রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র। নির্বাচিত সরকারকেই বিধান করতে হয় এসব মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা। যত শক্তিশালী সরকারই হোক না কেন, সুশাসনের জন্য প্রয়োজন নিজ দলকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে স্পষ্ট কোনো বিভাজন রেখা নেই। যখন যে দল সরকার গঠন করে, সেই দল ও সরকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সরকার পরিবর্তনের পর সবকিছুরই মালিক বনে যায় ক্ষমতাসীন দল। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভোগদখলের একচেটিয়া দাবিদার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এভাবেই জনগণকে বঞ্চিত করে এসেছে তাদের অধিকার থেকে। এমনই দেখা গেছে-ক্ষমতা ধরে রাখতে, সরকার রাষ্ট্রের মূল তিনটি স্তম্ভ প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগকে করে তোলে ভারসাম্যহীন। সর্ব ক্ষেত্রে ঘটায় দলীয়করণ। কুণ্ঠিত হয় না রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করে দিতে। ফলে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অভাব অনুভূত হয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে। বিস্তার ঘটে লাগামহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারের। বাংলাদেশে বরাবরই এসবের সংমিশ্রণে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে সংকট ও অস্থিরতা।
দেশে যখন যে দল রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে কীভাবে দীর্ঘদিন আঁকড়ে থাকা যাবে ক্ষমতার মসনদ। এজন্য সরকার ও দলে যা যা করা প্রয়োজন তার সবকিছুই করেন তারা। এখানে নীতিনৈতিকতা ও আইনি দিকটা অগ্রাহ্য করা হয় নির্দ্বিধায়। প্রশাসনের পাশাপাশি আইন ও বিচার বিভাগেও বিস্তার করে একক আধিপত্য। নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। মেধা ও যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে নিয়োগ দেওয়া হয় সরকারের দলীয় লোকজনকে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগের প্রধান শর্ত হয়ে উঠে দলীয় ক্যাডার ও আঞ্চলিকতা। এভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ঘুচিয়ে ফেলে সরকার ও রাজনৈতিক দলের মাঝের ব্যবধান। অন্যদিকে বিরোধী মতের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের হয় চাকরিচ্যুত করেন, নয়তো করেন ওএসডি। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় অনেককে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ক্রমান্বয়ে ধাবিত হয় ধ্বংসের পথে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় দলীয় স্বার্থে। যারা কার্যত পরিণত হয় দলীয় বাহিনীতে। সরকারদলীয় স্বার্থে এসব বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় বিরোধী মতের মানুষকে নিপীড়ন-নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে। আদালতকে সরকার ব্যবহার করে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজে। এসব কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায় বিনা বিচারে। অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষ শিকার হয় জেলজুলুম নির্যাতনের। হুমকির মুখে পড়ে জননিরাপত্তা।
সরকার ও ক্ষমতাসীন দল যখন একাকার হয়ে যায়, তখন দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে দুর্নীতির প্রবণতা। সরকারের ছত্রছায়ায় সামরিক, বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী ও এমপি, মন্ত্রীরা দলীয় আনুকূল্যে গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। হিড়িক পড়ে দেশীয় সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচারের। সরকারের শীর্ষ থেকে নিম্ন পর্যায়েও প্রভাব পড়ে দুর্নীতি ও অবাধ লুণ্ঠনের। এ ভয়ংকর চিত্র খুব স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা গেছে স্বৈরাচার পতনের পর।
ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সরকার প্রয়োগ করে সব ধরনের কূটকৌশল ও শক্তিমত্তা। নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে ব্যালটের বদলে জবরদস্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করে বিজয়। নিকট অতীতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে পরপর জাতীয় সংসদের তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এভাবেই। যার জন্য জনগণ বঞ্চিত হয় ভোটাধিকার থেকে। গণতন্ত্রের কফিনে সেঁটে দেওয়া হয় শেষ পেরেকও। রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় ফ্যাসিবাদী শাসন। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের তিনটি নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক দেশ ও জাতিকে নিমজ্জিত করে অধিকতর সংকটে। সরকার জাতীয় সংসদ বহাল রেখে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়লাভে। বিষয়টিতে আর যা-ই হোক কোনো সুযোগ ছিল না আত্মতৃপ্তি লাভের। অতীতের সেই তিনটি নির্বাচনেই জয়লাভ সম্ভব হয় সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের এক ও অভিন্ন সত্তা এবং কূটকৌশলের ফলে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন চতুর্থবারের মতো। দলটির সাধারণ সম্পাদকও চতুর্থবারের মতো শপথ নেন মন্ত্রী হিসেবে। মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়েন অনেক প্রভাবশালী নেতা। এতে দল ও জোটে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়ায়, তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। দলকে সরকার থেকে পৃথক অবস্থানে রাখতেই এমনটি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর এ মন্তব্য তখনই গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত হতো, যদি তিনি সরকারের মন্ত্রিত্ব রেখে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদটি ছেড়ে দিতেন। ‘যিনি হেডমাস্টার তিনিই সেক্রেটারি’ বহুল প্রচলিত প্রবাদটি আমাদের জানা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলে এই রেওয়াজ চলছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের ‘টুইন ওয়ান’ পদ্ধতির অবসান প্রয়োজন। একজন সরকারপ্রধানের পক্ষে একই সময়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের দেখভাল করার এত সময় কোথায়? সাধারণ সম্পাদকের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে জানিয়ে দেবেন, আশ্বস্ত করবেন তিনি শুধু আওয়ামী লীগ নন গোটা দেশ ও জাতির নেতা। বেরিয়ে আসতে হবে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে। দলীয় প্রধানের পদ ছেড়ে দিতে হবে একান্ত বিশ্বস্ত কোনো নেতার হাতে। কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলের আগে-পরে দীর্ঘ ১১ বছর দুই দফা কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ক্ষমতার বাইরে অবস্থানকারী নেতা কুমারস্বামী কামরাজ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও এমনটিই হয়ে থাকে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন যিনি দলের সাধারণ সম্পাদক তাঁকেও দূরে রাখেন ক্যাবিনেট থেকে। দলের সাংগঠনিক দায়দায়িত্ব সম্পন্ন করতে দেন তাঁকে। এতে দুর্নাম ঘুচে দলীয়করণের। হ্রাস পায় দলের সঙ্গে সরকারের মিলেমিশে একাকার হওয়ার সম্ভাবনা। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং দখলদারত্বের রাজনীতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে দলপ্রীতির ঊর্ধ্বে থেকে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শাসনকাল ক্ষেত্র বিশেষে সাময়িকভাবে দীর্ঘায়িত হলেও তা কখনোই চিরস্থায়ী নয়।
দলের দায়িত্বশীল পদ থেকে রেহাই দিতে হবে অন্য মন্ত্রীদেরও। সুযোগ করে দিতে হবে অন্য নেতাদের। সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দল বা দলগুলো সরকার পরিচালনার মধ্য দিয়ে অবশ্যই তাদের নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করবে। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠন করার পর সরকারের দায়বদ্ধতা গোটা দেশ ও জনগণের প্রতি। বিশেষ কোনো দলের কাছে নয়। কিন্তু আমাদের দেশে সরকার কাউকে কোনো আমলে নেয় না নিজ দলের বাইরে। মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের সব সুযোগসুবিধা ভোগ করে অংশ নেন দলীয় সভাসমিতিতে। সারাক্ষণ গালমন্দ করেন বিরোধী দলের নেতাদের। কুৎসা রটান বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে। ভাবটা এমন বিরোধী দলকে জব্দ করার জন্যই মন্ত্রীই বানানো হয়েছে তাঁদের।
প্রশাসনিক এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীতিনির্ধারণী সভায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তুলোধোনা করেন স্বয়ং ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধান। এ ছাড়া সরকারের মন্ত্রীকে দলীয় মুখপাত্র নিয়োগ করার বিষয়টিও সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের যেমন মুখপাত্র থাকবে, তেমনি দলীয় মুখপাত্র থাকবে, যার কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকবে না সরকারে। নির্ধারিত মুখপাত্র ছাড়া যখনতখন যেকোনো মন্ত্রী গণমাধ্যমে ফ্রি-স্টাইল মন্তব্য করতে পারবে না। সরকারি অফিস ও বাসভবন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম নীতিনৈতিকতা মানা হয়নি অতীতে। প্রধানমন্ত্রী ভবনসহ সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ে দলীয় সভাসমাবেশ ও আনন্দানুষ্ঠান বৈধতা পেতে পারে না কোনোভাবেই। রাষ্ট্রীয় অর্থে বিশেষ শ্রেণির মানুষকে গণভবনে আপ্যায়ন করা হবে কেন? সরকারের দায়িত্বশীল আমলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের টেলিভিশন টক শোতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিস্তৃতি ঘটছে দলীয়করণের। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতে কর্মরত অনেক কূটনীতিক অতীতে প্রকাশ্যে অংশ নেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় ইউনিটের সভা সমাবেশে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীরা বিদেশে গিয়ে নিজ দলীয় সভায় অংশ নিয়ে বিষোদগার করেন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে। ফলে প্রবাসীদের মাঝে সৃষ্টি হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া। সরকারের জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করে সব দলমতের মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে ভিন্ন অবস্থান ও দলকে রাখতে হবে দলের জায়গায়। ভুলে গেলে চলবে না, ব্যক্তির চেয়ে দল, আর দলের চেয়ে বড় দেশ ও জাতি। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের কাছে দেশের জনগণের প্রত্যাশা সীমাহীন। নতুন সরকারের গৃহীত অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আবার প্রশংসাও কুড়াচ্ছে অনেক কার্যক্রম। চূড়ান্ত বিচারে অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অগ্রসর হতে হবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক