ফুটবলভিত্তিক সিনেমার ইতিহাস শুরু হয় ‘নির্বাক সিনেমা’ যুগে। ১৯২০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য উইনিং গোল’ ছিল ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রথমদিকের ব্রিটিশ সিনেমাগুলোর একটি। এতে বাস্তব ফুটবল খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ ছিল এবং মাঠের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ইংল্যান্ডের ব্রেন্টফোর্ডের মাঠে।
এরপর ১৯৩৯ সালে আসে ‘দ্য আর্সেনাল স্টেডিয়াম মিস্ট্রি’। এটি ছিল ফুটবল মাঠকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি রহস্যধর্মী সিনেমা, যেখানে লন্ডনের আর্সেনাল ক্লাবের মাঠ হাইবারিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফুটবলকে গল্পের পটভূমি হিসাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি ছিল যুগান্তকারী প্রচেষ্টা।
ফুটবল সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ (১৯৮১)। কিংবদন্তি পরিচালক জন হিউস্টনের নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন, মাইকেল কেইন এবং ব্রাজিলিয়ান মহাতারকা পেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এ সিনেমার কাহিনিতে দেখা যায়, নাৎসি বন্দিশিবিরে আটক মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা জার্মান দলের বিপক্ষে একটি ফুটবল ম্যাচ খেলছে। প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এ সিনেমা বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৭.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে এবং আজও ফুটবল সিনেমার ক্লাসিক হিসাবে বিবেচিত হয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে ফুটবল সিনেমায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। ‘ফেভার পিচ’ (১৯৯৭) ফুটবলপ্রেমী সমর্থকদের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। একই সময়ে ফুটবলকে ঘিরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গল্প বলার প্রবণতাও বাড়তে থাকে।
২০০১ সালে মুক্তি পায় ‘শাওলিন সকার’। হংকংয়ের নির্মাতা ও অভিনেতা স্টিফেন চাউ পরিচালিত এ সিনেমা ফুটবল এবং মার্শাল আর্টকে একসঙ্গে মিশিয়ে এক ভিন্নধর্মী বিনোদন উপহার দিয়েছেন। মুক্তির সময় এটি হংকংয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল সিনেমাগুলোর একটি ছিল।
এর পরের বছর, ২০০২ সালে আসে ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’। গুরিন্দর চাডা পরিচালিত এই ব্রিটিশ সিনেমায় এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণীর ফুটবলার হওয়ার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়। নারী ফুটবল, অভিবাসী পরিবার, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্নকে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করে সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়। অনেক সমালোচকের মতে এটি শুধু একটি খেলার সিনেমা নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
একই সময় ফুটবলের অন্ধকার দিক নিয়েও সিনেমা নির্মিত হয়েছে। ‘দ্য ফুটবল ফ্যাক্টরি’ (২০০৪) ফুটবল হুলিগানিজম বা উগ্র সমর্থক সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। এতে ফুটবল ঘিরে সহিংসতা, পরিচয় সংকট এবং সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।
২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিনস’ আধুনিক ফুটবল সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় উদাহরণ। সিনেমার নায়ক সান্তিয়াগো মুনিয়েজ, একজন দরিদ্র মেক্সিকান যুবক, যিনি স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ইংল্যান্ডে গিয়ে পেশাদার ফুটবলার হওয়ার চেষ্টা করেন। সিনেমাটি নির্মাণে ফিফার সহযোগিতা ছিল এবং এতে ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদান, রোনালদো ও থিয়েরি অঁরির মতো তারকারা উপস্থিত ছিলেন। পরেবর্তী ‘গোল ২ : লিভিং দ্য ড্রিম’ (২০০৭) এবং ‘গোল ৩ : টেকিং অন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (২০০৯) মুক্তি পায়।
ফুটবল ইতিহাসভিত্তিক সিনেমার মধ্যে ‘দ্য ড্যাম্ড ইউনাইটেড’ (২০০৯) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ডেভিড পিসের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমায় ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি কোচ ব্রায়ান ক্লাফ এবং ডন রেভির প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচকদের পাশাপাশি ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও এটি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটি ও দর্শক আলোচনায় এটি প্রায়ই সেরা ফুটবলকেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর তালিকায় স্থান পায়।
আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ হলো ‘লুকিং ফর এরিক’ (২০০৯)। বিখ্যাত পরিচালক কেন লোচ নির্মিত এ সিনেমায় ফুটবল কিংবদন্তি এরিক ক্যান্টোনা নিজেই অভিনয় করেছেন। ফুটবল কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে আশা ও অনুপ্রেরণা জোগায়, সেই গল্পই সিনেমাটির মূল বিষয়।
এ ছাড়া ইরানি নারীদের স্টেডিয়ামে খেলা দেখার অধিকারের দাবিতে আন্দোলন ও কৌশল নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমা ‘অফসাইড’ (২০০৬)।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ফুটবলভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য বিউটিফুল গেইম’ গৃহহীন ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। অন্যদিকে ২০২৬ সালে মুক্তির আলোচনায় থাকা ‘সাইপান’ সিনোমটি রয় কিন ও মিক ম্যাকার্থির বিখ্যাত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। এটি ফুটবল ম্যাচের চেয়ে খেলাটির মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে বায়োপিক ও ডকুমেন্টারিও নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়োপিক ‘পেলে : বার্থ অব অ্যা লেজেন্ড (২০১৬)’। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের হয়ে ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলের বিশ্বকাপ জয় ও কিংবদন্তি হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে এটি। একই খেলোয়াড়কে নিয়ে নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র ‘পেলে’ (২০২১)। নেটফ্লিক্সের এ তথ্যচিত্রে পেলের জাদুকরি মুহূর্ত এবং সমসাময়িক ব্রাজিলের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। ফুটবলের ‘গোল্ডেন বয়’খ্যাত ম্যারাডোনাকে নিয়ে নির্মিত হয় ডকু-ফিল্ম ‘দিয়েগো ম্যারাডোনা’ (২০১৯)। ফুটবলের এ মহানায়কের অতিশয় গরিব অবস্থান থেকে বিশ্বসেরা তারকা হয়ে ওঠার অদেখা ফুটেজ ও সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয় এটি। বর্তমান বিশ্বের ‘ফুটবল জাদুকর’ লিওনেল মেসিকে নিয়েও তৈরি হয়েছে ডকুফিল্ম। নাম ‘মেসি’ (২০১৪)। শৈশবের হরমোনজনিত সমস্যা ও লাজুক স্বভাবের এক বালকের বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প এটি। ইতালীয় ফুটবল আইকন রবার্তো বাজিওর ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘বাজিও : দ্য ডিভাইন পনিটেল (২০২১)’।
বাংলাদেশেও ফুটবল নিয়ে কিছু সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি ‘জাগো’ (২০১০)। নির্মাণ করেছেন খিজির হায়াৎ খান। আরেকটি হচ্ছে ‘দামাল (২০২২)’। রায়হান রাফী পরিচালিত এ সিনেমা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়। অন্যদিকে বলিউডে অনেক সিনেমায় ফুটবল খেলা দেখানো হলেও ফুটবল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সিনেমা হচ্ছে ‘ধান ধানা ধান গোল (২০০৭)।
সিনেমা বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল সিনেমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাঠের উত্তেজনা এবং বাস্তব ম্যাচের আবেগকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা। এ কারণেই অনেক সফল ফুটবল সিনেমা খেলার চেয়ে খেলোয়াড়, সমর্থক বা সমাজের গল্পকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহাম’, ‘দ্য ডেম্ড ইউনাইটেড’, ‘গোল’, ‘এস্কেপ টু ভিক্টরি’ কিংবা ‘লুকিং ফর এরিক’-সবকটির সাফল্যের পেছনেই রয়েছে মানবিক গল্পের শক্তিশালী উপস্থিতি।
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি সংস্কৃতি, পরিচয়, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের প্রতীক। তাই রুপালি পর্দায় ফুটবলের গল্পও কখনো শুধু গোল আর ট্রফির গল্প হয়ে থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের জয়-পরাজয়, আশা-নিরাশা এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য দলিল। আর এ কারণেই ফুটবলভিত্তিক সিনেমাগুলো যুগের পর যুগ দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে।