প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ৪ দিনব্যাপী চীন সফরকালে দুই দেশের মধ্যে যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ। সফরের শেষ দিনে চীনের গ্রেট হলে যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের নেতৃত্বে চীনা টিম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ টিম অফিসিয়াল বৈঠকে মিলিত হন তখন চীনের তরফ থেকে এই ইকোনোমিক করিডোরের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে যে, সফরের শেষদিনে যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একান্ত বৈঠকে মিলিত হন তখন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এই প্রস্তাবে আগ্রহ দেখান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গীদের সূত্র থেকে জানা গেছে যে, যদি বাংলাদেশ এই প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরে রাজি না হয় তাহলে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ অন্যান্য চীনা কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ঝুলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই সফরকালে দুই দেশ তাদের বিদ্যামান ‘Comprehensive Strategic Cooperative Partnership’ আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দেয়। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে।

চীন জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের অনুরোধে তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) ও কারিগরি সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পূর্ণ অর্থায়নের চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো হয়নি। এই সফরকালে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় মংলা বন্দরের সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল ও উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগের ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যেসব বিষয়ে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে তার মধ্যে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ। প্রস্তাবিত করিডোরটি শুরু হবেচীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে। অতঃপর সেটি মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে দুইটি ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। এক ভাগ চলে যাবে ইয়াঙ্গুনের (সাবেক নাম রেঙ্গুন) দিকে এবং অন্যভাগ যাবে রাখাইন রাজ্যের গভীর সমুদ্রবন্দর কায়াউফিউ (Kyaukphyu) অভিমুখে। এই করিডোরের যে শাখাটি আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের দিকে যাবে, সেটি অতঃপর বাংলাদেশ অভিমুখে প্রলম্বিত হবে। বাংলাদেশে এই করিডোরটি চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার পর্যন্ত যাবে। এর ফলে চীন তার প্রাদেশিক রাজধানী কুনমিং থেকে স্থল পথে একেবারে চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর তথা বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতে পারবে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ চীন অর্থনৈতিক করিডোর নতুন কোনো প্রস্তাব নয়। ৯০-এর দশকেও চীন এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলো। ১৯৯০ সালে যখন চীন এটি উত্থাপন করে তখন এটি ছিলো ৪ দেশীয় প্রকল্প। তখন বাংলাদেশ-মিয়ানমানর ও চীনের পাশাপাশি ভারতকেও এই প্রকল্পে যুক্ত করতে চেয়েছিলো চীন। কিন্তু ভারত তখন ভেবেছিলো যে, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরই (বিআরআই) একটি সম্প্রসারিত অংশ। এর ফলে চীন-ভারত বৈরী সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। ভারতের দৃশ্যমান অনাগ্রহ এবং ভেতরে ভেতরে বিরোধিতার ফলে ২০১৯ সালে বিআরআই থেকে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার-চীন (বিসিআইএম) প্রকল্পটি নীরবে ঠান্ডা ঘরে চলে যায়।

২০১৬ সালে যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন তখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশ সফর করেন। এই সফরকালে তিনি तत्कालीन বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও সাক্ষাৎ করেন। তখন বাংলাদেশ বিআরআইয়ে যোগ দেয়। কিন্তু তখন বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সম্পূর্ণভাবে ভারতকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করায় করিডোরের প্রশ্নটি আর উত্থাপিত হয়নি। এখন যে করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছে সেটার আনুমানিক দৈর্ঘ্য হবে ১৭ শত কিলোমিটার। এটা কুনমিং থেকে সরাসরি আরাকান বা রাখাইন রাজ্য হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।

গত ২৭ জুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অবস্থান গ্রহণ করেনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইংরেজিতে প্রদত্ত উত্তরে তিনি বলেন, Bangladesh is ‘currently examining’ the proposal and has ‘taken no position’.

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাবের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। কিন্তু ইতো মধ্যেই ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমে এ সম্পর্কে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হচ্ছে। ভারতের শক্তিশালী গণমাধ্যম এনডিটিভিতে এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা মোটামুটি নিম্নরূপ: ভারতের পূর্ব পাশ দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোরের প্রস্তাব এমন এক সময় এসেছে যখন পশ্চিমে পাকিস্তান-চীন ইকোনোমিক করিডোরের মাধ্যমে চীন আরব সাগরে প্রবেশ করার পথ ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছে। ভারত এই করিডোর অর্থাৎ পাকিস্তান-চীন ইকোনোমিক করিডোর নির্মাণে প্রচন্ড আপত্তি জানিয়েছে এই কারণে যে, এটি চলে গেছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের গিলগিট ও বাল্টিস্তানের মধ্য দিয়ে। তাদের মতে, চীন-মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে করিডোরটি নির্মাণ করতে চাচ্ছে সেটি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করার জন্য। এটি তারা করবে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে। যেমনটি তারা করেছে পাক-চীন ইকোনোমিক করিডোর দিয়ে যেটি বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত হয়েছে, যে গভীর সমুদ্র বন্দরটি নির্মিত হয়েছে আরব সাগরে।

॥তিন॥ চীনা প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত করিডোর সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের বাইরেও আরো অনেক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলোর বেশ কটিতে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় অন্য দেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নাই। কারণ, এটি বাংলাদেশের অনুরোধেই করা হয়েছে। যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তাহলে দেশের উত্তরাঞ্চল শুষ্ক মওসুমে মরুকরণের হাত থেকে এবং বর্ষা মওসুমে বন্যার করাল ছোবল থেকে বেঁচে যাবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ৫টি জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। কৃষি কাজে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা যাবে এবং সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলায় বিপুল সহায়তা করবে। এই মহাপরিকল্পনায় শুধু মাত্র যে জলাধার নির্মাণের ব্যবস্থাই থাকবে, তাই নয়, বরং তিস্তার বাংলাদেশ অংশের দুই পাড়ে গড়ে উঠবে জনপদ তথা এই অঞ্চলের হবে নগরায়ন। ॥চার॥ তারেক রহমানের চীন সফর সম্পর্কে লিখেছেন আমেরিকার একজন প্রখ্যাত দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশ কি চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে? ভারতের সঙ্গে অবনতিশীল সম্পর্কের কি হবে? এসব প্রশ্ন সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, চীন ও বাংলাদেশ আগে থেকেই কৌশলগত মিত্র। তবে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের পর দুই দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও উন্নীত করে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গড়ে তোলা হবে।

এছাড়া দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সাধারণত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোর মধ্যেই এ ধরনের ব্যবস্থা চালু থাকে। এমনকি একটি সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে ম্যান্ডারিন ভাষা (চীনা ভাষা) শিক্ষার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাচীনের সফট পাওয়ার সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে বেইজিং বাংলাদেশকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় (SCO) যোগদানের ক্ষেত্রে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অনেকেই ধারণা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সোয়াল বলেছেন যে, বাংলাদেশ সরকারের চীন সফর এবং পরবর্তী পদক্ষেপসমূহ ভারত গভীরভাবে মনিটর করছে। আসলে বাহ্যিকভাবে তারেক রহমানের চীন সফর এবং স্বাক্ষরিত এমওইউ ভারতের জন্য হতাশাব্যাঞ্জক। ইউনূস সরকারের আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একেবারে তলানীতে ঠেকে ছিলো। এর জন্য অবশ্য সম্পূর্ণভাবে dায়ী ছিলো ভারত। তারা একাধিকবার বলেছে যে, তারা নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক করবে।

তাই বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পূর্বেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বেগম জিয়ার মৃত্যুতে শোক বার্তা পাঠান এবং সেই বার্তা পৌঁছে দিতে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে ঢাকা পাঠান। জয়শঙ্কর তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারেক রহমান সরকার গঠন করলে নরেন্দ্র মোদি সর্বপ্রথম তাকে অভিনন্দন জানান। তারেক রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বার্তা নিয়ে আসেন, যেখানে বাংলাদেশের নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সোজা কথায়, ভারত ছিঁড়ে যাওয়া সম্পর্ক মেরামত করার উদ্যোগ নেয়। তারেক রহমানের চীন সফর সম্পর্ক মেরামতের কোনো ইঙ্গিত নয়। এই সরকারের মাত্র ৪ মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। আগামী কয়েকটা মাস দেখতে হবে। তার আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা সমীচীন হবে না।

Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews