একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশে প্রতি বছর কত টাকার যাকাত আদায় হওয়া উচিত? গবেষকেরা হিসাব করে বলছেন, এক লাখ কোটি টাকা। আসলে আদায় কত হয়? মাত্র ১২ কোটি। এই যে বিশাল ফাঁকটা, এটা শুধু সংখ্যার ফাঁক নয়, এটা একটা সভ্যতার ব্যর্থতার ফাঁক। লাখ লাখ মানুষ যেখানে প্রতিদিন না খেয়ে ঘুমাচ্ছে, সেখানে এক লাখ কোটি টাকা ঘুমিয়ে আছে মানুষের ভল্টে, ব্যাংক লকারে, সোনার গয়নার বাক্সে।
পৃথিবীতে সম্পদের অসম বণ্টন নিয়ে মানুষ যুগ যুগ ধরে ভেবেছে। একদল বলেছে —পুঁজিবাদ আনবে মুক্তি, আরেক দল বলেছে সমাজতন্ত্রের পথে চলো। কিন্তু দুটো পথেই হাঁটতে গিয়ে মানুষ হোঁচট খেয়েছে বারবার। পুঁজিবাদ সম্পদকে ওপরে ওপরে টেনে তুলেছে, আর সমাজতন্ত্র সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত করে মানুষকে পরিণত করেছে যন্ত্রে। এই দুই চরমের ভিড়ে ইসলাম ১৪শ’ বছর আগে একটা ব্যবস্থার কথা বলেছিল, যার নাম যাকাত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই ব্যবস্থাটি আজও মোটেও পুরোনো হয়নি।
যাকাত শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এর দর্শন। আরবিতে এই শব্দের অর্থ পবিত্রতা এবং বৃদ্ধি। যে সম্পদ থেকে যাকাত দেওয়া হয়, সেই সম্পদ কমে না বরং বাড়ে। এই বিশ্বাসটি অনেকের কাছে স্রেফ আধ্যাত্মিক কথা মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে আছে একটি গভীর অর্থনৈতিক সত্য। যখন সমাজের বড় একটা অংশের হাতে ক্রয়ক্ষমতা আসে, তখন বাজার চাঙা হয়, উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়। যাকাত আসলে সেই চাকাটিকেই ঘুরায়।
এখন একটু ভাবা দরকার। একজন মানুষ সারাজীবন কষ্ট করে সম্পদ গড়ে তোলেন, তা থেকে কেন দেবেন? এই প্রশ্নটা স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলাম বলে, পৃথিবীর সব সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। মানুষ শুধু আমানতদার। যিনি আমানত রেখেছেন, তিনি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন কার কতটুকু পাওনা। এই বোধটি যখন একজন মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তখন সে সম্পদ আঁকড়ে ধরার মনোবৃত্তি থেকে মুক্তি পায়। সে বোঝে, তার উপার্জনে সমাজের দুর্বল মানুষের একটি ন্যায্য অংশ আছে। যাকাত তাই কোনও দয়া নয়, দান নয়— এটা একটা অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
নিসাবের হিসাবটা বুঝলে আরও পরিষ্কার হয়। সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমাণ সম্পদ যদি কারো কাছে পূর্ণ এক বছর থাকে, তাহলে সে সম্পদের আড়াই শতাংশ যাকাত হিসেবে দিতে হবে। শুধু নগদ টাকা নয়, ব্যাংকের সঞ্চয়, ব্যবসার পণ্য, সোনাদানা সব মিলিয়েই হিসাব। বাংলাদেশে যদি সব যাকাতযোগ্য সম্পদ ধরা হয়, তাহলে বছরে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা তো সহজেই আদায় হওয়া সম্ভব শুধু রক্ষণশীল হিসাবেই। আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা থাকলে এই সংখ্যাটা পৌঁছে যাবে এক লাখ কোটিতে।
তাহলে কী হবে এই এক লাখ কোটি টাকা দিয়ে? প্রশ্নটা মাথায় আসাটাই স্বাভাবিক। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের হিসাব বলছে, এই অর্থ যদি সমভাবে ১৫ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিনিয়োগ করা হয়, তাহলে প্রতিটি পরিবার পাবে দেড় লাখ টাকারও বেশি। এই টাকা দিয়ে একজন বেকার তরুণ একটা রিকশাভ্যান কিনতে পারে, একজন বিধবা নারী একটা সেলাই মেশিন পেতে পারে, একজন প্রান্তিক কৃষক পাঁচটা ছাগল কিনে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই মানুষগুলো নিজেই হয়ে উঠবে স্বনির্ভর, এমনকি কেউ কেউ হয়তো ভবিষ্যতে নিজেই যাকাতদাতায় পরিণত হবে।
ইতিহাস এই স্বপ্নকে উড়িয়ে দেয় না, বরং সত্য বলে প্রমাণ করে। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনকালে যাকাত ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর হয়েছিল যে, রাজ্যের কর্মকর্তারা যাকাতের অর্থ বিতরণ করতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতেন। কারণ গ্রহণ করার মতো যোগ্য দরিদ্র মানুষ পাওয়া যাচ্ছিল না। এটা ইতিহাসের নথিতে লেখা আছে, কোনও কল্পকথা নয়। সেই একই পরিণতি পেয়েছিল মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলেও।
কিন্তু বাংলাদেশের ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৮২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে যাকাত ফান্ড গঠিত হয়েছিল। চার দশকে এই ফান্ডে জমা পড়েছে মাত্র ৭১ কোটি টাকা। যেখানে সম্ভাবনা এক লাখ কোটি, সেখানে বাস্তবতা ৭১র কোটি। এই বিশাল ব্যবধানের কারণ কি শুধু মানুষের অনীহা? না, কারণ আরও গভীরে।
সমস্যার শিকড়টা খুঁজতে গেলে কয়েকটি স্তরে দেখতে হয়। প্রথমত, স্বচ্ছতার অভাব। মানুষ জানে না তার দেওয়া যাকাতের টাকা কোথায় যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বিতরণের ভুল পদ্ধতি। রমজান মাসে সারিবদ্ধ দরিদ্র মানুষদের হাতে ৫০-১০০ টাকা ধরিয়ে দেওয়া বা শাড়িলুঙ্গি বিতরণ করা যাকাতের উদ্দেশ্য পূরণ করে না। এই টাকায় কোনও পরিবারের জীবন বদলায় না। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। যাকাত ফান্ড বিভাগটি সারা বছর ঘুমিয়ে থাকে, রমজান এলে একটু নড়েচড়ে বসে।
সমাধান কি তাহলে নেই? আছে এবং খুব সুনির্দিষ্টভাবেই আছে। মালয়েশিয়া দেখিয়ে দিয়েছে পথটা। সেখানে সরকারিভাবে ‘জাকাত মালয়েশিয়া’ নামে একটি দফতর যাকাত সংগ্রহ করে এবং সেই অর্থ শিক্ষা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান খাতে পরিকল্পিতভাবে ব্যয় করে। সৌদি আরবে কেন্দ্রীয় যাকাত কর্তৃপক্ষ করপোরেট পর্যায়েও যাকাত সংগ্রহ করে। এই দেশগুলো প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা থাকলে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য পথটা আসলে খুব কঠিন নয়। প্রথম দরকার একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল যাকাত ব্যবস্থাপনা, যেখানে দাতা অনলাইনে দেখতে পাবেন তার টাকা কোথায় গেলো, কোন পরিবারের জীবন বদলে দিলো। দ্বিতীয়ত, দরকার বিতরণের পদ্ধতি পরিবর্তন। নগদ টাকা বা কাপড় বিতরণের বদলে দরিদ্র মানুষকে উৎপাদনমুখী সম্পদ দেওয়া, তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। তৃতীয়ত, দরকার আলেমসমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা, যাতে মানুষ যাকাতের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বুঝতে পারে।
যাকাত ব্যবস্থার একটি দিক প্রায়ই আলোচনায় আসে না। এটি শুধু গরিবকে উপকার করে না, ধনীকেও পরিবর্তন করে। যে মানুষ নিয়মিত তার সম্পদের একটি অংশ সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, সে ধীরে ধীরে লোভ থেকে মুক্তি পায়। সম্পদ তার কাছে বোঝা হয় না, হয় দায়িত্ব। কোরআন এই সত্যটি বলেছে অসাধারণ ভাষায়, আল্লাহ সুদ ধ্বংস করেন আর দান বৃদ্ধি করেন— যা বাহ্যত কমে, আসলে তা বাড়ে।
বাংলাদেশে সঠিকভাবে যাকাত আদায় করতে পারলে মাত্র সাত থেকে ১০ বছরের মধ্যে দেশ থেকে দারিদ্র্য পুরোপুরি বিদায় নিতে পারে। এটা স্বপ্ন নয়, এটা গণিতের হিসাব। ‘যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩’ বাংলাদেশে আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সদিচ্ছা থাকলে এই আইনটিকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যাত্রা শুরু করা কঠিন নয়।
শেষে এসে আবার সেই শুরুর প্রশ্নে ফেরা যাক। এক লাখ কোটি টাকার সম্ভাবনা থাকতে মাত্র ১২ কোটি আদায় হয় কেন? কারণ একটাই। আমরা যাকাতকে ফরজ মনে করি, কিন্তু ঐচ্ছিকভাবে পালন করি। যার মন চায় দেয়, মন না চাইলে দেয় না। অথচ যাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর দয়া নয়, এটা গরিবের ন্যায্য অধিকার। সেই অধিকার আদায় না করাটা শুধু ধর্মীয় অবহেলা নয়, এটা সমাজের প্রতি একটা অপরাধ।
সম্পদের প্রকৃত নিরাপত্তা ব্যাংকের ভল্টে নয়। নিরাপত্তা আছে সেই সম্পদে, যা মানুষের কল্যাণে প্রবাহিত হয়। যাকাত আমাদের সেই পথটাই দেখায়।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক