সাঈফ ইবনে রফিক
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেই বাংলাদেশের জনপরিসরে একটি প্রশ্ন দ্রুত উচ্চারিত হয়— ‘বিজিবি কিংবা সরকারি বাহিনী কী করে?’ প্রশ্নটি আবেগের, মানবিকও। কারণ সীমান্তে নিহত ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে তার মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নাড়া দেয়; কিন্তু এই প্রশ্নের ভেতরে প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা অনুপস্থিত থাকে। সেটি হলো, আন্তর্জাতিক সীমান্তে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব, এখতিয়ার ও কার্যপরিধি এক নয় এবং সীমান্তে সংঘটিত প্রায় সব গুলির ঘটনাই ঘটে ভারতীয় ভূখণ্ডে, বিএসএফের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়। এই বাস্তবতা অনুধাবন না করলে সীমান্ত পরিস্থিতির প্রকৃত চরিত্র বোঝা যাবে না।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ, জটিল ও জনবহুল সীমান্ত। কোথাও বসতবাড়ি সীমান্তঘেঁষা, কোথাও কৃষিজমি কাঁটাতারের গা ছুঁয়ে গেছে, কোথাও একই পরিবারের সদস্যরা দুই দেশের ভেতরে বসবাস করেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সীমান্তভিত্তিক অপরাধ। এতে জড়িত চোরাকারবার, মাদক, মানবপাচার, অবৈধ পারাপার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধচক্র। ফলে এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিকতা, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির জটিল সংযোগস্থল।

এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেই বহু বছর ধরে একটি বিষয় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে : সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা। বিষয়টি কেবল বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ভারতের অভ্যন্তরেও বিএসএফকে ঘিরে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুলি ও মানবাধিকার প্রশ্নে সমালোচনা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও একাধিক ঘটনায় সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থাৎ, এটি কেবল দুই পক্ষের আবেগের বিষয় নয়; বরং সীমান্ত নিরাপত্তানীতিতে প্রাণঘাতী শক্তির ব্যবহার ঘিরে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত বিতর্ক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, সীমান্তে নিহতদের বড় অংশ ভারতের অভ্যন্তরে গুলিবিদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। ফলে ‘বিজিবি কেন কিছু করল না’ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, বিজিবির আইনগত ও কৌশলগত সীমা কোথায় শেষ হয়।

অনেকসময় জনপরিসরে এমন ধারণা তৈরি হয়, যেন সীমান্তে গুলির ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণই একমাত্র কার্যকর ভূমিকা; কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি সংযম, যোগাযোগ, প্রতিরোধ এবং হিসাবকৃত কূটনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়। সীমান্তে গুলির জবাব গুলি দিয়ে দেয়া হলে তা বৃহত্তর সীমান্ত উত্তেজনাসহ আরো বৃহৎ পরিসরে রূপ নিতে পারে। এখানেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিজিবির প্রধান দায়িত্ব সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সঙ্ঘাত প্রতিরোধ করা। পতাকা বৈঠক, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ের যোগাযোগ, বিভিন্ন পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন, কূটনৈতিক প্রতিবাদ, যৌথ সমন্বয় ব্যবস্থা, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা, মানবপাচার ও চোরাকারবার দমন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন— এসবই আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অংশ।

তবে এই বাস্তবতার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, প্রতিরোধের সাফল্য সচরাচর দৃশ্যমান হয় না। একটি মর্মান্তিক ছবি মুহূর্তেই জনমনে আলোড়ন তোলে; কিন্তু অসংখ্য সম্ভাব্য সঙ্ঘাত যে নীরবে প্রতিরোধ করা হয়, তার কোনো দৃশ্যমান প্রচার থাকে না। ফলে সীমান্ত নিয়ে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হয়, যেখানে ট্র্যাজেডি দৃশ্যমান হলেও প্রতিরোধ অদৃশ্য থেকে যায়। সীমান্তে সাংবাদিকদের সক্রিয় উপস্থিতি না থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত হত্যার ঘটনাগুলোর কাভারেজে মূলধারার গণমাধ্যমে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। শোকাহত স্বজনের বক্তব্যে প্রাধান্য দিয়ে নিহতদের পরিচিতি প্রকাশ করা হয়। চোরাচালান নেটওয়ার্ক, স্থানীয় দালালচক্র বা ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ পারাপারের বাস্তবতা তুলনামূলক আড়ালে থেকে যায়। এটি সীমান্ত সাংবাদিকতার একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে আনে। অনেক ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর দেশপ্রেম ও মানবিক বয়ান সাংবাদিকতাকে অনুসন্ধানী অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। ফলে সীমান্তের জটিল বাস্তবতা অনুপস্থিত থেকে যায়।

এখানে আরো একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তে কেন নন-লেথাল বর্ডার ম্যানেজমেন্ট পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি? কেন আধুনিক নজরদারি, গ্রেফতারভিত্তিক প্রতিরোধ, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বদলে অনেক ক্ষেত্রে গুলিই শেষ প্রতিক্রিয়া হয়ে ওঠে? মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনগুলোতে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কেন সবসময় দৃশ্যমান হয় না? এসব প্রশ্ন কেবল বাংলাদেশের নয়; ভারতের নাগরিক সমাজেও আলোচিত। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিজের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা এবং প্রতিটি ঘটনার কূটনৈতিক প্রতিকার অনুসন্ধান করা। বর্ডার গার্ড সেই দায়িত্ব প্রতিদিন পালন করে। সীমান্তের ইতিহাস তাই শুধু রক্তের নয়; সংযম, প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতারও।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews