১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ চলচ্চিত্রের কথা উঠলেই দর্শকদের মনে ভেসে ওঠে সেলিন ডিওনের কালজয়ী গান ‘মাই হার্ট উইল গো অন’। সিনেমাটির বিশ্বব্যাপী সাফল্যের পেছনে অভিনয় ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের পাশাপাশি এই গানটির আবেগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ অবাক করার মতো বিষয় হলো, শুরুতে এই গান সিনেমায় রাখতেই চাননি পরিচালক জেমস ক্যামেরন। এমনকি গানটি গাইতেও আগ্রহী ছিলেন না সেলিন ডিওন।
‘টাইটানিক’-এ কোনো পপ গান রাখার পরিকল্পনা প্রথমে ক্যামেরনের ছিল না। তার ধারণা ছিল, বাণিজ্যিক ধাঁচের গান সিনেমার ঐতিহাসিক ও গম্ভীর আবহকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত ছিল সুরকার জেমস হর্নারের। তিনি সিনেমাটির জন্য একটি শক্তিশালী আবেগঘন থিম তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
হর্নার প্রথমে ‘মাই হার্ট উইল গো অন’-এর সুর তৈরি করেন একটি ইন্সট্রুমেন্টাল মোটিফ হিসেবে। পরে সিনেমার শেষের ক্রেডিটে ব্যবহার করার জন্য গানটির কণ্ঠসংগীত সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করেন। এ কাজে তিনি গীতিকার উইল জেনিংসকে যুক্ত করেন। জেনিংস এমন একজন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে গানটির কথা লেখেন, যিনি জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে অতীতের স্মৃতির দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। তবে পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছিল ক্যামেরনের অগোচরে।
এরপর প্রয়োজন ছিল একজন কণ্ঠশিল্পীর। হর্নারের সঙ্গে কাজ করা সংগীতশিল্পী সাইমন ফ্র্যাংলেন কানাডিয়ান তারকা সেলিন ডিওনের নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু গানটি শুনে প্রথমেই আগ্রহ দেখাননি ডিওন। তার কাছে সুরটি ভালো লাগেনি। একই সময়ে অন্য একটি সিনেমার গান করার পর নতুন কোনো সাউন্ডট্র্যাকে কণ্ঠ দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন।
সেলিন ডিওন পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে জানান, গানটি প্রথমবার শুনে তার ভালো লাগেনি এবং তিনি এটি গাইতে চাননি। শেষ পর্যন্ত তার স্বামী ও ম্যানেজার রেনে অ্যাঞ্জেলিলের অনুরোধে তিনি গানটির একটি ডেমো রেকর্ড করতে রাজি হন।
অনিচ্ছা নিয়েই স্টুডিওতে গিয়েছিলেন সেলিন। সেদিন তিনি শারীরিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। তারপরও মাত্র একবার গানটি রেকর্ড করেন। সেই একবারের ডেমো রেকর্ডিং এতটাই আবেগপূর্ণ ও নিখুঁত হয়েছিল যে জেমস হর্নারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সেই ডেমো রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠই চূড়ান্ত সংস্করণে ব্যবহার করা হয়।
তবে গানটি ক্যামেরনের কাছে উপস্থাপন করতেও হর্নার কিছুটা ভয় পাচ্ছিলেন। তিনি কিছুদিন গানটি গোপন রাখেন এবং উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে থাকেন। একসময় ক্যামেরনের মন ভালো থাকার সুযোগ বুঝে তাকে গানটি শোনান। গানটি শোনার পর পরিচালকের মন বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ সিনেমার আবেগ দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অসাধারণভাবে কার্যকর হতে পারে।
এরপরের গল্পটা ইতিহাস। ‘টাইটানিক’ মুক্তির পর গানটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষে উঠে আসে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়। ১৯৯৮ সালে এটি বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত সিঙ্গেলগুলোর একটি হয়ে ওঠে। একই বছর গানটি ‘সেরা মৌলিক গান’ বিভাগে অস্কার জয় করে। পরের বছর এটি সেলিন ডিওনকে এনে দেয় একাধিক গ্র্যামি পুরস্কার।
অর্থাৎ, যে গানটি প্রথমে পরিচালক ও শিল্পী—দুজনের কাছ থেকেই অনাগ্রহ পেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে ওঠে ‘টাইটানিক’-এর অন্যতম পরিচয় এবং বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে একটি কালজয়ী সৃষ্টি।