গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়া থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এই সংকট নড়বড়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে। অর্থনীতির গতি বাড়ার পরিবর্তে ধীর হয়ে পড়ছে। সংকট কতটা গভীর, তা গতকাল একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি গার্মেন্ট শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটের কারণে মেশিনারিজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং শ্রমিকরা বসে অলস সময় কাটাচ্ছে, এমন ছবি থেকে বোঝা যায়। গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীসহ সারাদেশে বিগত অনেকদিন ধরে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। কখন গ্যাস আসবে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আসলেও গ্যাসের যে চাপ থাকে, তাতে চুলা টিমটিম করে জ¦লে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তারা সরকারের ওপর নারাজ হচ্ছে। যদিও বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। তবে গ্যাসের এই সংকট নতুন কিছু নয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময় থেকেই এ সংকট চলে আসছে। তা এখন তীব্র হয়েছে। কোনোভাবেই যেন এ সংকট ঘুচানো যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য, উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে গ্যাস-বিদ্যুতের বিকল্প নেই। দেশের অর্থনীতির উন্নতি করতে হলে, এই দুই অত্যাবশ্যকীয় উপকরনের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল দুটি ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার ও নিউ এজে অর্থনীতির দুরবস্থা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের শীর্ষ রফতানি পণ্য গার্মেন্ট খাতে দুরবস্থা চলছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রফতানিও কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বৈশি^ক অর্থনীতির মন্দাবস্থা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতাদের চাহিদা কমেছে, বিদেশি বায়াররা অনেক অর্ডার স্থগিত করে রেখেছে এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদনে ধীরগতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণত বছরের মাঝামাঝি থেকে বিদেশি বায়াররা বড়দিন উপলক্ষে সবসময়ই বেশি পোশাক আমদানির অর্ডার দেয়। এই সময়টা দেশের গার্মেন্ট শিল্পের পিকটাইম। ছোট-বড় সকল কারখানায় দিনরাত উৎপাদন চলে। এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, অর্ডার কমে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বড় বড় গার্মেন্ট কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। এতে বড়দিন উপলক্ষে যে রফতানি বাণিজ্য হওয়ার কথা, তা অনেক কমে যাবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইরানযুদ্ধে বৈশি^ক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার কারণে বেশ কয়েক মাস ধরেই গার্মেন্টের বড় আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি কমে গেছে। অন্যদিকে, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামত করে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে স্বতঃস্ফূর্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দরকার, তাতে কোনো সুখবর নেই। উল্টো বিদেশি বিনিয়োগ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নিউ এজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ^ব্যাংক প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন রফতানি খাতে কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্পে যে ৩১.৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল, তা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও তা কাজে লাগানোর ব্যর্থতায় বাতিল করেছে। এটি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত। এদিকে, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীও বলেছেন, দেশ যে অর্থনীতির কঠিন পরিস্থিতি পার করছে এবং বিনিয়োগের যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ হচ্ছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পলিসি নির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এসব সমস্যার কারণে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারিরা অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার মধ্যে রয়েছে। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে বার্ষিক কর্মসূচি থাকে, সেই এডিপি এখন বিগত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিন্মে অবস্থান করছে। এসব সূচক ও চিত্র থেকে বোঝা যায়, দেশের অর্থনীতি কতটা শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা অত্যন্ত ভারি হয়ে যাচ্ছে, যা টেনে তোলা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে অর্থনীতিকে টেনে তোলার জন্য সরকার স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং এর সুফল পেতে সময় লাগবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদ্যমান শিল্পকারখানার উৎপাদন গতিশীল করতে হবে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি পুরনো বাধা হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর দক্ষতা ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশ^ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপুল অর্থ ফেরত চলে যাওয়া। এছাড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ প্রক্রিয়া ঠিকমতো বাস্তবায়ন না করাসহ বিনিয়োগকারিদের বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং উপযুক্ত অবকাঠামো, যাতায়াত ব্যবস্থা মসৃণ, গ্যাস-বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার অনিশ্চয়তা রয়েছে। একজন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারিকে যখন এসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়, তখন সে কেন বিনিয়োগ করবে?
যেকোনো দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির বিকল্প নেই। অর্থনীতি যদি চাঙ্গা না হয়, স্থবির থাকে এবং জনগণ তা থেকে সুফল না পায়, তাহলে তা যেকোনো সরকারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। জনগণ সরকারের উপর ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ হয়। বলা বাহুল্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছলতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের প্রধানতম উপায়। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন শুধু রাজনৈতিক বা তার কুশাসনের কারণে হয়নি, এর অন্যতম কারণ ছিল, অর্থনীতির করুণ পরিস্থিতি। জনগণের আর্থিক পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে, তারা রাস্তায় নেমে জীবন দিয়ে হাসিনাকে বিদায় করেছিল। ভারতে মোদির গদি যে টলটলায়মান, তার পেছনেও অর্থনীতি প্রধান কারণ। দেশটির তরুণ সমাজ বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে মোদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যে সরকার পতন হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। বর্তমান সরকারের সামনে এসব দৃষ্টান্ত জ¦লজ¦ল হয়ে আছে। ফলে দেশের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করানো এবং জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। সরকার যে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চাচ্ছে, সে লক্ষ্যে পৌঁছতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে দ্রুতায়িত করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকা- শুরু করেছে। চীন, সউদী আরব, মালয়েশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারিদের সাথে যোগাযোগ করছে এবং বিনিয়োগে আহ্বান জানাচ্ছে। এসব দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের এ আগ্রহ ও আশ^সকে কাজে লাগাতে হবে।
বিনিয়োগকারিদের নিয়ে আসতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি ও আশ^াস দিয়েছিল। তবে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তাদের সেসব আশ^াস ও প্রতিশ্রুতি বাস্তাবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের সময়ও বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের এই আগ্রহকে কাজে লাগানোর জন্য তাকে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য, তাদের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বিনিয়োগের পথ সহজ ও নিরাপদ করতে হবে। কোনো ধরনের বাধায় যাতে তারা হতাশ হয়ে ফিরে না যায়, এমন ব্যবস্থা করতে হবে। যা করতে হবে দ্রুত করতে হবে। অর্থনীতিকে যদি দ্রুত স্বাভাবিক ও স্বস্তিদায়ক করা না যায়, তাহলে জনঅসন্তুষ্টি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে। সেটা সরকারের জন্য সুখকর হবে না। সরকার দেশের অর্থনীতির আকার ট্রিলিয়ন ডলারের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা চীনসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগের যে আগ্রহ, তা কাজে লাগাতে পারলে দেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশ লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সরকারকে কঠোর হতে হবে। মন্ত্রী, এমপি, প্রশাসনকে দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখাতে হবে। যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্প রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। রফতানি ও উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে।