গতকাল দিবাগত রাতে অনুষ্ঠিত অস্কার আসরে সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’। গত গ্রীষ্মে মুক্তির পর থেকেই ছবিটি বিশ্বজুড়ে তুমুল সাড়া ফেলেছিল। অস্কারের এই সম্মান সেই সাফল্যের তালিকায় নতুন সংযোজন।
সান ফ্রান্সিসকোর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আট বছর বয়সী উনা হারম্যানের স্কুলে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় জিনিস হলো এই ছবির উজ্জ্বল চুলওয়ালা চরিত্রগুলোর স্টিকার। শিক্ষার্থীরা এগুলো নিজেদের মধ্যে আদান–প্রদান করছে।
কেপপ গার্ল গ্রুপের সদস্যরা তাদের সোনালি কণ্ঠ ব্যবহার করে দানবের সঙ্গে লড়াই করছে—এমন গল্প ঘিরেই তৈরি হয়েছে ছবিটি। ফলে উনার জীবনে এখন প্রায় সব জায়গাতেই রয়েছে ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’-এর প্রভাব।
কেপপ ডেমন হান্টার্স থিমে হওয়া জন্মদিনের পার্টিতে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে ছবির বিভিন্ন পণ্যসহ গুডি ব্যাগ, বিশাল কাটআউটের সঙ্গে ছবি তোলা হচ্ছে, আর সবাই মিলে গাইছে ছবির জনপ্রিয় গান।
উনার কাছে ছবিটির সবচেয়ে প্রিয় অংশ কোনটি—এটা ঠিক করা কঠিন। তাই সে বলেছে,
“চরিত্রগুলো, নাচের মুভ আর গান—সবকিছুই আমার ভালো লাগে!”
নেটফ্লিক্স থেকে অস্কার—সাফল্যের ঝড়
গত গ্রীষ্মে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই ছবিটি একের পর এক স্বীকৃতি পেয়েছে। জিতেছে গোল্ডেন গ্লোবের সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। পেয়েছে সেরা মৌলিক গানের পুরস্কার। ছবির একটি গান হয়েছে গ্র্যামি জয়ী প্রথম কেপপ গান। আর এবার অস্কারে মনোনীত দুই বিভাগেই জিতেছে পুরস্কার।
ছবিটির এই বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অনেককেই অবাক করেছে—এমনকি নির্মাতাদেরও। মুক্তির আগে যখন নেটফ্লিক্স ছবির পণ্য বাজারে আনার প্রস্তাব দেয়, তখন খুচরা বিক্রেতাদের আগ্রহ ছিল খুবই কম। কিন্তু এখন ছবির জনপ্রিয়তা দেখে কোম্পানিগুলো দ্রুত সেই খেলনা ও পণ্য বাজারে আনার দৌড়ে নেমেছে।
শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও মুগ্ধতা
উনার মা ক্রিস্টিন কাও জানান, তিনিও ছবিটি দেখে আবেগাপ্লুত হন। তিনি বলেন, “আমরা যখন ছবিটি দেখি, আমি প্রায়ই কেঁদে ফেলি। উনা আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কেন কাঁদছ?’ আমি বলি—কারণ এটি খুব সুন্দর।”
তার মতে, ছবিটির গল্প অনেক প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের মনেও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
পরিচয় ও আত্মস্বীকৃতির গল্প
ছবির প্রধান চরিত্র রুমি—যিনি একদিকে দানব শিকারি, অন্যদিকে গোপনে অর্ধেক দানব। এই দ্বৈত পরিচয়ের দ্বন্দ্ব অনেক দর্শকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।
ক্রিস্টিন বলেন,
“একজন এশিয়ান–আমেরিকান মেয়ের পারিবারিক প্রত্যাশা ও নিজের পরিচয়ের সঙ্গে লড়াই—এই বিষয়গুলো আমাদের অনেকের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। ছোটবেলায় আমাদের এমন গল্প ছিল না।”
কেপপ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা
এই সিনেমা মূলত কেপপ সংস্কৃতির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসার চিঠি। ছবির কাল্পনিক বয় ব্যান্ড সাজা বয়েজ–কে উনা তার প্রিয় ব্যান্ড BTS–এর সঙ্গে তুলনা করে। তার মতে,
“ওদের সবার চেহারা একটু আলাদা, আর তারা সবসময় তাদের লুক বদলায়।”
সাজা বয়েজের জনপ্রিয় গান ‘সোডা পপ’ অনেকেই তুলনা করছেন BTS–এর ‘বাটার’ গানের সঙ্গে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ও কেপপ গবেষক ড. গ্রেস কাও বলেন,
“আপনি যদি কেপপ ভক্ত হন, তাহলে এখানে অনেক মজার ভেতরের রসিকতা আছে। তবে কেপপ না জানলেও ছবিটি উপভোগ করা যায়।”

কেপপ ও পশ্চিমা পপের মিশ্রণ
ছবির সংগীত নির্মাণে কাজ করেছেন কেপপ ও হলিউড—দুই ধারার গীতিকার ও প্রযোজকরা। ফলে এর সাউন্ডট্র্যাক কেপপ ও পশ্চিমা পপের একটি চমৎকার মিশ্রণ তৈরি করেছে।
বার্কলি কলেজ অব মিউজিকের সহযোগী অধ্যাপক রে সিওল বলেন,
“প্রযোজকেরা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এমন একটি বৈশ্বিক সাউন্ড তৈরি করেছেন, যাতে এটি কেপপ হলেও সাধারণ শ্রোতাদের কাছে পরিচিত পপ সংগীতের মতো লাগে।”
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘কোরিয়ান ওয়েভ’
এই সিনেমার সাফল্য এমন সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
২০১২ সালে ভাইরাল গান ‘গ্যাংনাম স্টাইল’–এর পর থেকে কেপপ বিশ্ব সংস্কৃতিতে বড় জায়গা করে নিয়েছে। এখন BTS ও ব্ল্যাকপিঙ্কের মতো ব্যান্ড নিয়মিত পশ্চিমা পুরস্কার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে।
অস্কারের মঞ্চে ছবির প্রধান গানের কণ্ঠশিল্পী ইজে, রেই অ্যামি ও অড্রি নুনা ‘গোল্ডেন’ গানটি পরিবেশন করলে দর্শকেরা কেপপ কনসার্টের মতোই রঙিন লাইটস্টিক নেড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
অস্কারে সেরা মৌলিক গানের পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ইজে বলেন,
“ছোটবেলায় কেপপ পছন্দ করার জন্য অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসত। কিন্তু আজ সবাই আমাদের গান গাইছে—এতে আমি খুব গর্বিত।”
নতুন এক যুগের সূচনা
দক্ষিণ কোরিয়ায়ও ছবিটির সাফল্য ব্যাপক গর্বের জন্ম দিয়েছে। পাজু শহরের এক শিক্ষার্থী ইয়েনা ওহ ছবির চরিত্রগুলোর ফটোকার্ড সংগ্রহ করে অ্যালবামে সাজিয়ে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘কেপপ ডেমন হান্টার্স’ শুধু একটি সফল সিনেমা নয়—এটি বিশ্বজুড়ে ‘কোরিয়ান ওয়েভ’-এর নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রেস কাও বলেন,
“এটা শুধু কেপপ নয়, বরং ‘কে-এভরিথিং’—কোরিয়ান সংস্কৃতির সবকিছুরই নতুন এক বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার সময়।”