দেশের অর্থনীতিতে একদিকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও সংকট, অন্যদিকে অপার সম্ভাবনার আশাবাদ মূর্ত হয়ে উঠেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রথম বার্ষিক জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে। অনেক সংকট, প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি আমাদের ইতিহাসের বৃহত্তম জাতীয় বাজেট। পতিত স্বৈরাচার দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ও আর্থিক সেক্টরে সীমাহীন লুটপাট, দখলবাজি ও অর্থপাচারের মধ্য দিয়ে দেশকে দেউলিয়াত্বের শেষপ্রান্তে রেখে পালিয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি সঙ্গতকারণেই কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে তার সম্ভাবনার সোপানে নিয়ে যেতে সম্ভাব্য সবকিছুই করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা গ্রহণ করেছেন। তবে আশার কথা এই যে, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশের কৃষি উৎপাদন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত রেমিটেন্স প্রবাহ এবং গার্মেন্ট রফতানির ভলিউম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক ধারায় গতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, শ্লথ গতিতে হলেও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলার তথা অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম মেয়াদকালের মধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা ট্রিলিয়ন ডলারে পদার্পণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে চান। তিনি ২০৩৪ সাল নাগাদ দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যেতে কাজ শুরু করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, বাংলাদেশে বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের লুটপাট ও অর্থপাচারে ঘনীভূত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে যুদ্ধজনিত সংকট আরো জটিল করে তুলেছে। কথায় বলে, সমুদ্রের উত্তাল অবস্থায়ই দক্ষ নাবিকের পরিচয় পাওয়া যায়। একটি সংকটাপন্ন অবস্থায় তারেক রহমানের টিম দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা প্রত্যাশিত মাত্রায় সফল না হলেও লুটপাট, অর্থপাচারের লাগাম টানার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বিগত অর্থবছরে দেশে গড় মাথাপিছু আয় ২,৭৬৯ ডলার থেকে বেড়ে চলতি অর্থবছরে তা ৩,০২০ ডলারে উঠেছে, প্রবৃদ্ধির হিসাবে যা ৩.৪৯ শতাংশ থেকে ৪.১৪ শতাংশ। বিগত স্বৈরাচারী আমলে দেশের পরিসংখ্যান নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছে অস্বচ্ছতা ও আস্থাহীনতা তৈরি করেছিল। তাই, সরকার এখন পরিসংখ্যান বিভাগের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন রয়েছে। বিএনপি সরকারে যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম সাইফুর রহমান, তখন পরিসংখ্যান নিয়ে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না। বলা বাহুল্য, অস্বচ্ছ, মিথ্যা তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে পরিসংখ্যানের উন্নয়ন দেখিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজির দিন শেষ। এখনকার পরিসংখ্যানে অধরা ও আকাশ-কুসুম প্রত্যাশা ও গোঁজামিলের কোনো সুযোগ নেই। এখনকার পরিসংখ্যান ও প্রবৃদ্ধির হিসাব উন্নয়ন অংশীদার ও সহযোগীদের সমর্থন ও আস্থা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। গতকাল প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিখাতের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৪০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২৫ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। আইএমএফও ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এসব ঋণ সহায়তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল প্রকাশিত আরেকটি রিপোর্টে দেখা যায়, গত চারমাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানি ১১.২৪ ভাগ কমেছে। রেমিটেন্স প্রবাহে কিছুটা উন্নতি ছাড়া ভালো খবর আর কোথাও নেই। এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে তিনি অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উত্তরণের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উন্নয়ন সহযোগী ও কৌশলগত অংশীদারদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শক্ত ও আস্থাপূর্ণ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে। তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে শীঘ্রই মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বড় ও সম্ভাবনাময় বৈদেশিক কর্মসংস্থান বা শ্রমবাজার হিসেবে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে এ খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে তারেক রহমানের এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লেভরভের সাথে দ্বিপাক্ষিক ফলপ্রসূ আলোচনায় কৌশলগত অংশীদারিত্বের পাশপাশি বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। বিশ্বের অন্যতম ফ্যাশন রিটেইল গ্রুপ ইন্ডিটেক্সের আঞ্চলিক প্রধান জেভিয়ার কার্লোস সান্তোন্জা অলসিনা বলেছেন, পণ্যের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর আরএমজি রফতানিকারক দেশে পরিণত হতে পারে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বাজেট বলে গণ্য করছে সরকার। বিগত সময়ে উন্নয়ন বাজেটে অপ্রয়োজনীয়, রাজনৈতিক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল অর্থের অপচয় করা হয়েছে। এখন সে ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের উন্নয়ন ও জনবান্ধব বাজেট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে সচেষ্ট হবে বলেই আমরা আশাবাদী। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং পরিকল্পনামন্ত্রণালয়ে আব্দুল মঈন খানের দায়িত্ব পালনকালে সময়োপযোগী পরিকল্পনায় অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এশিয়ার রাইজিং টাইগার বলে আখ্যায়িত হয়েছিল। সেই ধারা আবার ফিরবে, সেটা আশা করা হচ্ছে। আগামীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। চীন আমাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশীদার। আশা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এখন আইএমএফ, এডিবি, জাইকার মতো সংস্থাগুলো হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সরকার ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উত্তরণের পাশাপাশি চীন-জাপান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বে নতুন উচ্চতা অর্জনে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।