সউদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটির মূলনীতি হলো: একটি সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যতদূর জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সরকার প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। এটি শুধু মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতামূলক কোনো সাধারণ সংগঠন নয়; বরং পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকারসংম্বলিত একটি সামরিক ব্যবস্থা। ফলে, ধর্মীয় আবেগ, কোনো দেশের প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিংবা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই হতে হবে সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি।
প্রতিষ্ঠাতা তিনটি দেশের সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক। তুরস্কের রয়েছে বিশাল ও আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী, শক্তিশালী ড্রোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং তার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সউদী আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আধুনিক অস্ত্রভান্ডার, জ্বালানি সম্পদ এবং মুসলিম বিশ্বে বিশেষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব। চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য, সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রতিষ্ঠাতা দেশগুলো বলছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গঠিত আক্রমণাত্মক বা সাম্প্রদায়িক জোট নয়। কিন্তু চুক্তিতে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেবে, সেনা পাঠাবে, অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য দেবে, নাকি শুধু রাজনৈতিক সমর্থন জানাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য সদস্যদের জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তার ছাতা তৈরি করবে, এমন কোনো প্রকাশিত অঙ্গীকার নেই।
বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাব্য ভালো দিকগুলো নি¤েœ আলোচনা করা হলো:
প্রথমত: এই জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করতে পারে। বাংলাদেশের ওপর কোনো বহিঃশক্তি সামরিক চাপ সৃষ্টি করলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক শক্তি সীমিত হওয়ায় একটি কার্যকর সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের হিসাবকে জটিল করতে পারে।
দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে জোটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুরস্ক থেকে ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সামরিক শিক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, বিমান প্রতিরক্ষা ও যৌথ মহড়া সম্প্রসারিত হতে পারে। সউদী অর্থায়নে প্রতিরক্ষা প্রকল্প, সামরিক অবকাঠামো এবং যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তৃতীয়ত: বাংলাদেশ শুধু অস্ত্রের ক্রেতা না হয়ে প্রতিরক্ষা শিল্পের অংশীদার হতে পারে। জাহাজ নির্মাণ, সামরিক পোশাক, গোলাবারুদ, যোগাযোগসরঞ্জাম, ড্রোনের যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খাতে যৌথ বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে। তবে এ সুবিধা পেতে হলে চুক্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় উৎপাদন ও জনবল প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
চতুর্থত: সউদী আরব বাংলাদেশের জ্বালানি, শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হলে সউদী বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশ অতিরিক্ত সুবিধা চাইতে পারে। তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য এবং শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত যোগাযোগও বাড়তে পারে।
পঞ্চমত: মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হতে পারে। বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিমপ্রধান দেশ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশ মধ্যপন্থা, শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
ষষ্ঠত: বঙ্গোপসাগর ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জলদস্যুতা, অস্ত্র ও মাদক পাচার, সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার মতো অপ্রচলিত হুমকি মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময় বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে বাংলাদেশের নিজের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। সউদী আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল, ইয়েমেন, ইরান ও জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে। তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থ সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ককেশাস ও কুর্দি প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানের প্রধান উদ্বেগ ভারত, আফগান সীমান্ত এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ। এসব সমস্যা বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন। কোনো প্রতিষ্ঠাতা দেশ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশকে সেনা, নৌযান, বিমান, অস্ত্র অথবা অর্থ পাঠাতে হতে পারে। এতে বাংলাদেশের জীবন, সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা এমন সংঘাতে ব্যয় হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ জাতীয় স্বার্থ নেই। বিশেষ করে ইরান, ইয়েমেন অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের পক্ষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক হারাতে পারে।
দ্বিতীয়ত: জোটে যোগদান বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষ ও ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতিকে সংকুচিত করতে পারে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে সউদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, রাশিয়া, ইরান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে প্রবেশ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ আসলে কোন বলয়ের সদস্য? বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র; আবার মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং চীন বড় বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। সামরিক মেরুকরণের কারণে কোনো পক্ষের নিষেধাজ্ঞা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ হ্রাস বা বাণিজ্যিক বাধা সৃষ্টি হলে তার মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো রপ্তানি ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য কৌশলগত নমনীয়তা নিজেই একটি মূল্যবান জাতীয় সম্পদ।
তৃতীয়ত: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে দিল্লি সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। এর প্রভাব সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় পড়তে পারে। তবে ভারতের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের নির্ধারক হতে পারে না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।
চতুর্থত: আর্থিক দায় বহনের প্রশ্ন রয়েছে। সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে যৌথ সদর দপ্তর, সামরিক মহড়া, বাহিনী মোতায়েন, অস্ত্রের মানসমন্বয় এবং বিভিন্ন অভিযানের জন্য অর্থ দিতে হতে পারে।
পঞ্চমত: মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিভাজনে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়তে পারে। তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশই সুন্নিপ্রধান। ঘোষণায় কোনো দেশকে প্রতিপক্ষ বলা না হলেও বাস্তবে জোটটি ইরানবিরোধী বলয় হিসেবে বিবেচিত হলে বাংলাদেশ অপ্রয়োজনীয় সুন্নি–-শিয়া মেরুকরণের অংশ হয়ে যেতে পারে।
চুক্তিটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় শুধু নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। জাতীয় সংসদ, সশস্ত্র বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মাধ্যমে এর সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখেও জনগণকে চুক্তির মৌলিক বাধ্যবাধকতা জানানো উচিত।
লেখক: গবেষক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
[email protected]