ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুত প্রক্রিয়া স্থগিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের আলোচনা চলছিল। ওমানের রাজধানী মাসকটে পরোক্ষ এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের আব্বাস আরাকচির মধ্যে এই আলোচনা গত ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে শুরু হয়। এরপর ১৭ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফা আলোচনা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি চতুর্থ দফায় আরো গভীর আলোচনা চলতে থাকে। মধ্যস্থতাকারী ওমানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। এর মধ্যেই ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন নেতৃত্বে ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়।

মধ্যস্থতাকারী বুসাইদি হতাশাগ্রস্ত হয়ে বললেন, ‘একটি চলমান আন্তরিক আলোচনাকে এই আক্রমণের মাধ্যমে অপমানিত করা হলো।’ আক্রমণের ভয়াবহতায় অপ্রস্তুত ইরানের অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরবর্তী দু-এক দিনের মধ্যেই ইরান সম্বিত ফিরে পায় এবং পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরাইলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে। এতে ইসরাইলের এবং মার্কিন সামরিক আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়। পুরো মার্চ মাস আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ইরানের তিন হাজার ৬০০ জন, ইসরাইলের ৪৫ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ জন নিহত হয়। আমেরিকায় যুদ্ধ খরচ হয় ৭০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক অর্থনৈতিক খরচের পরিমাণ প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর ইসরাইলের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার। সবমিলে ইসরাইলের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর ইরানের অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয় ৫০ বিলিয়ন ডলার যা তাদের জিডিপির ১০ শতাংশ।

প্রায় এক মাসেরও অধিককাল পার হলেও দেখা গেল ইরান নমনীয় হচ্ছে না; বরং তারা নিত্যনতুন ক্ষেপণাস্ত্র বের করছে তাদের গোপন মজুদ থেকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো অকেজো করে দিয়েছে। ইসরাইলের অভ্যন্তরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরাইলিরা নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার হুঙ্কার এবং ভয়াবহ আক্রমণ ও পরিণতির হুমকি এবং আলটিমেটাম দিয়ে যাচ্ছেন। ইরান ততোধিক শক্তি নিয়ে প্রতিআক্রমণ চালাচ্ছে। এ সময়টিতে ইরানি জনগণ এক বিস্ময়কর ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলেছে। সশস্ত্রবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তারা নিজেরা প্রতিদিন সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন যেন যেকোনো ধরনের মার্কিন পদাতিক আক্রমণ ধ্বংস করে দেয়া যায়। খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে ইরানের রিজিম বদলের যে অলীক পরিকল্পনা তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে পড়েছে।

বিশ্বব্যাপী ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদে নেমে আসছে। ন্যাটোসহ পশ্চিমা দেশগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে অতি উচ্চভিলাসী এবং পাগলামি মনে করছে। তারা মার্কিনিদের ডাকে সাড়া না দিয়ে নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। অন্য দিকে ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধে বিশ্বে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সেই চাপ মার্কিন নাগরিকদের ওপর সুচের মতো বিঁধতে শুরু করেছে। ইরানিদের বাগে আনতে শেষ চেষ্টা হিসেবে চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শির সহযোগিতা চান। কিন্তু তার আগেই ইরান চীনের সাথে কূটনীতি জোরদার করে রেখেছে। ফলে ইরান যুদ্ধ প্রশ্নে ট্রাম্প চীন থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসেন। চীন সফর শেষে ট্রাম্প অস্থির হয়ে পড়েন যুদ্ধেবিরতি টানতে। ফলে ৮ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়।

যুদ্ধবিরতি কয়েক দফা বৃদ্ধি করা হলেও এর মধ্যেই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে তাকে। গত ১৫ জুন ট্রাম্পের ঘোষণামতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘সমঝোতা স্মারক’ সম্পাদিত হয়, যা পরে জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারক মোতাবেকে প্রথমত ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে এবং এই ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড়করণ এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়া- ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা সম্পন্ন করে চুক্তি সম্পাদিত হবে। আর ‘সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরের পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দেবে এবং ইরানি বন্দরগুলো থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেয়া হবে। আসলে যুদ্ধ শুরু করে দিয়ে ট্রাম্প বুঝতে পারলেন তার ইরান আক্রমণের হিসাব ছিল সম্পূর্ণ ভুল। ফলে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ চাপ, ইউরোপিয়ানদের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে গেলেন। এক দিকে বৈশ্বিক চাপ এবং অন্য দিকে ইরানের মারাত্মক প্রতিআক্রমণাত্মক (কাউন্টার অ্যাটাক) যুদ্ধকৌশল ট্রাম্পকে যুদ্ধে ইতি টানতে বাধ্য করল।

ট্রাম্প হয়তো পরিকল্পনা করেছিলেন, ভেনিজুয়েলার মতো ইরানকে মুহূর্তেই কব্জা করে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচন পার করে দেবেন। কিন্তু পরিস্থিতি বিপরীত হওয়ায় তিনি এখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য পাগলপারা হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়টি বুঝতে পেরে ইরান দরকষাকষির মাধ্যমে তাদের সুবিধাজনক একটি ‘সমঝোতা স্মারকে’ সম্মত হয়েছে। নেতানিয়াহু এই চুক্তিতে কোনো অংশীদার হতে যাচ্ছেন না। কারণ এ বছরের শেষ দিকে ইসরাইলে নির্বাচন। প্রায় আড়াই বছর ধরে হামাস নির্মূলে গাজা যুদ্ধের পরও হামাস বলিষ্ঠভাবে সক্রিয় রয়েছে। অন্য দিকে ইরানের পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রায় পুরোপুরিই অক্ষত রয়েছে। কাজেই এত ক্ষয়ক্ষতির পরও ইসরাইল তাদের উদ্দেশ্যের সামান্যটুকুও অর্জন করতে পারেনি।

এই যুদ্ধে মার্কিনিদের কৌশলগত দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধে জড়ানো, অস্ত্র-সরঞ্জামাদির মজুদ দ্রুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলো অকেজো হয়ে পড়ার কারণে তাদের দেশের বাইরে যুদ্ধ পরিচালনা করার সক্ষমতা এবং কৌশল দু’টিতেই মারাত্মক দুর্বলতা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।

এই যুদ্ধে বিশ্বের সর্বোচ্চ সামরিক শক্তিশালী দু’টি দেশের বিরুদ্ধে একসাথে যুদ্ধ করে বীরের মতো টিকে থাকায় পৃথিবীতে নিজেদেরকে নতুন আরো এক শক্তির অভ্যুদয় ঘটাল ইরান। যুদ্ধের চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সাথে নেতানিয়াহুর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় নেতানিয়াহু ইসরাইলে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছেন। অন্য দিকে ইরানের সামরিক সক্ষমতা অটুট রেখেই চুক্তি করা হচ্ছে।

ইরানের আক্রমণে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, জর্দান অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এসব দেশ তাদের নিরাপত্তার কর্তৃত্ব আমেরিকার কাছে রাখবে নাকি ইরানের সাথে নতুন নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করবে তা নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাবতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নতুন একটি নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান এবং সৌদি আরব সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। তুরস্কসহ আরো কয়েকটি মুসলিম দেশ এই নিরাপত্তা চুক্তিতে যোগ দিতে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পাকিস্তান সারা বিশ্বে স্বস্তি আনতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের তুলনায় তাদেরই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। ভারত যেখানে তাদের সংখ্যালঘু নাগরিকদের ওপর নির্যাতন ও নির্মূলে ব্যস্ত সেখানে পাকিস্তান সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ থামিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদেরকে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এই চুক্তির মূল প্রতিবন্ধক হলো নেতানিয়াহু নিজে। চুক্তিকে ভণ্ডুল করার সব চেষ্টাই তিনি করবেন। ইরানের অন্যতম শর্ত লেবানন আক্রমণ চালু রেখে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে যেন না পৌঁছানো যায় সেই পাঁয়তারা করবেন। ইরান কতটুকু ছাড় দেবে বা ট্রাম্প ইরানকে কতটুকু ছাড় দেবে তা এখনো অনিশ্চিত। ইরান কখনো তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না বা তৃতীয় কোনো দেশে হস্তান্তর করবে না। তারা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত সমৃদ্ধকরণ চাইবে। ইরান ডমেস্টিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পারমাণবিক চুল্লি চালু রাখা কখনো পরিত্যাগ করবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্প হয়তোবা তার অস্ত্রাগারে পুনরায় মজুদ সমৃদ্ধ করার সময়টুকু নেয়ার জন্য এই ৬০ দিনের চুক্তি আলোচনার ব্যবস্থা করেছেন। অন্য দিকে নেতানিয়াহু অপেক্ষাই করতে থাকবেন কখন পুনরায় ইরানে আক্রমণ পরিচালনা করে এই শক্তিকে নির্মূল করা যায়। কাজেই আজকের এই ‘সমঝোতা স্মারক’ শেষ বিচারে শান্তি আনবে নাকি আরেকটি যুদ্ধের অঙ্কুুর গজিয়ে রাখল তা দেখতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews