

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews