জাতীয় বাজেট সামনে এলেই দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী সংগঠন ও খাতভিত্তিক প্রভাবশালী গ্রুপগুলোর লবিং বা তৎপরতা বেড়ে যায়। কর ছাড়, শুল্ক অব্যাহতি, ট্যাক্স হলিডে, বিশেষ প্রণোদনা কিংবা আমদানি সুবিধা আদায়ে শুরু হয় নানা ধরনের তদবির। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের করনীতি ক্রমেই ভারসাম্য হারাচ্ছে। একদিকে নির্দিষ্ট করপোরেট গ্রুপ ও বৃহৎ শিল্পখাত বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে, অন্য দিকে সরকারের রাজস্ব ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

এ দিকে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্লেষকদের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের কর কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক কর অব্যাহতি ও কর রেয়াত বিদ্যমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু কর ছাড় কমানো হলেও কর ব্যয়ের পরিমাণ এখনো উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তি প্রয়োজন। কিন্তু কর ছাড়ের সংস্কৃতি এবং দুর্বল কর প্রশাসনের কারণে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের সর্বনি¤œ কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলমান ঋণের শর্ত অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৯ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জোর দিলেও তা কিভাবে আদায় হবে সেটির সুনির্দিষ্ট পন্থা বাতলাতে পারেনি এনবিআর। একই সময়ে কিছু কর ছাড় কমানো হলেও সামগ্রিক কর অব্যাহতির পরিমাণ এখনো বড় আকারে রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কর আদায়ের সক্ষমতা না বাড়িয়ে বারবার কর রেয়াতের সুযোগ বাড়ানো হলে রাজস্ব ভিত্তি আরো সঙ্কুুচিত হবে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতধারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশও যেখানে কর আহরণে তুলনামূলক অগ্রগতি করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, কর অব্যাহতি ও কর রেয়াতের পেছনে কেবল অর্থনৈতিক যুক্তি কাজ করে না; অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট লবিং এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাজেট ঘোষণার আগে প্রতিবছর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে শত শত প্রস্তাব জমা দেয়। শিল্প মালিকদের সংগঠন, চেম্বার, আমদানিকারক সমিতি, রফতানিকারক সংগঠন এবং খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী নেতারা কর সুবিধা বৃদ্ধির পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। এসব দাবির একটি অংশ যৌক্তিক হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর মুনাফা সুরক্ষার লক্ষ্যেই হয়ে থাকে বলে মনে করেন তিনি।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কোনো খাতকে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সীমিত সময়ের জন্য কর ছাড় দেয়া যেতে পারে। কিন্তু একই খাতকে বছরের পর বছর সুবিধা দেয়া হলে তা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় বৈষম্য সৃষ্টি করে। একটি শিল্প যদি ১০ বা ১৫ বছর কর ছাড় পাওয়ার পরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে না পারে, তাহলে সেই কর সুবিধার কার্যকারিতা কতটুকু।

এনবিআরের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন এবং সীমিত করভিত্তির কারণে রাজস্ব আদায় কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। অন্য দিকে সরকারের ব্যয় কমছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ বাড়ছে। পাশাপাশি সহজে আদায়যোগ্য করের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ভ্যাট। বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোয় এখনো পরোক্ষ করের অংশ বেশি। অর্থাৎ মানুষ যখন পণ্য বা সেবা কিনে, তখন সেই করের বড় অংশ পরিশোধ করে। একজন দিনমজুর ও একজন শিল্পপতি যখন একই পণ্য কেনেন, তখন ভ্যাটের হার প্রায় একই থাকে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের তুলনায় করের বোঝা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যখন বড় করপোরেট গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন কর রেয়াতের সুযোগ পায় এবং সরকার রাজস্ব ঘাটতি পূরণে ভ্যাট বাড়ায়, তখন কার্যত করের ভার সাধারণ ভোক্তার দিকে স্থানান্তরিত হয়। চাল, ডাল, তেল, বিদ্যুৎ, মোবাইল সেবা, পরিবহনসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত কর দিচ্ছেন। অন্য দিকে বড় শিল্পগোষ্ঠী বিভিন্ন বিশেষ সুবিধা পেলে কর ব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে কর অব্যাহতি কমানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। তাদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমাতে হবে, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও বৃহৎ করপোরেট গোষ্ঠীর কর পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।

আইএমএফের সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির আলোচনাতেও কর ছাড় পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সরকার অনেক ক্ষেত্রে কর সুবিধা প্রত্যাহারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ হঠাৎ কর বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং কিছু শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য ব্যবসা ও রাজনীতির সীমারেখাকে দুর্বল করে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রভাব বাড়ে এবং নীতিগত সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার মতে, যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা একই বলয়ে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন করনীতি প্রণয়নে জনস্বার্থের চেয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেতে পারে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, রফতানিমুখী শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, রিয়েল এস্টেটের কিছু অংশ এবং নির্দিষ্ট উৎপাদনশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের কর রেয়াত ভোগ করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পাঁচ বা ১০ বছরের জন্য দেয়া কর ছাড় পরে আরো কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। ফলে অস্থায়ী প্রণোদনা ধীরে ধীরে স্থায়ী সুবিধায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, কর ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন। তার মতে, কোন খাত কত কর ছাড় পেল এবং তার বিনিময়ে কত কর্মসংস্থান বা বিনিয়োগ সৃষ্টি হলো, সেই মূল্যায়ন ছাড়া কর রেয়াতের যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা যায় না। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আয় অনুযায়ী করের বোঝা নির্ধারণ করা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামোয় এখনো পরোক্ষ করের অংশ বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি চাপ বহন করছে। উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাভোগী খাতগুলো থেকে ন্যায্য হারে কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পরোক্ষ করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর রেয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণ চালু করা জরুরি। প্রতিটি কর ছাড়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে এবং মেয়াদ শেষে স্বাধীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সাথে কর ব্যয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন, কর অব্যাহতির তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ এবং নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাত কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তারা বলছেন, শক্তিশালী লবিংয়ের প্রভাবে কর রেয়াতের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজস্ব ভিত্তি আরো দুর্বল হবে। আর সেই ঘাটতির বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। তাদের মতে, একটি ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে করনীতিকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর তদবির থেকে বের করে স্বচ্ছ অর্থনৈতিক যুক্তি, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই রাজস্ব সক্ষমতা বাড়বে, বৈষম্য কমবে এবং উন্নয়নের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews