ব্যাংকের মূল কাজের একটি হলো ঋণ দেওয়া। একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা অথবা ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার। কিন্তু ঋণ দেওয়ার পরই কি ব্যাংকের দায়িত্ব শেষ? প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমরা সাধারণত ভাবি, ব্যাংক ঋণ দেবে, ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়ে ব্যবসা করবে এবং নির্ধারিত সময়ে কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করবে। ঋণ আদায় হয়ে গেলে সম্পর্কের একটি পর্ব শেষ। কিন্তু ব্যাংকিংয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের অন্য একটি শিক্ষা দেয়।

একজন ভালো ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের জন্য শুধু ভালোই নন, তিনি ব্যাংকের মূল্যবান সম্পদ। আর তাই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ যে, একজন ঋণগ্রহীতা ভালো হবে কি না, সেই দায়িত্ব কি শুধু ঋণগ্রহীতার? নাকি তাকে ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাংকেরও কিছু দায়িত্ব আছে? আমার মতে, প্রাথমিক দায়িত্ব অবশ্যই ঋণগ্রহীতার। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল ব্যাংকেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ঋণ দেওয়া সহজ, ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করা কঠিন

ব্যাংক একজন গ্রাহকের অনুকূলে একটি ঋণ অনুমোদন করতে পারে। কিন্তু গ্রাহক বা ঋণগ্রহীতা সেই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করবেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত ঋণের সাফল্য নির্ধারণ করে। ধরা যাক, একজন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণ পেলেন। তিনি যদি ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন, নগদ প্রবাহ (cash flow) এবং পরিশোধের সামর্থ্য (repayment capacity) না বুঝে ঋণের অর্থ ব্যবহার করেন, তাহলে ঋণটি একসময় তার জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। আবার একই ঋণের অর্থ যদি সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ব্যবসা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উৎস হতে পারে। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণের চেয়ে ঋণ ব্যবহারের দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরিতে ব্যাংকের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভালো ঋণগ্রহীতা জন্মগতভাবে ভালো হন না। ব্যাংকিংয়ে আমরা প্রায়ই বলি ‘ভালো ঋণগ্রহীতা’ এবং ‘খারাপ ঋণগ্রহীতা’। কিন্তু সবসময় কি একজন মানুষ জন্ম থেকেই ভালো ঋণগ্রহীতা?

অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্পর্কে ভালো জানেন, কিন্তু আর্থিক ব্যবস্থাপনা (financial management) সম্পর্কে ততো ভালো জানেন না। কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী উৎপাদনে দক্ষ, কিন্তু ক্যাশ ফ্লো ম্যানেজমেন্টে দুর্বল। কেউ মার্কেটিং অনেক ভালো বোঝেন, কিন্তু ব্যাংকিংয়ের নিয়ম-কানুন বোঝেন না। কেউ ব্যবসা বাড়াতে জানেন, কিন্তু ঋণের অর্থ ও নিজের মূলধনের মধ্যে পার্থক্য ঠিকভাবে বোঝেন না। এদের অনেকেই প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সময়মতো ব্যাংকিং দিক নির্দেশনা পেলে আরও ভালো উদ্যোক্তা এবং আরও ভালো ঋণগ্রহীতা হতে পারেন।

তাই ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ‘ঋণ প্রদানকারী’ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অনেক ক্ষেত্রে ‘আর্থিক অংশীদার’ হওয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারলে উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীর যেমন লাভ, তেমনি ব্যাংকেরও সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা কমে আসবে।

ঋণ দেওয়ার আগে প্রাথমিক ধারণা বা প্রশিক্ষণ (Orientation) ঋণ ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে

একজন ঋণগ্রহীতাকে ঋণ দেওয়ার আগে কিছু মৌলিক বিষয় বোঝানো যেতে পারে, যেমন- ঋণের উদ্দেশ্য কী? কোন অর্থ ব্যবসার working capital এবং কোনটি capital expenditure? Cash flow কেন গুরুত্বপূর্ণ? ব্যবসার টাকা ও ব্যক্তিগত টাকা আলাদা রাখা কেন জরুরি? কিস্তি পরিশোধের জন্য কীভাবে cash-flow planning করতে হয়? ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়? সমস্যা দেখা দিলে কখন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত?

এসব বিষয় হয়তো কোনো উদ্যোক্তার কাছে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ ছাড়াই উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা আরম্ভ করেন। ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে নিজের অজান্তেই ব্যবসাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন।

এই কারণে ব্যাংক যদি ঋণ দেওয়ার আগে সংক্ষিপ্ত borrower orientation প্রোগ্রাম চালু করে, তাহলে ভবিষ্যতের অনেক ঝুঁকি কমাতে পারে।

ঋণগ্রহীতার একটি সাধারণ ভুল হলো ব্যবসার অর্থ এবং ব্যক্তিগত অর্থের সীমারেখা মুছে ফেলা। ব্যবসার ক্যাশ ফ্লো ভালো যাচ্ছে দেখে ব্যক্তিগত বাড়ি, গাড়ি, জমি কিংবা অন্যান্য সম্পদ কেনার জন্য অর্থ বের করে নেওয়ার একটি মন্দ প্রবণতা প্রায় সকল ঋণগ্রহীতার মাঝেই পরিলক্ষিত হয়। শুরুতে হয়তো সমস্যা দেখা যায় না। কিন্তু ব্যবসায় একটু মন্দা এলেই বোঝা যায়, ব্যবসার প্রকৃত চলতি মূলধন (working capital) কোথায় ব্যয় করা হয়েছে।

ব্যাংক যদি ঋণ দেওয়ার সময় এবং পরবর্তীতে ঋণ ব্যবস্থাপনার পর্যায়ে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে উদ্যোক্তাকে সচেতন করে, তাহলে অনেক সম্ভাব্য সমস্যা আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঋণের অর্থ যথাযথ শৃঙ্খলার সাথে ব্যবহার একজন ভালো ঋণগ্রহীতার প্রথম পরিচয়।

একটি ঋণ অনুমোদন করেই ফাইল বন্ধ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের উচিত ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী ঋণগ্রহীতার ব্যবসার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা। ব্যবসার সেলস কমছে কি না, ক্যাশ ফ্লো-তে সমস্যা হচ্ছে কি না, ব্যাংকের বাইরে অতিরিক্ত ঋণ তৈরি হচ্ছে কি না, ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে সময়মতো নজর দেওয়া গেলে সমস্যা বড় হওয়ার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। মনিটরিংয়ের উদ্দেশ্য অবশ্যই ঋণগ্রহীতাকে হয়রানি করা নয়, বরং তাকে সাহায্য করা। মনিটরিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যা যখন ছোট, তখনই তা শনাক্ত করা। কারণ, একটি ছোট সমস্যা যতো সহজেই সমাধান করা যায়; বড় হয়ে যাওয়া সমস্যা অনেক সময় আর সহজে সমাধান করা যায় না।

অনেক ঋণগ্রহীতা ব্যবসায় সমস্যা শুরু হলে ব্যাংককে এড়িয়ে চলেন। ফোন ধরেন না। তথ্য দিতে চান না। ব্যাংকের কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চান না। তারা হয়তো মনে করেন, ব্যাংককে সমস্যা জানালে ব্যাংক আরও চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এর বিপরীত হতে পারে। যদি একজন ঋণগ্রহীতা সময়মতো তার সমস্যা ব্যাংককে জানান, তাহলে ব্যাংক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইন ও নীতিমালার মধ্যে থেকে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতে পারে। কিন্তু যখন সমস্যা গোপন করা হয় এবং দীর্ঘদিন পরে বিষয়টি প্রকাশ পায়, তখন সমাধানের সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। তাই ভালো ঋণগ্রহীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, সমস্যা হলে গোপন না করে অথবা পালিয়ে না গিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য ব্যাংকারকে সহযোগিতা করা।

ঋণগ্রহীতাকে ভালো হতে বলার আগে ব্যাংকের নিজের ব্যবস্থাপনাকেও কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করতে হবে। আমরা কি সঠিকভাবে ঋণগ্রহীতা নির্বাচন করেছি? ঋণ দেওয়ার আগে তার ব্যবসা যথেষ্ট বুঝেছি কি? ঋণের প্রকৃত উদ্দেশ্য যাচাই করেছি কি? তার ক্যাশ ফ্লো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করেছি কি? শুধু জামানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছি কি? ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার চাপ কি credit judgment-কে প্রভাবিত করেছে? ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব কিংবা সুপারিশ কি সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা রেখেছে?

কারণ, ভুলভাবে নির্বাচিত ঋণগ্রহীতাকে পরে ভালো ঋণগ্রহীতা বানানো অনেক কঠিন। সুতরাং, ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরির প্রথম ধাপ হলো সঠিক ঋণগ্রহীতা নির্বাচন।

ব্যাংক কি তাহলে ঋণগ্রহীতা বা উদ্যোক্তার ব্যবসা চালাবে? অবশ্যই নয়। ব্যাংকের কাজ ঋণগ্রহীতা বা উদ্যোক্তার ব্যবসা পরিচালনা করা নয়। উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তার নিজের। কিন্তু ব্যাংক তাকে আর্থিক শৃঙ্খলা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে সচেতন করতে পারে। এখানে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। সহায়তা করা আর নিয়ন্ত্রণ করা এক কথা নয়। ব্যাংককে এই সীমারেখাটিও বুঝতে হবে।

ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরি হলে লাভ কার? ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরি হলে লাভ শুধু ব্যাংকের নয়। একজন ভালো ঋণগ্রহীতা মানে ব্যাংকের কম credit risk, কম খেলাপি ঋণ, ভালো রিকভারি, অধিক স্থিতিশীল পোর্টফোলিও। ঋণগ্রহীতার জন্য এর অর্থ কম আর্থিক চাপ, ভালো credit history, ভবিষ্যতে সহজে অর্থায়নের সুযোগ, ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা। আর অর্থনীতির জন্য এর অর্থ বেশি উৎপাদন, বেশি কর্মসংস্থান, বেশি বিনিয়োগ, আরও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরি করা আসলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পাশাপাশি অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে।

তাহলে কী করা যেতে পারে? আমাদের ব্যাংকগুলো চাইলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি নতুন উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, নতুন ঋণগ্রহীতার জন্য সংক্ষিপ্ত Financial Literacy ও Borrower Orientation চালু করা। দ্বিতীয়ত, SME উদ্যোক্তাদের জন্য cash-flow management, accounting এবং financial discipline বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালার ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, ঋণ অনুমোদনের পর ঝুঁকির ভিত্তিতে monitoring আরও কার্যকর করা। চতুর্থত, সমস্যাগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় ঋণগ্রহীতাদের জন্য early warning ও counseling ব্যবস্থা তৈরি করা। পঞ্চমত, ঋণগ্রহীতাকে শুধু recovery-এর সময় নয়, ঋণের পুরো lifecycle-এ দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়ে সচেতন করা। ষষ্ঠত, ব্যাংকারদেরও borrower relationship management, credit judgment ও ethical banking বিষয়ে আরও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভালো ঋণগ্রহীতা তৈরির জন্য ভালো ব্যাংকারও দরকার।

লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক; সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, রূপালী ব্যাংক পিএলসি এবং সাবেক মহাব্যবস্থাপক, জনতা ব্যাংক পিএলসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews