হাজার বছরের কৃষিনির্ভর এই বদ্বীপের কৃষিতে গত কয়েক দশকে যে অভাবনীয় রূপান্তর ঘটেছে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্ভবত আমাদের পোলট্রি খাত। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার জীবনে দেখেছি, কীভাবে গ্রামের প্রান্তিক কৃষকের উঠোনে ঘুরে বেড়ানো গুটি কয়েক দেশি মুরগি থেকে আজ এই খাতটি একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। আজ থেকে ২০-২২ বছর আগে, যখন বাংলাদেশে পোলট্রি খাত অনেকটা কুটিরশিল্পের মতোই ধিকিধিকি করে জ্বলছিল, তখন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো উৎপাদনের সাহস দেখিয়েছিলেন এ দেশেরই কিছু সাহসী উদ্যোক্তা। তাঁদেরই একজন কায়সার আহমেদ ও তাঁর ভাই আলিফ খান। মনে পড়ে, ২০০৪-০৫ সালে ঢাকার বেরাইদে ওমেগা পোলট্রি নামে প্রথম আধুনিক প্রযুক্তির পোলট্রি খামার গড়েছিলেন এই দুই ভাই। হাতের স্পর্শ ছাড়াই কনভেয়ার বেল্টে ডিম এনে প্যাকেটজাত করা বিষয়টি সে সময় আমার প্রতিবেদনে তুলে ধরেছিলাম। যা অনেক উদ্যোক্তাকেই আধুনিক পোলট্রি খামার গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করেছিল। বছর তিনেক আগে ডায়মন্ড এগের কার্যক্রম তুলে ধরেছিলাম। আধুনিক খামারে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে তাঁরা প্রতিদিন উৎপাদন করছেন ২০-২১ লাখ ডিম। যা হোক, সম্প্রতি কায়সার আহেমেদের আরও একটি প্রতিষ্ঠান ‘ডায়মন্ড চিকস’-এর কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো।
প্রতিষ্ঠানটির ভিতরে যাওয়ার আগে কায়সার আহমেদ তাঁদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ব্লু-প্রিন্ট দেখালেন। আজকের বাংলাদেশে পোলট্রি খাতের যে উন্নয়ন দেখছি, যে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেখতে পাই, তার পেছনে কায়সার আহমেদের মতো উদ্যোক্তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আজ দেশের ডিম ও মুরগি উৎপাদনকারী বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি পরিচালনা করছেন তাঁরা। তাঁদের শেডে শেডে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। তবে সেখানে প্রবেশের আগে নিতে হলো জৈবনিরাপত্তাসংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও প্রস্তুতি। কারণ আধুনিক কৃষির প্রথম শর্তই হলো নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি। গোসল সেরে, নতুন কাপড় পরে ঢুকতে হলো। মনে পড়ল, বছর ২০ আগে চীনের শ্যাংডঙে একটি পোলট্রি ফার্মে প্রবেশের আগে এমন গোসল সেরে, রীতিমতো সেনাবাহিনীর মতো পোশাক পরে নিতে হয়েছিল। যা হোক, ডায়মন্ড চিকসের কর্মকর্তা নারায়ণ সাহা জয়ন্ত তাঁদের কার্যক্রম দেখাতে নিয়ে এলেন। সেখানে একেকটি শেডে চলছে ডে-ওল্ড চিকস বা এক দিনের বাচ্চার জন্য উর্বর ডিম উৎপাদনের বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রতিটি শেডেই নির্দিষ্ট অনুপাতে খাঁচায় রাখা আছে মুরগি ও মোরগ। তবে এখানে প্রজননের পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আধুনিক। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, পোলট্রিতে আবার কৃত্রিম প্রজনন বা আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশন কী? এটি হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে মোরগের স্বাভাবিক শারীরিক মিলন ছাড়াই বৈজ্ঞানিক উপায়ে মুরগির ডিম উর্বর করা হয়। প্রজননের জন্য প্রথমেই খুব ভালো ও সুস্থ মোরগ বেছে আলাদা খাঁচায় রাখতে হয়। প্রক্রিয়ার সময় মোরগগুলো যেন ভয় না পায়, সেজন্য আগে থেকেই কয়েক দিন তাদের পেটের নিচে হালকা মালিশ করে মানুষের স্পর্শে অভ্যস্ত করা হয়। বীজ সংগ্রহের সময় দুজন কর্মীর প্রয়োজন হয়। একজন মোরগটিকে শক্ত করে ধরে রাখেন এবং অন্যজন মোরগের পেটের নিচে ও পেছনের দিকে আলতো করে মালিশ করতে থাকেন। মোরগ এতে সাড়া দিলে খুব সাবধানে একটি ছোট পরিষ্কার কাচের পাত্রে বীজ সংগ্রহ করা হয়।
সুস্থ মোরগের বীজের রং দেখতে সাধারণত সাদা বা ক্রিমের মতো হয়। এতে রক্ত বা কোনো ময়লার মিশ্রণ থাকলে তা সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিতে হয়। একসঙ্গে অনেকগুলো মুরগিকে প্রজনন করানোর জন্য অনেক সময় এই বীজের সঙ্গে বিশেষ তরল মিশিয়ে এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। গুণাগুণ ঠিক রাখতে বীজ সংগ্রহের আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই তা ব্যবহার করতে হয়। মুরগির শরীরে বীজ দেওয়ার সময়ও দুজন মানুষের দরকার হয়। একজন মুরগিটিকে ধরে পেটের দিকে হালকা চাপ দেন, যাতে প্রজনন অঙ্গের মুখটি সামান্য বাইরে বেরিয়ে আসে। অন্যজন একটি ছোট সিরিঞ্জ বা পাইপের সাহায্যে পরিমাণমতো বীজ মুরগির ভিতরে দিয়ে দেন। সিরিঞ্জ দিয়ে বীজ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেটের চাপ ছেড়ে দিয়ে মুরগিকে স্বাভাবিক হতে দেওয়া হয়, যাতে বীজ ঠিকমতো ভিতরে জমা থাকে। এই কৃত্রিম প্রজননের দারুণ সব সুবিধা রয়েছে, যা আমাদের পোলট্রি শিল্পকে খাদের কিনারা থেকে বিশ্বমানের কাতারে নিয়ে যেতে পারে। নারায়ণ সাহা জয়ন্ত জানালেন, এ প্রক্রিয়ায় ১টি মোরগ দিয়েই ৮০-১০০টি মুরগির প্রজনন সম্ভব। যেখানে প্রাকৃতিক উপায়ে ১টি মোরগে মাত্র ৫-১০টি মুরগির প্রজনন হতো। মোরগের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমে যাওয়ায় খামারির মোরগের খাবার ও জায়গার বিশাল খরচ বেঁচে যায়। সঠিক নিয়মে প্রয়োগের ফলে ডিমের উর্বরতা বা বাচ্চা ফোটার হার ৯০ শতাংশের বেশি নিশ্চিত হয়। প্রজনন হয় শতভাগ সফল। মোরগ-মুরগির সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ থাকে না, তাই প্রজননতন্ত্রের ছোঁয়াচে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকে শূন্য। একটি মাত্র উচ্চ গুণসম্পন্ন ও নীরোগ মোরগ থেকেই খুব সহজে হাজার হাজার উন্নত জাতের বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব হয়।
ডায়মন্ড চিকসের শেড থেকে উৎপাদিত ডিম চলে যায় বাচ্চা উৎপাদনের শেডে। কায়সার আহমেদের সঙ্গে দেখতে গেলাম ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন কার্যক্রম। এই শেড থেকেই বছরে ৪ থেকে ৫ কোটি ‘ডে-ওল্ড চিকস’ বা এক দিনের বাচ্চা উৎপাদন হয়। প্রথমে আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশনের মাধ্যমে উৎপাদিত ডিম এনে রাখা হয় বিশেষ চেম্বারে। সেখান থেকে ৩টি ধাপে চলে বাচ্চা উৎপাদনের কাজ। প্রথম ধাপে ডিমগুলোকে ১৮ দিন রাখা হয় আধুনিক ইনকিউবেটরে। দ্বিতীয় ধাপে হয় ডিম বাছাইয়ের নিবিড় কাজ। বাছাই শেষে তৃতীয় ধাপে ডিমগুলোকে আরও ৩ দিন রাখা হয় বিশেষ হ্যাচারি ইনকিউবেটরে। মোট ২১ দিন পর ডিম ফুটে বেরিয়ে আসে মুরগির বাচ্চা। পৃথিবীর আলো দেখে নতুন প্রাণ। তারপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভ্যাকসিনেশন শেষে কালার বার্ড, মেইল ও ফিমেইল বাচ্চা আলাদা করে চলে যায় দেশের ভিন্ন ভিন্ন বাজারে।
কায়সার আহমেদ জানালেন, কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি কেবল আমাদের দেশেই নয়, উন্নত বিশ্বে পোলট্রি শিল্পের চেহারাই বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি কিংবা ব্রাজিলের মতো দেশগুলো আজ বিশ্ব পোলট্রি বাজারে যে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, তার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার এই কৃত্রিম প্রজনন। উন্নত দেশগুলোতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা ‘জেনেটিক সিলেকশন’ বা জিনগত বাছাইয়ের কাজটি নিখুঁতভাবে করেছে। তারা বেছে বেছে কেবল সেই মোরগগুলোকেই প্রজননের জন্য ব্যবহার করেছে, যেগুলো দ্রুত বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং মাংস বা ডিম উৎপাদনের হার সর্বোচ্চ। এর ফলে তাদের পোলট্রি শিল্পে ‘ফিড কনভার্শন রেশিও’ অভাবনীয়ভাবে উন্নত হয়েছে, অর্থাৎ কম খাবার খেয়ে মুরগি বেশি মাংস বা ডিম দিচ্ছে। পাশাপাশি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর মতো মহামারি থেকে পোলট্রি শিল্পকে বাঁচাতে বায়োসিকিউরিটির সর্বোচ্চ স্তর নিশ্চিত করতে কৃত্রিম প্রজনন উন্নত বিশ্বে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। আজ তারা যে শতভাগ রোগমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করছে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছে এই বৈজ্ঞানিক প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমেই।
দেশের মোট জিডিপিতে পোলট্রি খাতের অবদান আজ প্রায় ১.৮১ শতাংশ। এই খাতে বর্তমানে বছরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে, যা রীতিমতো বিস্ময়কর। বিনিয়োগ রয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ, যাদের বড় অংশই গ্রামীণ তরুণ ও নারী, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন।
বর্তমানে সারা দেশে দিনে আড়াই থেকে পৌনে তিন কোটির বেশি ডিম উৎপাদন হচ্ছে। বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন পোলট্রি মাংস উৎপাদন করছেন দেশের খামারিরা। এই বিশাল উৎপাদন সরাসরি ভূমিকা রাখছে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় ও মানুষের প্রোটিন বা পুষ্টি চাহিদা পূরণে। ডায়মন্ড চিকসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক উৎপাদন কৌশল নিশ্চিত করছে পোলট্রির গুণগতমান। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন সময় এসেছে এরকম উত্তম অনুশীলনে উৎপাদিত পণ্য বাইরের আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার। পোলট্রি শিল্পে দেশে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তা এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে আটকে থাকার নয়। সম্ভাবনাময় এই খাতের সম্প্রসারণে এবং পোলট্রি পণ্য বিশ্ববাসীর ডাইনিং টেবিলে পৌঁছে দিতে সরকার, উদ্যোক্তা এবং গবেষক, সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমাদের কৃষির এই সোনালি রূপান্তর পাবে তার সত্যিকারের পূর্ণতা।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব