টানা কয়েক দিনের উদ্বেগ, গুজব ও নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের পর নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে, আবারো মেয়াদি আমানত হিসাব চালু করতে এগিয়ে আসছেন গ্রাহকেরা। একই সাথে অচল হয়ে পড়া এটিএম বুথ ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও ফের সচল হচ্ছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তারা আশা করছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এদিকে, ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান ও পরিচালক খোঁজার কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও পরিচালক নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নতুন পর্ষদ ঘিরে যেন আস্থাহীনতা আর সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে গ্রাহকদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার বড় অংশই এখন কাটতে শুরু করেছে। গতকাল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, আগের মতো হুমড়ি খেয়ে টাকা তুলে নেয়ার প্রবণতা কমে এসেছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার নগদ অর্থ উত্তোলনের তুলনায় জমা বেশি হয়েছে ৯৬৪ কোটি টাকা। যদিও ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থায় প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা স্থানান্তর হওয়ায় দিন শেষে ব্যাংকের নিট অবস্থান প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। তবে এটি আগের কয়েক দিনের তুলনায় অনেক উন্নত পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ গত কয়েক দিন ধরে ব্যাংকটির দৈনিক ঋণাত্মক অবস্থান ছিল প্রায় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের কয়েক দিনে আটকে থাকা ইএফটি ও আরটিজিএস লেনদেনগুলো এখন ধীরে ধীরে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এর ফলে সাময়িক কিছু চাপ থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে।

এদিকে আতঙ্কের কারণে যেসব গ্রাহক মেয়াদি আমানত হিসাব ভেঙে ফেলেছিলেন, তাদের একটি অংশ আবার ব্যাংকে ফিরে আসছেন। ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসাবের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫০২ জন গ্রাহক ফের হিসাব সচল করেছেন। এর মাধ্যমে নতুন করে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে।

গত সোমবার ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে এক ঘোষণায় বলা হয়, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে আতঙ্কিত হয়ে যেসব গ্রাহক ১ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে মেয়াদি আমানত আগাম নগদায়ন করেছেন, তারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে আবার হিসাব চালুর আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করলে তাদের আগের সব সুবিধা বহাল রাখা হবে। সাধারণত মেয়াদ পূর্তির আগে কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানত ভেঙে ফেললে সঞ্চয়ী হিসাবের হারে মুনাফা প্রদান করা হয়। কিন্তু ব্যাংকের এই বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। ফলে অনেক গ্রাহক আবার তাদের মেয়াদি হিসাব চালু করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রাজধানীর হেড অফিস কমপ্লেক্স করপোরেট শাখার প্রধান মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন বলেন, আগের তুলনায় নগদ উত্তোলনের চাপ অনেকটাই কমে এসেছে। গ্রাহকরা আবার মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) হিসাব চালুর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার একজন গ্রাহক তার এমটিডিআর হিসাব আবার চালু করে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন।

এদিকে, গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ এটিএম বুথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। অনেক গ্রাহক বুথ থেকে টাকা তুলতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েন। তবে মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় দেখা গেছে, ব্যাংকের অধিকাংশ এটিএম বুথ আবার সচল হয়েছে এবং গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করতে পারছেন। শুধু এটিএম নয়, অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্রাহকদের আস্থা ফেরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার বাইরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। দিনাজপুর শাখার ম্যানেজার ও এসএভিপি মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, গ্রাহকদের মধ্যে আবার আস্থা ফিরে আসছে। একজন গ্রাহক ৯ জুন তার তিন লাখ টাকার এমটিডিআর হিসাব ভেঙে টাকা তুলে নিয়েছিলেন। এখন ব্যাংকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি আবার সেই অর্থ জমা দিয়েছেন। অনেকেই নতুন করে এমটিডিআর খোলার জন্য ভিড় করছেন।

ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, গ্রাহকরা বর্তমানে এটিএম বুথ থেকে স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করতে পারছেন। তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও সচল রয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত ১ জুন থেকে একদল গ্রাহক আন্দোলন শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিতে ব্যাপক অঙ্কের অর্থ উত্তোলন শুরু হয় এবং তারল্য সঙ্কট দেখা দেয়। সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা চায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় গত রোববার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেয়া হয়। এখন নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকার্যক্রমই নির্ধারণ করবে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পথচলা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews