খাদের কিনারে থাকা রাষ্ট্রকে টেনে তুলতে কেবল দৃশ্যমান অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংস্কারই যথেষ্ট নয়; এর নেপথ্যে তথ্য বাজারের গভীর ব্যর্থতা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও অপরিহার্য। ‘সত্য’ মূলত একটি ‘পাবলিক গুড’, যা টিকিয়ে রাখতে পারলে পুরো সমাজের জন্য বিশাল ‘পজিটিভ এক্সটার্নালিটি’ বা ইতিবাচক বহিঃপ্রভাব তৈরি হয়। কিন্তু স্টিগলিটজের (২০০১) ‘অসম তথ্য’ এবং হাল আমলের এআই প্রোপাগান্ডার কারণে আজ এই সম্পদের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত। মিডিয়ায় অনুগত বুদ্ধিজীবী ও সাইবার প্রপাগা-া নেটওয়ার্ক মূলত চমস্কির (১৯৮৮) ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ বা সম্মতি উৎপাদনের কারখানা হিসেবে কাজ করে। এদের মূল লক্ষ্যই হলো অলিগার্কির লুটপাটকে বৈধতা দেওয়া এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তিকে সুপরিকল্পিতভাবে ভিলেন হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরা। অতএব, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও স্নায়ুবিজ্ঞানের নিরিখে তথ্য বাজারের একাংশ (বিশেষত এআই প্রোপাগান্ডা) দ্বারা সৃষ্ট ‘জ্ঞানগত পক্ষাঘাত’ চিহ্নিত করে, তা মোকাবিলায় সত্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি কাঠামোগত রূপরেখা প্রস্তাব করাই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।

বর্তমান ‘পোস্ট-ট্রুথ’ যুগে এই চক্রটি এক নতুন ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। এখন বস্তুনিষ্ঠ সত্যের চেয়ে মানুষের আবেগ, ছড়ানো গুজব, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমিক বুস্টিং এবং সুসংগঠিত বট-নেটওয়ার্ক অনেক বেশি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠী যে একধরনের গভীর জ্ঞানগত পক্ষাঘাত বা চিন্তার অচলাবস্থার শিকার, তা কেবল নৈতিক অধঃপতন বা রাজনৈতিক মেরুকরণের ফল নয়। বরং এটি হলো আচরণগত অর্থনীতি, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর পুঁজিবাদের এক জটিল মিশ্রণের পরিণতি। এটি তথ্য বাজারের একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা, যার কারণে আমাদের সামাজিক মূলধন বা পারস্পরিক আস্থার ওপর এক ভয়াবহ নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব (নেগেটিভ এক্সটার্নালিটি) পড়ছে।

এর পেছনের বিজ্ঞানটি বুঝতে হলে আমাদের স্নায়ু-রাজনৈতিক অর্থনীতির গভীরে যেতে হবে। ওয়েস্টেন (২০০৭) তাঁর ‘দ্য পলিটিক্যাল ব্রেইন’ বইটিতে দেখিয়েছেন যে, মানুষের রাজনৈতিক পছন্দ বা প্রতিক্রিয়া কখনোই পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর নয়; বরং তা আবেগ দ্বারা পরিচালিত স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। আর আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলোকে ঠিক এভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। জুবফ (২০১৯) তাঁর ‘দ্য এজ অব সার্ভিল্যান্স ক্যাপিটালিজম’ বইয়ে যেমনটি বলেছেন, অ্যালগরিদমগুলো মূলত নজরদারি পুঁজিবাদের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই অ্যালগরিদমগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ নামক অংশটিকে নিশানা করে। অ্যামিগডালা হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা যেকোনো হুমকি, ভয়, ক্ষোভ বা চরম উত্তেজনার মতো তীব্র আবেগে খুব দ্রুত সাড়া দেয়। বিপরীতে মস্তিষ্কের ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ তুলনামূলক ধীরে ও যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে যেকোনো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যখন ক্রমাগত মানুষকে বিভক্ত করে এমন কনটেন্টগুলোকে সামনে আনে, তখন তা মস্তিষ্কে আবেগের আধিপত্য বা ‘অ্যামিগডালা-ডমিন্যান্স’ তৈরি করে।

গোলম্যান (১৯৯৫) তাঁর ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বইয়ে এই অবস্থাকে ‘অ্যামিগডালা হাইজ্যাকিং’ বা আবেগের কাছে জিম্মি হওয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। নোবেলজয়ী কাহ্নেম্যানের (২০১১) ‘দ্বৈত-প্রক্রিয়া’ তত্ত্ব অনুযায়ী, এই হাইজ্যাকিংয়ের ফলে মানুষের দ্রুত ও আবেগ-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় চিন্তার স্তর বা ‘সিস্টেম-১’ পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে। তখন ধীর, যৌক্তিক ও বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার স্তর বা ‘সিস্টেম-২’ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে মানুষের যুক্তিবোধ সাময়িকভাবে লোপ পায়। তখন জনমত গঠনের জায়গাটি যুক্তিনির্ভর গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে আবেগতাড়িত ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। মানুষ তখন ‘ইল্যুশন অব ট্রুথ ইফেক্ট’-এর শিকার হয়; অর্থাৎ একই মিথ্যা বা গুজব বারবার শুনতে শুনতে সেটাকেই চরম সত্য বলে গ্রহণ করে। একই সাথে, এই উত্তেজনামূলক বা ক্ষোভ সৃষ্টিকারী কনটেন্টগুলো মানুষের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক একটি রাসায়নিক উদ্দীপক ছড়িয়ে দেয়। এটি ভোক্তার মনে একধরনের ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তি দেয় ও উৎপাদকের মনে সমাজে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে। কনটেন্টে পাওয়া লাইক, শেয়ার ও কমেন্ট সেই অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং একটি আসক্তির দুষ্টচক্র তৈরি করে। আচরণগত অর্থনীতির ভাষায়, এটি একটি ‘পজিটিভ ফিডব্যাক মেকানিজম’। এখানে মানুষের মনোযোগ হয়ে ওঠে প্রধান মুদ্রা, আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এই মনোযোগকে পুঁজি করে তাদের ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ গড়ে তোলে। এর ফলে পুরো তথ্য-পরিসরটি একটি ইমোশনাল মার্কেটপ্লেসে পরিণত হয়, যেখানে সত্য যাচাইয়ের কোনো দাম নেই; বরং কার আবেগ কত তীব্র, সেটাই কনটেন্টের মূল্য নির্ধারণ করে। এই ডোপামিনের ফাঁদে আটকে পড়া পক্ষাঘাতগ্রস্ত জনগণকে খুব সহজেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মানুষের এই স্নায়বিক ও বৈজ্ঞানিক দুর্বলতাটিকেই সুপরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাচ্ছে সপ্তভুজ লৌহ কাঠামোর সুবিধাভোগী সেই সুসংগঠিত সাইবার অপরাধী ও প্রোপাগান্ডা চক্রটি।

নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত প্রোপাগান্ডা মূলত জ্ঞানগত পক্ষাঘাত, তথ্য বাজারের গভীর ব্যর্থতা এবং নেতিবাচক নেটওয়ার্ক এক্সটার্নালিটির এক ভয়াবহ রূপ। প্রযুক্তি মিথ্যা তৈরির খরচ শূন্যে নামিয়ে এনেছে; অন্যদিকে এসব নিখুঁত মিথ্যা মস্তিষ্কের অ্যামিগডালাকে উদ্দীপ্ত করে তীব্র আবেগ সৃষ্টি করে এবং ডোপামিন-চালিত শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটায়। ফলে, বিখচন্দানী প্রমুখের (১৯৯২) ‘ইনফরমেশন ক্যাসকেড’ তত্ত্ব অনুযায়ী মানুষ সত্য যাচাই না করেই আবেগের বশে পোস্ট শেয়ার করে জনমতকে বিকৃত করে। এখানে অর্থনীতির ‘গ্রেশামের নিয়ম’ নিখুঁতভাবে কার্যকর: খারাপ মুদ্রা যেমন ভালো মুদ্রাকে তাড়ায়, তেমনি সস্তা মিথ্যা বস্তুনিষ্ঠ সত্যকে বাজার থেকে পুরোপুরি বিতাড়িত করে।

রিউমার স্ক্যানার ও ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর (২০২৫-২০২৬) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি একটি বহুস্তরীয় ডিজিটাল অপতথ্য ইকোসিস্টেম, যেখানে মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকাও চরম প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন, ৫ এপ্রিল (২০২৬) ‘কালের কণ্ঠ’ ড. ইউনূসকে নিয়ে একদিনে ২৪টি ফটোকার্ড প্রকাশ করে, যা মূলত জনমনে কৃত্রিম সন্দেহ ঢোকাতে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’-এর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। একইভাবে, পিআইবি’র গবেষণায় (জুন ২০২৫) দেখা যায়, নিজস্ব ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট থাকা সত্ত্বেও ‘প্রথম আলো’ সবচেয়ে বেশি খবর সংশোধন ও প্রত্যাহার করেছে। এটি প্রমাণ করে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডার পাশাপাশি মূলধারার মিডিয়াগুলোও তথ্য বাজারের এই ব্যর্থতায় ক্রমাগত ইন্ধন জোগাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও এর প্রভাব ভয়াবহ। সম্প্রতি ‘১০ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় বিএনপি নেতাদের দোকান তচনচ’-এর একটি ভুয়া এআই ছবি ছড়িয়ে মানুষের অবচেতন মনের চাঁদাবাজির ন্যারেটিভকে উসকে দেওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টায় এটি ৩৮ হাজার রিয়্যাকশন ও ২০ হাজার শেয়ার পায়, অথচ রিউমার স্ক্যানারের সত্য রিপোর্টটি মাত্র ১০০ শেয়ারে আটকে থাকে। দ্য ডিসেন্টের (মার্চ ২০২৬) অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাকিস্তান-লিঙ্কড নেটওয়ার্কগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ার (বিবিসি/আল-জাজিরা) স্টাইলে ২৪টি ডিপফেক ভিডিও তৈরি করে ২৪ জন বিএনপি নেতাকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত বা প্রো-ইন্ডিয়ান’ হিসেবে দেখিয়েছে। একইভাবে, এআই-ভিডিওতে তারেক রহমানকে ‘সন্ত্রাসী নেতা’ দেখিয়ে ফেসবুক-টিকটকে ভয়-ক্রোধের ডোপামিন লুপ তৈরি করা হয় এবং তাঁর নামে ৪৫টি জাল উক্তির ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। ফ্যাক্ট-চেকের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যখন সামান্য শেয়ার হয়, তখন এসব এআই-গুজবই লাখো মানুষের জ্ঞানতাত্ত্বিক মানচিত্রে ‘সত্য’ হয়ে গেঁথে যায়।

নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রোপাগান্ডায় চক্রটি আরও সুসংগঠিত। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের প্রভাবিত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘পেইড জরিপ’ ভাইরাল করে বিএনপি ও জামায়াত সমান আসন পাবে, এমন কৃত্রিম আখ্যান তৈরি করা হয়। লাইবেনস্টাইনের (১৯৫০) ভাষায়, এটি ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’; যুক্তি বাদ দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্রোতে গা ভাসানো। যেমন, ‘নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আগেই ভোট দিয়ে রাখার’ গুজব ছড়িয়ে (যা ১০ হাজার রিয়্যাকশন পায়) নির্বাচনি মনস্তত্ত্ব ম্যানিপুলেট করা হয়। অন্যদিকে, দ্য ডিসেন্টের (জানুয়ারি ২০২৬) রিপোর্টমতে, নেক্সট ইনসাইট নেটওয়ার্ক (৯১ হাজার ফলোয়ার) এআই-নিউজ প্রেজেন্টার ব্যবহার করে বিএনপি সমর্থকদের রেফারেন্ডামে ‘না’ ভোটের উসকানি দেয় (১৩ লাখ ভিউ); পাশাপাশি জাইমা রহমান ও আফরোজা আব্বাসের নাম ভাঙিয়ে জাল অ্যাকাউন্টগুলো ৫৩ হাজারেরও বেশি রিয়্যাকশন অর্জন করে।

এই প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি অকাট্য গাণিতিক প্যাটার্ন চোখে পড়ে: মিথ্যার বিস্তারের হার বা ‘ভাইরাল কো-এফিসিয়েন্ট’ সত্যের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি। ভোসোগি ও তাঁর সহকর্মীদের (২০১৮) বিশ্বখ্যাত ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, অনলাইনে নেতিবাচক মিথ্যা খবর সত্যের চেয়ে অন্তত ৬ গুণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ছড়ায়। ঠিক এই জায়গাতেই ব্র্যান্ডোলিনির (২০১৩) ‘ব্র্যান্ডোলিনির সূত্র’ বা ‘বুলশিট অ্যাসিমেট্রি প্রিন্সিপল’ নির্মমভাবে কার্যকর হয়। এই সূত্রমতে, একটি মিথ্যা বা গুজব তৈরি করতে যে পরিমাণ শক্তি ও অর্থ লাগে, সেটিকে খ-ন করে সত্য প্রমাণ করতে বহুগুণ বেশি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও শ্রমের প্রয়োজন হয়। বাস্তবে দেখা যায়, ফ্যাক্ট-চেকারদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্রমে তৈরি বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্ট অনলাইনে হয়তো শেয়ার হচ্ছে মাত্র ১০০ বার। অন্যদিকে, অ্যালগরিদমিক বুস্টিংয়ের সাহায্যে মিনিটের মধ্যে তৈরি এআই-জেনারেটেড গুজব লাখো মানুষের মগজে অকাট্য ‘সত্য’ হিসেবে গেঁথে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদমের তৈরি এই জ্যামিতিক তথ্য-অসামঞ্জস্যের কারণে সমাজে যে বিপুল ‘অনিশ্চয়তার খরচ’ তৈরি হয়, তা সাধারণ মানুষের মানসিক ও উৎপাদনশীল সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আর্মি অফিসারদের ট্রায়াল নিয়ে ৬৭টি ফেক পেজে ৫৪৭টি পেইড অ্যাড (যার ৫৪১টি একই সময়ে সকাল ৭:০০ টায় বুস্ট করা) চালানো হয়েছে; যেখানে ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে। মানুষ যখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রকৃত তথ্যের সন্ধান করতে বাধ্য হয়, তখন তাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় সময়ের এক বিশাল অপচয় ঘটে। এই সুপরিকল্পিত অপচয়ই হলো ‘সময়ের চুরি’। এর ফলে নাগরিকরা একধরনের সময়-তথ্য-জ্ঞানগত অলিগার্কিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়, যেখানে মানুষ দিন শেষে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করতে না পেরে সামাজিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে। এই ‘সময়ের চুরি’ কেবল রাজনৈতিক গুজবেই সীমাবদ্ধ নেই। টেক-অলিগার্করা মুনাফার লোভে সমাজজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে সর্বনাশা অনলাইন জুয়া এবং গুগল ও ইউটিউবের লাগামহীন ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন। এর পাশাপাশি সাইবার স্পেসে নারীদের ব্ল্যাকমেইল বা ডিপ-ফেক যৌন হয়রানি এবং শিশুদের অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন টাইম পুরো একটি প্রজন্মকে এই ‘ডোপামিন লুপে’ আটকে রাখছে। রাজনৈতিক গুজবের পাশাপাশি এই ডিজিটাল ফাঁদগুলোও সাধারণ নাগরিকের মেধা ও উৎপাদনশীল সময়কে গিলে খাচ্ছে, যা মূলত অলিগার্কিক পক্ষাঘাতেরই এক ভয়াবহ আর্থসামাজিক রূপ।

মূলত রাজনৈতিক ও টেক-অলিগার্ক চক্রের জন্য এটি একটি মোক্ষম আর্থরাজনৈতিক কৌশল। কারণ, বিভ্রান্ত সমাজ যখন কেবল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুজবের সত্যতা যাচাই, অনলাইন জুয়ার প্রলোভন কিংবা অন্তহীন স্ক্রিন টাইমের ডোপামিন ফাঁদে নিজেদের অমূল্য সময় ও শ্রম ব্যয় করে ফেলে, তখন রাষ্ট্রের মূল কাঠামোগত সংকট নিয়ে প্রশ্ন তোলার বা বৃহত্তর সংস্কারের দাবি তোলার মতো সময় ও মানসিক শক্তি তাদের আর অবশিষ্ট থাকে না। এভাবেই জনগণের এই পরিকল্পিত ‘সময়ের চুরি’ সমাজে অলিগার্কিক ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করে তোলে। তথ্য-প্রবাহ এবং মনোযোগ দখলের এই অসম যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, কেবল সাধারণ ফ্যাক্ট-চেকিং দিয়ে রাষ্ট্রের এই সুসংগঠিত জ্ঞানগত ও আর্থসামাজিক পক্ষাঘাত ঠেকানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা অনুযায়ী, এই তথ্য-সন্ত্রাসের শিকার কেবল নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দল নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে একদিকে তারেক রহমান ও বিএনপির বিরুদ্ধে যেমন শত শত নেতিবাচক ও এআই-জেনারেটেড গুজব ছড়ানো হয়েছে; ঠিক একইভাবে জামায়াতে ইসলামী ও এর আমির ডা. শফিকুর রহমান নিয়েও অসংখ্য ডিপ-ফেক ছবি ও বানোয়াট উক্তি ছড়ানো হয়েছে। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের চরিত্র হননেও এই এআই প্রোপাগান্ডাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অপতথ্য ইকোসিস্টেম নিছক রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়। এটি মূলত নর্থের (১৯৯০) ‘ইন্সটিটিউশনাল ম্যাট্রিক্স’-এর ওপর একটি সুসংগঠিত আক্রমণ। নর্থের মতে, এই ম্যাট্রিক্স হলো দেশের লিখিত আইন এবং নাগরিকদের পারস্পরিক অলিখিত আস্থার সমন্বয়ে গড়া রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিমূল বা ‘খেলার নিয়মকানুন’। এআই-চালিত অপতথ্য ঠিক এই আস্থার জায়গাতেই আঘাত হেনে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো তথ্য বাজারের চরম ব্যর্থতা।
এ ব্যর্থতা অপনোদনের উপায় হলো, এআই-গুজবের ‘ডোপামিন-অ্যামিগডালা’ ফাঁদ ও মিডিয়ার তথ্য-অসমতা রুখে তথ্য বাজারকে দক্ষ করা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে প্ল্যাটফর্ম-লেভেল স্বচ্ছতার মাধ্যমে সমাজে সত্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপরই নির্ভর করছে মেধাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews