‘পনেরো মাস বয়সি ওরহান রাদি ছিল আমার একমাত্র নাতি। ওর বাবা প্রবাসে থাকায় আমিই তাকে লালনপালন করে আসছিলাম। বেশির ভাগ সময়ই কোলে-পিঠে রাখতাম। কিন্তু সামান্য হাম আমার কলিজার টুকরা নাতিকে কেড়ে নিল! আমি এখন বাড়িতে থাকতে পারি না! সারাক্ষণ মনে হয়, এই বুঝি নাতি আমার কোলে আসার জন্য ছটফট করছে।’
২৬ মার্চ রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে মারা যাওয়া নাতির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে শিশুর মতো কেঁদে উঠছিলেন কুমিল্লার বাসিন্দা কাজী দেলোয়ার হোসেন জুয়েল।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘শুরুতেই হাম আক্রান্ত হলেও আমরা বুঝতে পারিনি। চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা ও ঢাকার একাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চেম্বারে দৌড়াদৌড়ি করেছি। চিকিৎসকরাও রোগ ধরতে পারেননি। শুধু জ্বর ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দিয়েছে। শেষদিকে ঢাকায় হামের চিকিৎসা পেলেও ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।
কাজী জুয়েল বলেন, রোজার শুরুর দিকে নাতির জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি ঝরা শুরু হয়। প্রথমে কুমিল্লার বেসরকারি ময়নামতী হাসপাতালে শিশু ডাক্তার মান্নানের অধীনে ভর্তি করি। কিছুটা সুস্থ হলে রিলিজ দেয়। বাড়ি ফিরে জ্বর উঠলে কুমিল্লার বেসরকারি টাওয়ার হাসপাতালে ডাক্তার রিপনের কাছে নিই। তিনি ভর্তির পরামর্শ দিলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা জানান, নিউমোনিয়া ও রক্তে অক্সিজেন ঘাটতি হয়েছে। নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন দিতে হবে। মেডিকেলে অক্সিজেন সংকট থাকায় এক সপ্তাহ পর অন্য জায়গায় নিতে বলে। বাধ্য হয়ে কুমিল্লার বেসরকারি মুন হাসপাতালে নিয়ে যাই। এই প্রথম চিকিৎসকরা হাম হয়েছে জানিয়ে ঢাকায় রেফার করেন। ঢাকায় এনে উত্তরার শিনশিন হাসপাতালে চারদিন ভর্তি থাকি। এরপর জানানো হয়, তারা হামের চিকিৎসা দেন না। রোগীকে বাঁচাতে হলে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিতে হবে। সংক্রামক ব্যাধিতে আসার পর জানানো হয়, জ্বরের শুরু থেকেই নাতি হামে ভুগছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেছে।
কাজী জুয়েল বলেন, রোজা থেকেও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নাতির জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে একাধিকবার নিচতলা থেকে পাঁচতলায় উঠেছি। কীভাবে রোজা ও ঈদ গেছে বুঝতে পারিনি। সব হাসপাতালেই চিকিৎসক-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা দুর্ব্যবহার করেছে। চিকিৎসার জন্য লাখ টাকা খরচ করেছি। আইসিইউতেও নিয়েছি। এতকিছুর পরও চিকিৎসকদের অবহেলায় নাতিকে বাঁচাতে পারিনি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু স্বাস্থ্য) ডা. এআরএম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে জানান, তাদের হাসপাতালে হামে মারা যাওয়া বেশির ভাগ রোগীই শেষ মূহূর্তে জটিল পরিস্থিতি নিয়ে আসছে। অনেকে পেরিফেরিতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে বেশি খারাপ হচ্ছে। হাসপাতালে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী ও লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন : আইসিইউ, পিআইসিইউ, এনআইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সংকট রয়েছে। অপুষ্টি ও হার্টের সমস্যাযুক্ত অনেক হাম আক্রান্ত রোগীও মারা যাচ্ছে। মৃতদের ৬০ শতাংশ টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। হাম উপসর্গযুক্ত রোগীদের প্রথম থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেলে মৃত্যু কমে আসবে।
এদিকে বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে একজন এবং হাম সন্দেহে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ১৯৪ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে ৩৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জন এবং এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২৮ হাজার ৩৩৪ জন।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে-স্বাস্থ্যমন্ত্রী : এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পেরেছি।’ বৃহস্পতিবার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ‘জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন কী অবস্থা ছিল। সবার প্রচেষ্টায় আমরা হাম মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে সক্ষম হচ্ছি। অনেক ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। একটি চীনা টিমের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে।’
শিশুদের মায়ের বুকের দুধের বিকল্প নেই জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বলতে হয়, এখনকার মায়েরা ব্রেস্ট ফিডিংয়ে অভ্যস্ত নন। এ সংখ্যা দিনদিন কমে আসছে।
হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ : স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে সক্ষম হওয়ার কথা বললেও সরকারি হাসপাতালগুলোয় হামের রোগীদের জন্য শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শয্যা সংকটের অজুহাতে কোনো হাম রোগীকে ফেরত পাঠানো যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাসপাতালে আসা হাম বা হাম উপসর্গের রোগীদের ক্ষেত্রে শয্যা খালি না থাকলেও ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে জটিল অবস্থা হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে রেফার করা যাবে। রেফার করার ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের নির্ধারিত রেফারাল চেইন অনুসরণ করতে হবে। এ নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রধানকে দায় বহন করতে হবে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। ৯৫ ভাগ শিশু টিকার আওতায় না এলে হামের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠে না। দেশে টিকাদানের কাভারেজ আশানুরূপ না হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মোকাবিলা করতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে হামের মহামারি বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে, যাতে হাসপাতালগুলো বিশেষ বরাদ্দ পায় এবং রোগী ম্যানেজমেন্ট ভালো হয়।