মানুষের ব্যক্তিত্ব কীভাবে গঠিত হয়—সেটি কি তার ডিএনএ বা জিনের কারসাজি, নাকি বেড়ে ওঠার পরিবেশের ফল? দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এ ‘নেচার বনাম নার্চার’ (প্রকৃতি বনাম প্রতিপালন) বিতর্ক নতুন করে উসকে দিচ্ছে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মানুষের স্বভাবচরিত্র গঠনের নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত জটিল এক সমীকরণ।

২০০৯ সালে ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরে এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে আব্দেল মালেক বায়ৌত নামের এক ব্যক্তির ৯ বছরের কারাদণ্ড হয়। তবে তার আইনজীবী এক অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করেন। তিনি দাবি করেন, বায়ৌতের ডিএনএ-তে ‘ওয়ারিয়র জিন’ (warrior gene) বা যুদ্ধংদেহী জিনের উপস্থিতি রয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার বরাতে তিনি বলেন, এ জিনের মিউটেশনের কারণে বায়ৌত আক্রমণাত্মক আচরণ করতে বাধ্য হয়েছেন, তাই এর দায় পুরোপুরি তার নয়। আদালত এ যুক্তি গ্রহণ করে তার সাজা এক বছর কমিয়ে দেন।

নব্বইয়ের দশক থেকেই ‘এমএওএ’ (MAOA) জিনের সঙ্গে সহিংস আচরণের একটি যোগসূত্র পেয়েছিলেন গবেষকরা। ২০০৪ সালের দিকে সংবাদমাধ্যমে এটি ‘ওয়ারিয়র জিন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে বর্তমানের বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটাও সহজ নয়। নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউএমসি-র জিনতত্ত্ববিদ আয়সু ওকবে বলেন, ‘আগে ভাবা হতো দু-একটি জিনের বড় প্রভাবে আচরণ নির্ধারিত হয়। কিন্তু সেই ধারণা এখন পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’

যমজ ভাইদের অদ্ভুত মিল

ব্যক্তিত্বের ওপর জিনের প্রভাব বুঝতে দীর্ঘদিন ধরে যমজদের ওপর গবেষণা চলছে। ১৯৭৯ সালে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী টমাস বুচার্ড শৈশবে আলাদা হয়ে যাওয়া যমজদের খুঁজে বের করার এক প্রকল্প হাতে নেন। সেখানে তিনি ‘জিম টুইনস’ নামে দুই ভাইয়ের দেখা পান। ৩৯ বছর বয়সে যখন তাদের আবার দেখা হয়, তখন জানা যায় অবিশ্বাস্য সব মিলের কথা।

দেখা গেছে, দুই ভাই-ই লিন্ডা নামের নারীকে বিয়ে করেছিলেন, পরে বিবাহবিচ্ছেদ হয় এবং দ্বিতীয়বার বেটি নামের নারীকে বিয়ে করেন। এমনকি তারা তাদের পোষা কুকুরের নামও রেখেছিলেন একই—‘টয়’। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এটি নিছক কাকতালীয় হতে পারে। কারণ ডিএনএ পুরোপুরি এক হলেও যমজদের ব্যক্তিত্বে সূক্ষ্ম অনেক অমিল থাকে।

জিন নাকি পরিবেশ?

২০১৫ সালে ২ হাজার ৫০০টিরও বেশি যমজ গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রায় ৪৭ শতাংশ জিনের ওপর নির্ভরশীল। বাকি ৫৩ শতাংশই পরিবেশ বা অন্যান্য প্রভাবের ফল। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের মানুষ, জীবনযুদ্ধ এবং বেড়ে ওঠার ধরনই ঠিক করে দেয় আমরা শেষ পর্যন্ত কেমন মানুষ হব।

তবে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রেন্ট রবার্টস একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কোনো বড় দুর্ঘটনা বা ট্রমা (মানসিক আঘাত) মানুষের মৌলিক ব্যক্তিত্বে খুব একটা স্থায়ী ছাপ ফেলে না। আমাদের সংস্কৃতিতে ‘ট্রমা থেকে উত্তরণ’ বা বদলে যাওয়ার গল্প জনপ্রিয় হলেও, বিজ্ঞান বলছে ট্রমা আপনাকে পুরোপুরি বদলে দেয় না। বরং গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক চাপ অনাগত সন্তানের মেজাজ-মর্জিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যক্তিত্বের ঠিকানা যেখানে

সাম্প্রতিক কিছু জিনতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রধান কেন্দ্র হলো মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’। পরিকল্পনা করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জটিল কাজগুলো এ অংশেই হয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল লেভি জানান, স্ট্রেস বা মানসিক চাপের সময় আমাদের শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা একটি বিশেষ জিনের ওপর নির্ভর করে, যা নিউরোটিসিজম বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত।

পরিশেষে গবেষকদের মত হলো, মানুষের আচরণকে শুধু কয়েকটি জিন বা নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার ফ্রেমে বন্দি করা অসম্ভব। মানুষ তার জিনের দাসে পরিণত হবে—এমন কোনো কথা নেই। বরং পরিবেশ এবং জিনের পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াই একজন মানুষকে অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলে। মানুষ যে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে বদলাতে পারে, এটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

সূত্র: বিবিসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews