বাড়ছে বিকৃত রুচির রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড

দেশজুড়ে মাদকাদ্রব্য ও পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ। ইন্টারনেটে অবাধ বিচরণের কারণে কিশোর-কিশোরী এমনকি শিশুরাও পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের চিন্তাভাবনা, সম্পর্ক এবং আচরণে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে বিকৃত মানসিকতা।

সম্প্রতি গাজীপুরে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে মাদকসক্ত ফোরকান। মাদক তার মস্তিষ্কে এতটা বিকৃতি ঘটায় যে একে একে নিজের তিনটি শিশু সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করতে তার হাত কাঁপেনি। একই সাথে স্ত্রীকে জানালার সাথে বেঁধে কুপিয়ে হত্যা করে। সেই সাথে পরিবারের সাথে থাকা শ্যালককেও হত্যা করে ফোরকান। অপর দিকে রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মাথা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। শিশু ধর্ষণের এমন আচরণ পর্নোগ্রাফির বিকৃত রুচির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু রামিসাই নয়, সম্প্রতি শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো এই পর্নোগ্রাফির প্রভাব, যা ক্রমেই সামাজিক উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই প্রবণতা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুধু ব্যক্তির নৈতিক ও মানসিক অবয়ই ঘটাচ্ছে না, বরং নানা ধরনের ভয়ঙ্কর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদক ও অশ্লীল কনট্যান্টে আসক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় সহিংসতা, যৌন অপরাধ, চুরি, ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল এবং সাইবার অপরাধের মাত্রা বাড়ছে।

মাদকের বিস্তার ও অপরাধপ্রবণতা

কারিতাসের মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসনকে বারাকার থেরাপিউটিক কমিউনিটি ইনচার্জ মো: জাকিউল আলম মিলটন নয়া দিগন্তকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাদক ও পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার সাথে ভয়ঙ্কর অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে উত্তেজক শ্রেণীর মাদক, যেমন ইয়াবা ও আইস-এর ব্যাপক বিস্তার। এ ধরনের মাদক ব্যবহারের ফলে অস্বাভাবিক মাত্রায় স্নায়বিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। অনেক মাদকসেবী মাদক গ্রহণের পর পর্নোগ্রাফিভিত্তিক ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে থাকে। দীর্ঘ দিন ইয়াবা সেবনের ফলে তাদের মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা (চধৎধহড়রধ) এবং বিভ্রম বা ভ্রান্ত বিশ্বাস (উবষঁংরড়হ)-এর মতো গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তারা মনে করতে শুরু করে যে পরিবার ও আশপাশের মানুষ তাদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক আচরণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীকেও তারা সেই কল্পিত শত্রুর তালিকায় প্রথম সারিতে স্থান দেয়।

এভাবেই তারা তাদের কাল্পনিক শত্রুদের বিরুদ্ধে বাস্তব সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের মাদকসেবীদের বাস্তবতা যাচাই ও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে তারা ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কখনো তারা যৌন সহিংসতা, কখনো আক্রমণাত্মক বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে এসব কর্মকাণ্ডই ভয়াবহ অপরাধের জন্ম দিতে পারে।

তিনি আরো বলেন, মাদকসেবন, মানসিক রোগ এবং অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক জটিল। সব মাদকসেবী বা সব মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অপরাধে জড়ান না। তবে কিছু ক্ষেত্রে উত্তেজক মাদকের প্রভাবে বিচারক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবতা উপলব্ধির মতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা বাড়ায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নেশার অর্থ জোগাড় করতে অনেকেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি কিংবা প্রতারণার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদকাসক্তদের একটি অংশ অপরাধ সংঘটনের সময় স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় থাকে না, ফলে তারা অধিক সহিংস আচরণ প্রদর্শন করে।

ভালো হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি বলেন, বর্তমান সময়ে বাজারে থাকা মাদকগুলোর বেশির ভাগই উত্তেজক, যা সেবন করলে শরীর অস্বাভাবিক আচারণ শুরু করে। ওই ব্যক্তি চলে যান কল্পনার জগতে। তখন কল্পনাতে নানা ধরনের অপরাধমূলক কল্পনা ঘুরপাক খায়। এ সময় হাতে থাকা মোবাইলে সহজেই পাওয়া যায় বিকৃতরুচির পর্নোগ্রাফি, যা দেখে কল্পনার জগতে নিজেকে ওই পর্নোগ্রাফিতে অবিষ্কার করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তা বাস্তবে রূপ নিতে যৌনচারের জন্য যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘাটাতে দ্বিধাবোধ করে না। কারণ তখন তার স্বাভাবিক বোধ কাজই করে না। পাশের দেশ থেকে আসা পর্নো কন্ট্যান্টগুলো খুবই কুরুচিপূর্ণ হয়ে থাকে। সেগুলো ভাষা বাংলা এবং হিন্দিতে হওয়ায় শিশু-কিশোররা সহজেই বুঝতে পারে। মাদকে আসক্ত হয়ে এক সময় ওই ধরনের আচরণ করতে নিজেদের অবিষ্কার করে।

তিনি আরো বলেন, মাদকের ক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ওই ব্যক্তি প্রচণ্ড ধরনের অনুশোচনায় ভোগে। এক পর্যায়ে পাগল পাগল হয়ে যায়। তখন ওই অপরাধ ভুলতে এবং নিজেকে বাঁচাতে আরো বেশি মাদক গ্রহণ করতে থাকে।

পর্নোগ্রাফির অন্ধকার প্রভাব

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফি আসক্তি ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, গোপনে ভিডিও ধারণ, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল কিংবা অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পর্নোগ্রাফি দেখা মাত্রই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। তবে আসক্তি, বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্যান্য সামাজিক-মানসিক সমস্যার সাথে মিলিত হয়ে এটি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিশোর অপরাধে নতুন মাত্রা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মাদকাসক্তি, অনলাইন অপসংস্কৃতি, পারিবারিক অবহেলা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার মিলিয়ে অনেক কিশোর অপরাধে ঝুঁকে পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনুপযুক্ত কনটেন্টে প্রবেশ তাদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর মো: রেজাউল করিম সোহাগ নয়া দিগন্তকে বলেন, আকাশ সংস্কৃতির কারণে হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদক ও পর্নোগ্রাফি। বেশির ভাগ অপরাধই মাদক সংশ্লিষ্ট। এই অপরাধগুলো এতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে যে অপরাধীরা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা লাশগুলো টুকরো টুকরো করে ফেলছে। একটা মানুষের মস্তিষ্ক কতটা বিকৃত হলে লাশ টুকরো টকুরো করে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, দেশে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয়ে থাকে। এই টাকা কারা পাচ্ছে? শুধু মাদক কারবারিরা পাচ্ছে এমনটি নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্য থেকে শুরু করে রষ্ট্রের বিভিন্ন মহলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমানে মাদকের বিস্তার এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে গ্রাম অঞ্চলেও শিশু-কিশোররা সহজেই মাদকাসক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাদকের গডফাদাররা বুঝতে চাইছেন না তাদের অধিক মুনাফার জন্য একটি জেনারেশন শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আইন প্রণয়ন ও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ছাড়া এই অপরাধ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির (আইইউবি) প্রফেসর, সায়েন্টিস্ট-বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন, ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, পর্নোগ্রাফি ও মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রিসার্চ অনুযায়ী ছেলেদের মধ্যে এই দু’টি অপরাধের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ ছেলেদের অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট ফল করছে। তিনি বলেন, এরা রাতে না ঘুমিয়ে হাতের ভেতর থাকা মোবাইলে পর্নোগ্রাফি দেখতে থাকে। ’৯০-এর দশকে ভিসিআর মাধ্যমে ব্লু ফিল্ম দেখতে হতো। তা-ও আবার লুকিয়ে। কিন্তু ইন্টারনেটের এই যুগে তা চলে আসছে হাতের মুঠোয় মোবাইলে। আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক ভিডিও তৈরি করছে। এ থেকেই বিকৃত সব ভয়ঙ্কর অপরাধের জন্ম হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সরকারকে মাদক এবং পর্নোগ্রাফি ইস্যুকে বড় মনে করে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরো বিপথগামী হয়ে দ্রুত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews