স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের রাজনীতি আবারও গরম হয়ে উঠেছে। ৯ জুলাইয়ের পিসি পার্টির মনোনয়ন সভার মাত্র দুই দিন আগে, ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে দলের নির্বাহী পরিচালক মেলানি ক্যালান্ড্রার (Melanie Calandra) পাঠানো এক ইমেইল স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেই ইমেইল থেকে স্পষ্ট হয়, মনোনয়নপ্রত্যাশী মুর্শেদ নিজামকে শেষ মুহূর্তে প্রতিযোগিতার ব্যালট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

আগামী ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের জন্য ওন্টারিও পিসি পার্টির মনোনয়ন সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই সভাকে ঘিরে শুরুতে মুর্শেদ নিজামসহ চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম সামনে এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যালটে থাকছেন তিনজন: আয়েশা সর্দার, গাজী সিজান ও ডা. এএসএম তরুণ।

চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রাদেশিক মনোনয়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ জুলাইয়ের মনোনয়ন সভায় ব্যালট পেপারে তিনজন প্রার্থীর নাম থাকবে। একই চিঠিতে আয়েশা সর্দার, গাজী সিজান ও ডা. এএসএম তরুণের পরিচিতিমূলক ভিডিও লিংক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুর্শেদ নিজামের নাম সেখানে নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, চিঠিতে “all four candidate videos” দেখার কথা বলা হলেও বাস্তবে লিংক দেওয়া হয়েছে তিনজনের। রাজনীতিতে অনেক সময় একটি অনুপস্থিত নামই সবচেয়ে বেশি শব্দ তৈরি করে। এই ইমেইলও ঠিক সেই কাজটিই করেছে।

মুর্শেদ নিজাম কেন বাদ পড়লেন, সে বিষয়ে পিসি পার্টি আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কানাডার দলীয় রাজনীতিতে এটি অস্বাভাবিক নয়। কোনো মনোনয়ন প্রত্যাশীকে স্ক্রিনিং (Screening) বা ভেটিং (Vetting) প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া হলে দল সাধারণত প্রকাশ্যে সুনির্দিষ্ট কারণ জানায় না। এতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষা করা যায়, আবার দলও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বাইরে আনে না। কিন্তু আনুষ্ঠানিক নীরবতা রাজনৈতিক প্রশ্ন থামাতে পারে না। বরং অনেক সময় সেই নীরবতাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।

পিসি পার্টির মতো বড় রাজনৈতিক দলে প্রার্থী নির্বাচন শুধু জনপ্রিয়তা বা কমিউনিটি পরিচিতির ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভেটিং, সদস্য সংগ্রহ, অতীত রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিগত ও পেশাগত রেকর্ড, নির্বাচনী সক্ষমতা এবং দলের বৃহত্তর কৌশল। Provincial Nominations Committee সাধারণত প্রার্থীর অতীত কার্যক্রম, আর্থিক ও করপোরেট নথিপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি, দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার সক্ষমতা এবং নির্বাচনী এলাকার বাস্তব রাজনীতি পর্যালোচনা করে। এই প্রক্রিয়া অনেক সময় বাইরে থেকে কঠোর মনে হলেও দলীয় রাজনীতির ভাষায় এটি প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মুর্শেদ নিজাম পেশায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ফলে তাঁর প্রার্থিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পেশাগত নথিপত্র, করপোরেট ফাইলিং, আর্থিক স্বচ্ছতা বা দলীয় ফরমালিটির কোনো বিষয় কমিটির নজরে এসেছে কি না, তা এখন স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনার অংশ। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই নিশ্চিত অভিযোগের ভাষায় নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষাতেই বলা যায়, স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় কোনো নথিগত, পেশাগত বা প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন কমিটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি আলোচনার জায়গা হলো সদস্য সংগ্রহ। কানাডার দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ে সদস্য সংগ্রহ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে প্রার্থী যত বেশি বৈধ সদস্যকে নিজের পক্ষে সংগঠিত করতে পারেন, তাঁর মনোনয়ন জয়ের সম্ভাবনা তত বাড়ে। কিন্তু এই সদস্য সংগ্রহেরও কঠোর নিয়ম আছে। ঠিকানা, স্বাক্ষর, সময়সীমা, পেমেন্ট পদ্ধতি, ভোটার যোগ্যতা এবং সদস্যপদের বৈধতা সব কিছুই দলীয় দপ্তর যাচাই করে। কোনো বড় অসঙ্গতি দেখা দিলে পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মুর্শেদ নিজামের ক্ষেত্রে সদস্য সংগ্রহ সংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও এখন স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক কৌশল। স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট দীর্ঘদিন ধরে এনডিপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ডলি বেগমের পদত্যাগের পর এই আসনটি নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে এসেছে। গ্লোবাল নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিসি পার্টি এই আসনটি এনডিপির হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে মরিয়া। সেই লক্ষ্যেই জুন মাসে প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের জনপ্রিয় রাজনৈতিক আয়োজন ফোর্ড ফেস্ট স্কারবোরোতে অনুষ্ঠিত হয়। উপনির্বাচনের আগে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে পিসি পার্টির পক্ষে একটি দৃশ্যমান আবহ তৈরি করাই ছিল এর বড় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। পিসি পার্টি জানে, এখানে শুধু দলীয় পরিচয় দিয়ে জয় পাওয়া সহজ নয়। এমন প্রার্থী দরকার, যাঁর কমিউনিটি গ্রহণযোগ্যতা আছে, নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আছে এবং যিনি এনডিপি ও লিবারেল দুই শিবিরের চাপের মুখে ভোট ধরে রাখতে পারবেন। এই জায়গায় ডা. এএসএম তরুণকে ঘিরে দলীয় মহলে আগ্রহ বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। গত ফেডারেল নির্বাচনে কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অন্যদিকে আয়েশা সর্দার ও গাজী সিজানের নাম ব্যালটে থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁরা এখনো খুব বেশি প্রাধান্য পাননি। আয়েশা সর্দার প্যারালিগ্যাল পেশার সঙ্গে যুক্ত, আর গাজী সিজান এইচআর (HR) প্রফেশনাল। তাঁরা দুজনই ব্যালটে থাকছেন, কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখ এখন মূলত ডা. তরুণের দিকে।

উল্লেখ্য, পিসি পার্টির আগেই অন্যান্য দল তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এনডিপি তাদের প্রার্থী হিসেবে ফাতিমা শাবানকে মনোনীত করেছে। অন্যদিকে লিবারেল পার্টির মনোনয়ন সভায় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সংগঠক আহসানুল হাফিজ ফেডারেল এমপি নেট এরসকিন-স্মিথকে মাত্র ১৯ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দলীয় টিকিট পেয়েছেন। ফলে উপনির্বাচনের মূল লড়াই শুরুর আগেই স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে তিন প্রধান দলের রাজনৈতিক হিসাব অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট এখন শুধু একটি আসনের নাম নয়। এটি টরন্টোর বহুসাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি সংবেদনশীল মঞ্চ। এখানে অভিবাসী কমিউনিটি, শ্রমজীবী পরিবার, ছোট ব্যবসায়ী, নতুন প্রজন্মের ভোটার এবং পুরোনো দলীয় আনুগত্য পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই আসনে প্রার্থী বাছাই মানে শুধু একজনকে টিকিট দেওয়া নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া।

এনএন/ ০৮ জুলাই ২০২৬



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews