আসিফ আরসালান
আজ মার্চের ১ তারিখ। বিএনপি সরকার শপথ নিয়েছে ১৩ দিন হলো। এ ১৩ দিনে কোনো সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা যাচাই করা সম্ভব নয়। একটি সরকার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গেলে কমপক্ষে ৩ মাস, অনেক ক্ষেত্রে ৬ মাস সময় দেওয়া হয়। এটি মেনে নিয়েই বলছি, বিএনপি সরকার তার প্রথম ৯ দিনেই এমন কিছু কাজ করেছে যেগুলো সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কোনো কোনো মহল থেকে এমন কথাও বলা হচ্ছে যে, জুলাই বিপ্লবের পর ইন্টারিম সরকার শেখ হাসিনার অনুসৃত নীতি থেকে একেবারে ইউটার্ন, অর্থাৎ সম্পূর্ণ সরে এসেছিলেন। বিশেষ করে তিনি ভারতের নাগপাশ থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনা এবং আওয়ামী তথা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারের শৃঙ্খল ভেঙ্গে ১৮ কোটি জনগণকে মুক্ত মানব হিসাবে মুক্ত আকাশের তলে বের করে আনেন। ড. ইউনূসের সরকারের অন্তত এ দুটি নীতি জনগণ বিপুলভাবে সমর্থন করেছেন এবং আজও করেন। এখন এ সরকারের প্রথম ৭/৮ দিনের কয়েকটি কাজ দেখে মনে হচ্ছে তারা ইউনূস সরকারের কয়েকটি মূল নীতি থেকে সরে আসছেন কিনা। পাঠক, আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই যে, এ মুহূর্তেই আমি এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করবো না। তবে কিছু কিছু মানুষের মনে যে সব ঘটনায় যে প্রশ্নের উদয় হয়েছে সেগুলো উল্লেখ করবো।
প্রথমেই আসে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ মোতাবেক নব নির্বাচিত ৩০০ জন সদস্যের কথা ছিলো ২টি শপথ গ্রহণ। একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে। আর একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে। বিএনপি সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। আর নেবেন বলেও মনে হচ্ছে না। পক্ষান্তরে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন সদস্য জাতীয় সংসদ এবং সংস্কার পরিষদ উভয় সংস্থারই শপথ গ্রহণ করেছেন। ১১ দলীয় জোট বিএনপির এ সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নেয়াকে জুলাই সনদের প্রতি অশ্রদ্ধা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তারেক রহমান শপথ গ্রহণের আগে জামায়াতের আমীর ড. শফিকুর রহমান, এনসিপির প্রেসিডেন্ট নাহিদ ইসলাম এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট চরমোনাইয়ের পীরের বাসভবনে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন যে নতুন বিএনপি সরকার হয়তো বিরোধী দলের সাথে সখ্যতা বজায় রেখেই সরকার চালাবেন। কিন্তু শুরুতেই সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ না নিয়ে বিএনপি বিরোধী দলের সাথে একটি আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করলো।
এরপর দ্রুত গতিতে কতগুলো ঘটনা ঘটলো। যেগুলো অবিশ্বাস্য। যেমন নব নিযুক্ত মন্ত্রী রবিউল আলম বললেন যে উভয়পক্ষের সমঝোতায় যে চাঁদা আদায় হয় সেটি চাঁদাবাজি নয়। জোর করে চাঁদা আদায় করলে সেটি হয় চাঁদাবাজি। বলাবাহুল্য, মন্ত্রী রবিউল আলমের এমন উক্তি সর্বমহলে সমালোচিত হয়।
এর পর ২১ ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জে ২১ ফেব্রুয়ারির এক সভায় বলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ বাংলা শব্দ নয়। যারা আমাদেরকে শোষণ করেছে তারাই এ শব্দ চালু করেছে। সেটি বাংলাদেশে চলবে না। এজন্য কেউ যদি আমাকে ভারতের দালাল বলে তাহলেও আমার কিছু আসে যায় না। বলাবাহুল্য, মন্ত্রী টুকুর এ মন্তব্যে জ্ঞানীগুনি মানুষ হতভম্ব হয়েছেন। কারণ তার এ উক্তি ভাষা সম্পর্কে তার জ্ঞানের দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে।
২১ ফেব্রুয়ারির পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদত্যাগ করেন। আসলে তাকে আগেই ইন্ডিকেশন দেওয়া হয়েছিলো যে তাকে আর ঐ পদে রাখা হবে না। এজন্য তিনি মানে মানে আগেই সরে পড়েছেন। এখানে একটি কথা বলে রাখতে চাই; সেটি হলো, যখন কোনো দেশে সরকার পরিবর্তন হয় এবং নতুন সরকার আসে, তখন প্রশাসনে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ক্ষমতা সে সরকারের একশত ভাগ থাকে। এ ব্যাপারে সাধারণত কেউ কিছু বলেন না। আমরাও বলছি না।
কিন্তু এর পরদিন এমন একটি পরিবর্তন করা হয় যেটি সুধী মহলে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেটি হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চীফ প্রসিকিউটার তাজুল ইসলামের অপসারণ এবং কট্টর বিএনপি নেতা এ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে তার স্থলাভিষিক্ত করা। এখানে একটি বিষয় নোট করার মতো। সকলেই বলছেন এবং এ সরকারও স্বীকার করছে যে, আমাদের বিচার বিভাগ নাকি স্বাধীন হয়েছে । সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপ্রতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ঘোষণা করেন যে, বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়েছে। সেখানে চীফ প্রসিকিউটারকে সরকার অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগ কিভাবে অপসারণ করেন এবং সে নির্বাহী বিভাগ কিভাবে আরেকজন চীফ প্রসিকিউটার নিয়োগ দেন? এটি করার কথা প্রধান বিচারপতির। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ দেয়া তো দূরের কথা, তার সাথে তো আলোচনাও করা হয়নি।
তবুও বিএনপি সরকার সেটা করেছে। চীফ প্রসিকিউটার হিসাবে তাজুল ইসলাম অনেক পরিশ্রম করে আইসিটিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গঠন করেছেন। শেখ হাসিনার মামলাটিকে তিনি নিখুঁতভাবে সাজিয়েছেন এবং পরিচালনা করেছেন। সমগ্র মামলা পরিচালনা এবং হাসিনা ও অন্যদের দণ্ড দেশ বিদেশে কোথাও সমালোচিত হয়নি। বরং এটি নিখুঁত ও নিরপক্ষে হয়েছে বলে প্রশংসিত হয়েছে। তাজুল ইসলামকে সরানোর পর তার নিরাপত্তা সঙ্কট প্রবল হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিহিংসা থেকে তাকে বাঁচাতে সরকার কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
সেনাবাহিনীতে একজন লে. জেনারেলসহ প্রায় ৯ জনের প্রমোশন ও পদায়ন হয়েছে। লে. জেনারেলকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনোরূপ মন্তব্য করা থেকে আমরা বিরত থাকলাম। অনুরূপভাবে ১২ জন সচিবের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, যদিও চুক্তি অনুযায়ী আরো কিছুদিন তাদের চাকরি ছিলো। এ ব্যাপারেও আমরা মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং খুলনা, সিলেট, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৬টি সিটি কর্পোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ করেছে যারা বিএনপির হার্ডকোর নেতা। অথচ তার একদিন আগেই স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেছিলেন যে, সহসাই সিটি কর্পোরেশেনসমূহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনও বলেছিলো যে, সিটি কর্পোরেশনসমূহে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হলো কেনো? কত দিনের জন্য? যে নির্বাচনের কথা মির্জা ফখরুল একদিন আগেই বলেছেন সে নির্বাচনটি এখন কবে হবে? যারা প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন তারা কি কেউ মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন? আমরা তো জানি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাকে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নাকি গ্রীন সিগন্যালও দেয়া হয়েছিলো। যখন ইলেকশন হবে তখন সালামের মতো মানুষজন কি ইলেকশন করতে পারবেন? পারলে কি সেই ইলেকশন প্রভাবিত হবে না?
হঠাৎ করে দৈনিক ‘কালের কন্ঠে’ প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ঢাউস সাইজের ইন্টারভিউ ছাপা হলো কেনো? ইন্টারিম সরকারের আমলে তাকে পর্দার আড়ালে রাখা হয়েছিলো। কারণ তিনি একজন কট্টর আওয়ামীপন্থী। পাবনাতে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ করার পর তিনি আওয়ামী লীগ করেন। শেখ মুজিবের পতনের পর শহীদ জিয়ার প্রেসিডেন্সির আমলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ভারতে গিয়ে ভারতের ট্রেনিং ও অস্ত্র নিয়ে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো তাদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও ছিলেন বলে শোনা যায়। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি ইউটিউব আপলোড হয়েছে সেখান থেকে জানা যায় যে, তিনি শেখ হাসিনার কদমবুসি করে ধন্য হতেন। শেখ হাসিনাই তাকে দুদকের সদস্য করেছিলেন, আবার শেখ হাসিনাই তাকে ‘আমি ডামি’ নির্বাচন করার জন্য প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন।
কালের কন্ঠের ইন্টারভিউতে তিনি ড. ইউনূসের ১৪ গোষ্ঠী উদ্ধার করেছেন, কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের মধ্যযুগীয় বর্বরতা সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। এখন তাকে বঙ্গভবন থেকে বের করে এনে প্রধানমন্ত্রীর পাশে দেখা যাচ্ছে। নতুন সংসদে তিনি উদ্বোধনী ভাষণও দেবেন। পর্যবেক্ষক মহল এই ঘটনার মাধ্যমে বিএনপির নীতিতে প্যারাডাইম শিফট, অর্থাৎ বিশাল বাঁক নেয়া বলে ধারণা করছেন।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওয়ামী মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে জামিন দেয়া হয়েছে। জামিন দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের কুখ্যাত আওয়ামী এমপি মাদক সম্রাট আব্দুর রহমান বদিকে।
এর মধ্যে সরকার আর একটি পরিবর্তন করেছে যেটি সর্বমহলে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। তিনি হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তাকে অপসারণ করে তার জায়গায় বসানো হয়েছে মুশতাকুর রহমান নামের এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো দেশের সমস্ত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক এ ব্যাংকটিতে কোনো দিন কোনো ব্যবসায়ীকে বসানো হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে যে, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে তার রয়েছে ৮৯ কোটি টাকার ঋণ। কয়েক মাস আগে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তিনি খেলাপী ঋণের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন। অর্থাৎ এখনো ট্রাস্ট ব্যাংকে তার ঋণ রয়েছে ৮৭ কোটি টাকা। তেমন একজন ব্যক্তি হয়েছেন সমস্ত ব্যাংকের হর্তাকর্তা। দেশের একাধিক গন্যমান্য ব্যক্তি বলেছেনে যে, মুশতাকুরের নিয়োগ যেনো শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেয়া।
মাগুরাতে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ মিজানুর রহমান। একজন সিটিং জাজ একজন পলিটিক্যাল মন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। এমন ঘটনার সাথে আওয়ামী ঘটনাবলীর কোনো তফাৎ নেই।
আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক টাকাও খাননি, রিজার্ভ চুরি করেন নি, পদ্মা ব্যাংক-বেসিক ব্যাংক হজম করেননি। উনার বেতন-ভাতা ছিল দেড় লাখ টাকা। তাঁর আগের অফিসের বেতনের চাইতে কয়েক গুণ কম। অথচ তার মতো মানুষ এবং তার উপদেষ্টা আহসানুল্লাহকে মব সৃষ্টি করে বিতাড়িত করা হয়। তার উপদেষ্টার গায়ে হাতও তোলা হয়।
৯ দিনেই বিএনপি সরকারের এত কীর্তি। আগামী দিনগুলোতে আরো কত কিছুই না দেখবো।