১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যায় নিহত শহীদদের স্মরণে পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার লক্ষীপুর বধ্যভূমিতে নির্মিত শহীদ স্মৃতিসৌধের বিভিন্ন অংশ রাতের আঁধারে দূর্ধর্ষ চুরি ও ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে স্মৃতিসৌধের প্রধান ফটক ভেঙে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে রাতের বেলায় বধ্যভূমি ও স্মৃতিসৌধটি নেশাগ্রস্তদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরে রাতের আঁধারে লক্ষীপুর বধ্যভূমির শহীদ স্মৃতিসৌধের বিভিন্ন স্থানে থাকা মোটা স্টিলের পাইপ, বৈদ্যুতিক তার, বিদ্যুতের মিটার, সুইচ, লাইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে সংবদ্ধ চোরের দল। এতে ধীরে ধীরে স্মৃতিসৌধটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ওইদিন রাতে দুর্বৃত্তরা স্মৃতিসৌধের মূল ফটক ভেঙে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি নজরে এলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থাপনা এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, লক্ষীপুর বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালের গণহত্যায় নিহত শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের বিভিন্ন স্থানে অযত্ন ও অব্যবস্থাপনার ছাপ রয়েছে।

স্থাপনাটির নিরাপত্তায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রাতের বেলায় দুর্বৃত্তরা সহজেই সেখানে প্রবেশ করে বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সন্ধ্যার পর সেখানে নেশাগ্রস্তদের আনাগোনাও দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানান।

শহীদ স্মৃতিসৌধের নৈশপ্রহরী গণেশ চন্দ্র জানান, রাতে স্মৃতিসৌধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। তিনি বলেন, স্থাপনাটির নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, লক্ষীপুর বধ্যভূমি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগের স্মারক। এখানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মৃতি রক্ষার দায়িত্ব সবার।

শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দ্রুত স্মৃতিসৌধের সংস্কার, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহুরুল হক বলেন, লক্ষীপুর বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি বহনকারী এ স্থাপনা অবহেলায় পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

স্মৃতিসৌধের বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি ও নেশা গ্রস্তদের আনাগোনার বিষয়টি দুঃখজনক। দ্রুত প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এলাকাবাসীর দাবি, বধ্যভূমি ও শহীদ স্মৃতিসৌধে রাতের নিরাপত্তা জোরদার করতে নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হোক। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে চুরি হয়ে যাওয়া সরঞ্জাম উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

লক্ষীপুর বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালের গণহত্যায় নিহত শহীদদের স্মরণে একটি তালিকাও সংরক্ষিত রয়েছে। তালিকায় উল্লেখিত শহীদদের মধ্যে রয়েছেন—অধীর চন্দ্র দাস, অখিল চন্দ্র, অবনী চন্দ্র দাস, অলীল চন্দ্র দাস, অমল কুমার হালদার, আশুতোষ দত্ত, কানাইলাল দাস, কুশল চন্দ্র পাল, কমল চন্দ্র পাল, গৌরচন্দ্র ভদ্র, গোপাল চন্দ্র দাস, তারাপদ দাস, তারাপদ হালদার, ধীরেন্দ্রনাথ চর, নিজাম উদ্দিন শেখ, নিরঞ্জন পাল, নরেশ চন্দ্র দাস, ব্রজ গোপাল কর, বিমল চন্দ্র দাস, মোহন, সূর্যকান্ত দাস, সদানন্দ কর, সনাতন দত্ত, সুরেন্দ্রনাথ দাস, হারান হালদার ও রতিলাল দত্তসহ ২৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিদুল ইসলাম বলেন, লক্ষীপুর বধ্যভূমির শহীদ স্মৃতিসৌধে চুরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্মৃতিসৌধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশা পাশি চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, যে বধ্যভূমি ১৯৭১ সালের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করছে, সেই স্থাপনারই বিভিন্ন অংশ রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়ে স্মৃতিসৌধটি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews