কবি গোলাম মোস্তফা লিখিয়াছেন, ‘সারা মুসলিম দুনিয়ায় আজি এসেছে নামিয়া, শবেবরাত,/ রুজি-রোজগার-জান-সালামত বণ্টন করা পুণ্য রাত'। প্রকৃতপক্ষে পবিত্র শবেবরাত হইল এক মহিমান্বিত ও মুক্তির রজনি। ইহা আত্মার পুনর্জাগরণের আহ্বান, করুণা, ক্ষমা ও তাকদিরের আলোয় ভরা এক আলোকিত রাত্রি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র এই রাত্রে তাহার বান্দাদের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্যতীত উন্মুক্ত করেন ক্ষমার দরজা। এইখানে ‘শব' শব্দটি ফারসি, যাহার অর্থ রজনি। আর ‘বরাত' শব্দটি আরবি, ইহার অর্থ ‘মুক্তি'। সুতরাং শবেবরাত অর্থ ‘মুক্তির রজনি’। আরবি ভাষায় পবিত্র এই রজনিকে ‘লাইলাতুল বারাআত' এবং হাদিসের ভাষায় ‘লাইলাতুম মিন নিছফি শাবান' বা মধ্য-শাবানের রাত্রি বলা হয়।
কালামুল্লাহ শরিফে বলা হইয়াছে, ‘আমি ইহাকে (কুরআনকে) নাজিল করিয়াছি এক বরকতময় রাত্রে, নিশ্চয় আমি ভীতি প্রদর্শনকারী। এই রাত্রেই প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। (সুরা দুখান : ৩-৪) উপরিউক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রায় ১২টি প্রসিদ্ধ তাফসির গ্রন্থে ‘বরকতময় রাত্রি' দ্বারা শাবান মাসের ১৫তম রজনি তথা লাইলাতুল বরাতকে বুঝানো হইয়াছে। মুফাসসিরে কেরামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই রাত্রি হইল সেই সময়, যখন আল্লাহ তাআলা আগামী এক বৎসরের রিজিক, মৃত্যু ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেন। উল্লেখ্য, মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত, যাহা পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বৎসর আগেই নির্ধারণ করা হইয়াছে। তবে এই রাত্রে এক বৎসরেরটি প্রকাশ করা হয়। যেমন—হজরত আয়েশা (রা.) হইতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তুমি কি জানো, অর্ধ শাবানের রাত্রের কার্যক্রম কী?' আয়েশা (রা.) বললেন, ‘না, হে আল্লাহর রসুল ৷' নবি (সা.) বললেন, ‘এই বৎসর যতজন সন্তান জন্মগ্রহণ করিবে এবং মারা যাইবে, তাহা লিপিবদ্ধ করা হয়। এই রাত্রেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয় এবং এই রাত্রেই তাহাদের রিজিক অবতীর্ণ হয়।' (মিশকাত) এই জন্য সিহাহ্ সিত্তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ সুনানে তিরমিজি ও ইবনে মাজাতে এই রাত্রির ফজিলত প্রসঙ্গে পৃথক অধ্যায় রচনা করা হইয়াছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে মুসলিম সমাজে ছয়টি রাত্রিকে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। শবেকদর সম্বন্ধে পবিত্র কুরআনে পূর্ণাঙ্গ একটি সুরা রহিয়াছে। আর অবশিষ্ট রাত্রিগুলি সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.) এক হাদিসে স্পষ্ট বিবরণ দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, পাঁচটি রাত্রি এমন আছে, যাহাতে কোনো দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। সেই রাত্রিগুলি হইল— জুমার রাত্রি, রজব মাসের প্রথম রাত্রি, শবেবরাতের রাত্রি, দুই ঈদের রাত্রি ও শাবান মাসের মধ্যরাত্রি (শবেবরাত)। (মুসান্নেফে আবদুর রাজ্জাক, শুআবুল ইমান) এই জন্য হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হইতে বর্ণিত, রসুলে করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ১৫ শাবানের রাত্রে মহান আল্লাহ তায়ালা তাহার বান্দাদের ক্ষমা করিয়া দেন, তবে দুই ব্যক্তি ব্যতীত। এক. যে পরশ্রীকাতর, দুই. যে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে। (মুসনাদে আহমদ)। সুতরাং এই রাত্রে মুসলমানদের করণীয় হইল—নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তেগফার করা, কবর জিয়ারত করা এবং পরবর্তী দিন রোজা রাখা ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালা এই রাত্রে আরো কয়েক শ্রেণির লোকদের ক্ষমা না করিবার ঘোষণা দিয়াছেন। তাহারা হইলেন—শিরককারী, জিনাকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্নকারী, মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি, অত্যাচারী শাসক, ঘুষ গ্রহণকারী ও টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী। তবে তাওবাতুন নাসুহা করিলে আশা করা যায় আল্লাহ তায়ালা তাহাদেরও ক্ষমা করিয়া দিবেন। আমাদের উচিত এই সকল ভয়াবহ অপরাধ হইতে বিরত থাকা। এই রাত্রে আতশবাজি না করিয়া এবং মুসল্লিদের ইবাদতে কোনোরূপ বিঘ্ন সৃষ্টি না করিয়া একনিষ্ঠভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকাই বাঞ্ছনীয়। এই রাত্রি আমাদের শিখায়, দোয়া, তওবা এবং নেক আমল জীবনকে বদলাইয়া দিতে পারে। তাই শবেবরাতের ইবাদত-বন্দেগির ব্যাপারে আমাদের অবহেলা করা অনুচিত।