ফুটবলে যেমন ব্যালন ডি’অর রয়েছে, ক্রিকেটেও তেমনি রয়েছে বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ সম্মান। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যাটে-বলে অসাধারণ নৈপুণ্য, ধারাবাহিকতা ও প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে আইসিসি যে পুরস্কারটি তুলে দেয়, সেটি ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি’।

২০০৪ সাল থেকে চালু হওয়া এই ট্রফিটি আজ ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। কিন্তু যার নামে এই ট্রফি, তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি নন—তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের এক যুগের নাম। বলছি স্যার ক্যারিবীয় কিংবদন্তি স্যার সোবার্সের কথাই।

নিজের ৯০তম জন্মদিনের মাত্র ১০ দিন আগে, গতকাল (শুক্রবার) ৮৯ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন স্যার গারফিল্ড সেন্ট অব্রান সোবার্স। বার্বাডোজে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

ক্রিকেটের এক বিস্ময়কর রূপ ছিলেন স্যার গ্যারিফিল্ড সোবার্স। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং—ক্রিকেটের প্রতিটি বিভাগেই অসাধারণ দক্ষতার জন্য সোবার্স ছিলেন অনন্য। যাকে বলা যায় একজন পরিপূর্ণ ক্রিকেটার।

বলা হয়ে থাকে, ক্যারিয়ারে যদি কখনো সোবার্স বল হাতে না নিতেন, তবুও তিনি বিশ্বের সেরা ব্যাটারদের তালিকায় উপরেই থাকতেন। আবার যদি ব্যাট হাতে না নিতেন, তবুও অনায়াসেই সেরা বোলার বলা যেতো তাকে।

বাঁহাতি ব্যাটার হিসেবে সোবার্স যেমন ছিলেন বিধ্বংসী, তেমনি বল হাতে করতে পারতেন বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন ও রিস্ট স্পিন। কাছাকাছি অবস্থানে ফিল্ডিংয়েও ছিলেন দুর্দান্ত।

আধুনিক ক্রিকেটে জ্যাক ক্যালিস, কপিল দেব, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, সাকিব আল হাসান কিংবা বেন স্টোকস—যে অলরাউন্ডার ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন, তার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সোবার্সের হাত ধরেই।

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোসের ব্রিজটাউনের ওয়ালকট অ্যাভিনিউতে জন্ম সোবার্সের। এরপর মাত্র ১৭ বছর বয়সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলে অভিষেক। এরপর দুই দশকের ক্যারিয়ারে তিনি এমন সব কীর্তি গড়েছেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়।

মাত্র ৯৩ টেস্টেই করেছেন ৮,০৩২ রান, গড় ৫৭.৭৮। রয়েছে ২৬টি সেঞ্চুরি ও ৩০টি অর্ধশতক। বল হাতে নিয়েছেন ২৩৫ উইকেট, বোলিং গড় ৩৪.০৩। ফিল্ডিংয়েও ছিলেন অসাধারণ—ধরেছেন ১০৯টি ক্যাচ।

তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বার্বাডোজ, নটিংহামশায়ার ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্রথম শ্রেণির ৩৮৩টি ম্যাচ খেলেন সোবার্স। ৫৪.৮৭ গড়ে ২৮,৩১৪ রান করার পাশাপাশি ২৭.৭৪ গড়ে ১০৪৩টি উইকেট শিকার করেন।

সেই সময় ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলন না হওয়ায় মাত্র একটি ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন তিনি। তবে সব মিলিয়ে ৯৫টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন। যেখানে তার রান ২৭২১ ও উইকেট সংখ্যা ১০৯।

তবে সংখ্যাগুলোও যেন তার প্রতিভার পুরো গল্প বলতে পারে না। তিনি ছিলেন এমন এক ক্রিকেটার, যিনি একই ম্যাচে প্রয়োজন অনুযায়ী বাঁহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম, অর্থোডক্স স্পিন কিংবা চিনাম্যান—সব ধরনের বোলিং করতে পারতেন।

ব্যাট হাতে যেমন ছিলেন শিল্পী, বল হাতে ছিলেন কৌশলী, আর মাঠে ছিলেন এক অসাধারণ অ্যাথলেট। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন সোবার্স। সেটি ছিল তখনকার বিশ্বরেকর্ড।

টানা ৩৬ বছর সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ন ছিল, পরে ১৯৯৪ সালে আরেক ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা ৩৭৫ রান করে সেটি ভাঙেন। সেইসাথে আরেকটি কীর্তি তাকে ইতিহাসে আলাদা জায়গা দিয়েছে।

১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে গ্ল্যামারগানের স্পিনার ম্যালকম ন্যাশকে এক ওভারে ছয় বলে ছয় ছক্কা মেরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি। আজকের টি-টোয়েন্টি যুগে যা প্রায়ই আলোচনায় আসে, তার পথিকৃৎ ছিলেন সোবার্স।

শুধু পরিসংখ্যান নয়, ক্রিকেটবিশ্বের সম্মানও ছিল তার দখলে। ২০০০ সালে উইজডেনের ‘ক্রিকেটার অব দ্য সেঞ্চুরি’ নির্বাচনে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯০ ভোট পেয়েছিলেন সোবার্স। ব্র্যাডম্যান নিজেও তাকে সেরার স্বীকৃতি দিয়েছেন বহুবার।

১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। ২০০৯ সালে জায়গা পান আইসিসি হল অব ফেমে। আর ২০০৪ সাল থেকে আইসিসি তার নামেই বর্ষসেরা ক্রিকেটারের ট্রফির নামকরণ করে—যা আজ ক্রিকেটের ‘ব্যালন ডি’অর’ হিসেবেই পরিচিত।

তার জীবনের আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায় জন্মের সাথে জড়িয়ে। জন্মের সময় দুই হাতে ছিল ১২টি আঙুল। পরে শৈশবে দুর্ঘটনায় একটি অতিরিক্ত আঙুল নষ্ট হয়ে যায় এবং আরেকটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়।

জন্মের সময়ের সেই অতিরিক্ত দুটি আঙুল হয়তো ইতিহাস গড়ার নিশ্চয়তা দেয়নি, কিন্তু তার হাতে যে অসাধারণ প্রতিভা ছিল, সেটিই তাকে ক্রিকেটের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

ক্রিকেটে এমন অনেক কিংবদন্তি এসেছেন, আবার চলে গেছেন। কিন্তু খুব কম মানুষই খেলাটির সংজ্ঞা বদলে দিতে পেরেছেন। স্যার গারফিল্ড সোবার্স ছিলেন সেই বিরলদের একজন। তিনি হয়তো চলে গেছেন, তবে তার কীর্তি থেকে যাবে ক্রিকেটের শেষ দিন পর্যন্ত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews