জাতীয় সংসদে নির্বাচিত মাননীয় সদস্যবৃন্দ জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে তারা নিয়োজিত হবেন। তারা শপথ নিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধান সংরক্ষণ ও লালন করবেন বলে। বাংলাদেশের প্রতি অবিচল আস্থার বিষয়টিও তাদের শপথেই স্পষ্ট উল্লেখ আছে। কিন্তু ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আচরণে সংসদের বাইরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সংগীত অবমাননার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের পরিপন্থি কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে হয়তো সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল আরও আলোচনা করবেন। কিন্তু এটাও অনুমান করা যায়,তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পক্ষে যতই তারা যুক্তি উপস্থাপন করুন না কেন বাইরের সমালোচনাকে থামিয়ে রাখতে পারবেন না।
প্রথম দিনই জামায়াতে ইসলামীর সদস্যগণ ওয়াক আউট করেছেন। মাননীয় স্পিকার এই ওয়াকআউটকে বিরোধী দলের অধিকার বলে মন্তব্য করেছেন। একইসঙ্গে বলেছেন, তারা ওয়াক আউট না করলেই ভালো করতেন। বাইরে এ নিয়ে ভিন্ন আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরোধী দলের প্রথম দিনের বিরোধিতাকে সংসদীয় রীতি অনুযায়ী বিরোধিতা হিসেবে এক্টিভিস্টরা দেখছেন না। হয়তো রাজনৈতিক মঞ্চেও এমনই মন্তব্য উচ্চারিত হচ্ছে এবং হবেও। শুক্রবার রাতে ইউটিউবে দেখলাম বিএনপির সিনিয়র নেতা সাবেক ছাত্রনেতা হাবিবুর রহমান হাবিব এই ঘটনাকে সভ্যতা বর্জিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্পষ্টত বিরোধী দলের প্রতি অভিযোগ আনা হচ্ছে-তারা জাতীয় সংগীতকে অবমাননা করেছেন। যা বাংলাদেশের আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এবং একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তার শপথ ভঙ্গেরও কারণ।
এমনও বলা হচ্ছে গতবছর অধ্যাপক গোলাম আযমের সন্তান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজমি (অব.) জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের যে প্রস্তাব করে জাতীয় সংগীতকে অমান্য করেছিলেন, ত্রয়োদশ সংসদে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির এমপিগণ কি তাই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন কি না।
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা.শফিকুর রহমান ওয়াক আউটের কারণ বর্ণনা করেছেন সাংবাদিকদের সামনে। এ নিয়েও বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ হচ্ছে। সংসদে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় সদস্যদের বসে থেকে জাতীয় সংগীতকে অবমাননার বিষয়টি বিরোধী দলীয় নেতা এড়িয়ে গেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার পর একজন এনসিপি নেতা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে এই বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। এই ব্যাখ্যাটিকেও মানুষ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজার বিষয়টি এমপিগণ বুঝতে পারেননি বলে তারা আসনে বসে ছিলেন।
যে কেউ জানে, রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় সংগীত বাজানো হয় এবং উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। সংসদেও যখনই রাষ্ট্রপতি উপস্থিত হন তখনই জাতীয় সংগীত বাজানো হয়ে থাকে এটা রীতি এবং সবসময়ই হয়ে আসছে। শুধু তাই নয় জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় স্পিকার, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের সদস্যগণ দাঁড়িয়ে সম্মান জানাচ্ছিলেন, এটাও তাদের না দেখার কথা নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির পর জাতীয় সংগীত হবে এটা তারা জানতেন অবশ্যই এবং সরকারি এমপিগণ সম্মান জানাচ্ছেন তারা সেটি দেখেছেনও। তাই তারা জেনেই জাতীয় সংগীতকে অবমাননা করেছেন। এই অভিযোগও এন্তার দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জেড ফোর্স কমান্ডার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন ক্ষমতায়। সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা, দলটির মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন,যাদের অনেকেই এই সংসদে যাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধার দল বিএনপিকে ভাবতে হবে-জাতীয় সংগীতকে অবমাননা এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের জাতীয় মর্যাদায় আসীন করার এই উদাহরণ তাদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলবে কি না?
অথচ কাকতালীয় হলেও অধিবেশনের শুরুটা ছিলো চমৎকার এবং প্রকারান্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মতোই। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বর্ষীয়ান নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতির আসন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাব অনুযায়ী। ড. মোশাররফ শুধু বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যই নন, তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাও। তাঁর সভাপতিত্বে যখন স্পিকার নির্বাচন হলো সেটাও আকর্ষণীয়। এখানেও একজন বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে স্পিকার হিসেবে বাছাই করা হলো। অনেকেই আশায় বুক বাঁধা শুরু করেন দুটি ঘটনা দেখার পর।
কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হাফিজ উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাতেই ব্যত্যয় ঘটতে দেখা গেলো। বিশেষ করে প্রথা অনুযায়ী শোক প্রস্তাব উত্থাপন হলে নাম যুক্ত করার জন্য জামায়াতে ইসলামির পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে। সংসদে শোক প্রস্তাব হওয়ার পরও নাম যুক্ত করার রেওয়াজও পুরনো। কিন্তু একবারেই নতুন ছিলো এবারের প্রস্তাব। স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী,গোলাম আজমদের মতো অনেকের নামে শোক প্রস্তাব গৃহীত হলো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে। জানি না এই শোক প্রস্তাবে ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক, সনজিদা খাতুন, মুস্তাফা জামান আব্বাসী, ফরিদা পারভীন,অঞ্জনা রহমান,প্রবীর মিত্রসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল মজিদের নাম আছে কি না।
ঘটনাক্রমে একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্তদের নামে শোক প্রস্তাব উত্থাপন মাধ্যমে এই সংসদ উল্লিখিত ব্যক্তিদের একাত্তরের ভূমিকাকে বৈধতা দিচ্ছে এটুকু বলা বোধ করি বাড়িয়ে বলা হবে না। ত্রয়োদশ সংসদের এই শোক প্রস্তাবের বিষয়টি শুধু একটি দিনের ঘটনা হিসেবে নয় ভবিষ্যতে ব্যাপক আলোচনার বীজ বুনে দিলো এটা অবশ্যই বলতে হবে।
ইতোমধ্যে সংসদের বাইরে সিপিবি, বাসদ, উদীচী, ছাত্র ফেডারেশন ও বুদ্ধিজীবীদের অনেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে শোক প্রস্তাব বিষয়ে। তারা দাবি জানিয়েছে, শোক প্রস্তাব থেকে একাত্তরে পাকিস্তানিদের পক্ষে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বিরোধী পক্ষের চিহ্নিত ব্যক্তিদের নাম প্রত্যাহার করার জন্য।
জামায়াতে ইসলামী তাদের নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আগে থেকেই। বিচারের রায় বিপক্ষে গেলে এমন প্রশ্ন শাস্তিপ্রাপ্তরা সবসময়ই তোলে। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হতে পারে কিন্তু যেসব ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে একাত্তরে তাদের ভূমিকা কি অজানা?
এই শোক প্রস্তাব শুধু একাত্তরকেই অপমান করা হয়নি, জুলাই অভ্যুত্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এক্ষেত্রেও জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বক্তব্যকে স্মরণ করা যেতে পারে। ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই সংসদ জুলাইয়ের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মোটামুটিভাবে সব সংসদ সদস্যই এমনটা বলবেন এও মনে করা যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান কি তাহলে একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের জাতীয় বীরের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশে হয়েছিল? আরও সহজভাবে বলতে গেলে এই অভ্যুত্থান কি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে হয়েছিল?
সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সংসদসদস্যগণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সংবিধান মেনে তারা শপথ নিয়েছেন, সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়ে তাদেরই কেউ কেউ ইতিপূর্বে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েছেন। এই সংবিধানের নির্দেশনাতেই রাষ্ট্রপতি যখন সংসদে ভাষণ দিতে এলেন তখন রাষ্ট্রপতিকে অপমান করার অর্থ কিন্তু সংবিধানের পরিপন্থি হয়, এটা বোধ করি যে কেউ বুঝবেন। আজকে বিরোধী দলীয় নেতা রাষ্ট্রপতিকে যে অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন এই অভিযোগ কি ২০২৪ এর ৮ আগস্টে ছিল না? তাঁর ও তাঁর দলের নেতাদের নিয়ে তিনি একাধিকবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন,তাদের উপস্থিতিতেই সরকার গঠন হয়েছে তখন তিনি এই অভিযোগ থেকে মুক্ত ছিলেন? ওই সময় যৌক্তিক হলে এই মুহূর্তে কেন তিনি খুনির সহযোগী হয়ে যান?
এই প্রশ্নের জবাব তাদেরই দিতে হবে। নাকি সংসদকে কুরুক্ষেত্র বানানোর আগাম বার্তা দেওয়া হলো এই বিতর্কিত পদক্ষেপের মাধ্যমে। বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ অনুষ্ঠান না হওয়ার দায়ও রাষ্ট্রপতির। এই বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আওতায়। সংসদে সরকারি দলের সঙ্গে তারা সমঝোতায় আসতে পারেননি এর দায় কেন রাষ্ট্রপতিকে নিতে হবে। আর সরকারি দল কিন্তু বলেনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তারা শপথ নেবেন না। তারা স্পষ্ট বলেছেন সংবিধানের ভিত্তিতে তারা ব্যবস্থা নেবেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জেড ফোর্স কমান্ডার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন ক্ষমতায়। সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা, দলটির মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন,যাদের অনেকেই এই সংসদে যাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন। এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধার দল বিএনপিকে ভাবতে হবে-জাতীয় সংগীতকে অবমাননা এবং একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধীদের জাতীয় মর্যাদায় আসীন করার এই উদাহরণ তাদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলবে কি না?
লেখক : সাংবাদিক,শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
এইচআর/জেআইএম