মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বীজ সম্পর্কে মাটির ওপর থেকে কিছুই জানা যায় যায় না; মাটির নিচে নিস্তব্ধ অন্ধকারের মধ্যে গড়ে ওঠে সেই বীজটির প্রাণ, আলো ও অস্তিত্বের দিকে এক অভূতপূর্ব যাত্রা।মানুষের সৃষ্টিও ঠিক এমনই এক রহস্যময় যাত্রাযার সূচনা হয় একটি অণুবীক্ষণিক সত্তা থেকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না; কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি সম্পূর্ণ মানুষের সম্ভাবনা। সেই সত্তার নাম শুক্রাণু।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরআনে বারবার মানুষকে তার সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে বলেছেন। সূরা আত-তারিকে তিনি বলেন, “অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিৎ, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ? তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকে।” (সূরা আত-তারিক; ৫ ও ৬) উক্ত আয়াত মানুষকে এই আহ্বানও জানায় যে, নিজেকে জানো, ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করো এবং সেই বোধ থেকে স্রষ্টার মহত্ত্বের সামনে মাথা নত করো। সূরা ইনসানে আরও বলা হয়েছে, “আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, আমি তাকে পরীক্ষা করব, ফলে আমি তাকে বানিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন।” (আল-ইনসান; আদ-দাহর; ২) “মিশ্র” শব্দটি আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় স্পষ্ট হয় বীর্যপাত একটি যৌগিক তরল; এতে শুক্রাণুর সাথে প্রস্টেট, সেমিনাল ভেসিকেল ও বালবোইউরেথ্রাল গ্রন্থির নিঃসরণ মিলিত থাকে।
আধুনিক বিজ্ঞানের মতে, একজন সুস্থ পুরুষের অ-কোষে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার শুক্রাণু তৈরি হয়। প্রতি মিনিটে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় আশি থেকে এক লক্ষে। আর প্রতিদিনের হিসাব ধরলে একজন মানুষের শরীর তৈরি করছে দশ থেকে বিশ কোটি শুক্রাণু। প্রতিদিনের এই শুক্রাণু উৎপাদন এক ধারাবাহিক বিস্ময় যা এক অলৌকিক কারখানার অবিরাম চলমানতাকে প্রতিফলিত করে। একটি একক শুক্রাণু পরিপক্ব হতে সময় নেয় প্রায় চুয়াত্তর দিন বা আড়াই মাস। তিনটি ধাপে এই যাত্রা সম্পন্ন হয় প্রথমে অ-কোষের ভেতরে প্রাথমিক কোষবিভাজন, তারপর এপিডিডিমিসে স্থানান্তর এবং সেখানে দুই থেকে তিন সপ্তাহ অবস্থান করে সাঁতার কাটার ও নিষিক্ত করার ক্ষমতা অর্জন এবং সবশেষে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা।
এখন একটু থামুন এবং ভাবুন। একজন মানুষ হয়তো এই মুহূর্তে নিশ্চিন্তে বসে আছে। কিন্তু তার জানাই নেই যে, তার শরীরের মধ্যে একটি অবিশ্রান্ত কারখানা অবিরাম চালু রয়েছে! লক্ষ লক্ষ সত্তার জন্ম হচ্ছে, পরিণত ও প্রস্তুত হচ্ছে। সচেতন নির্দেশ ছাড়াই। বোতাম না চেপেই। এটাই হলো সেই সুক্ষ্ম নিদর্শন, যা দিয়ে আল্লাহ বলছেন তুমি কি দেখছ না?
আরও বিস্ময়কর হলো অ-কোষের অবস্থান। প্রশ্ন জাগে, পুরুষের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য অঙ্গটি কেন শরীরের বাইরে ঝুলে থাকে? হাড় ও মাংসের সুরক্ষিত প্রাচীরের মধ্যে নয় কেন? উত্তরটি এলে মাথা নত হয়ে আসে কারণ শুক্রাণু তৈরির জন্য দরকার এমন একটি তাপমাত্রা যা মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। শরীরের মধ্যে সেটি সম্ভব নয়। তাই অ-কোষ থাকে বাইরে, একটি বিশেষ থলির মধ্যে যার নাম স্ক্রোটাম।
এখানেই শেষ নয়। এই থলিতে আছে ক্রেমাস্টার মাংসপেশি নামক এক চমৎকার নিয়ন্ত্রক। গরম হলে এই পেশি শিথিল হয়ে অ-কোষকে শরীর থেকে দূরে ঝুলিয়ে দেয় যেন প্রাকৃতিক এয়ার কন্ডিশনিং। ঠান্ডা হলে সংকুচিত হয়ে কাছে টেনে নেয় যেন উষ্ণ আলিঙ্গন। এই স্বয়ংক্রিয় তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কথা মানুষ জেনেছে গত কয়েক দশকে, কিন্তু এই ব্যবস্থা কাজ করে আসছে প্রথম মানব আদম (আঃ)-র সময় থেকে। যিনি এই ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছেন, তিনি এর প্রয়োজন ও কার্যকারিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত তাই তিনি এভাবে গড়ে তুলেছেন; যার মধ্যেই রয়েছে নকশা, হিকমাহ এবং আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা।
এই বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে মিলিয়ে দেখুন মহানবী (সাঃ)-র হাদিসটি, “নিশ্চয় তোমার নিজের ওপর তোমার শরীরের হক আছে। তাই রোজা রাখো এবং রোজা ভাঙো, নামাজ পড়ো এবং ঘুমাও।” (সুনান আবু দাউদ, ১,৩৬৯) শরীর একটি আমানত। এই আমানতের যে জটিল রক্ষণাবেক্ষণ-ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তৈরি করে দিয়েছেন, তা বোঝা ইবাদতের এক গভীর স্তর।
এবার দৃষ্টি প্রসারিত করা যাক পুরুষ জাতির বৃহত্তর পরিসরে। কোরআন বলছে, “পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান।” (সূরা আন-নিসা;৩৪)। এই আয়াতে “কাওয়ামুনা” বলে যে শব্দ আছে সেটা কর্তৃত্বের পাশাপাশি দায়িত্ব, সুরক্ষা ও পরিচালনার ভারও বোঝায়। পুরুষের সৃষ্টির মধ্যে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিহিত নির্মাণ, রক্ষা ও অন্বেষণের কাজ সম্পাদন করা।
ইতিহাসে পুরুষদের শক্তি ও সাহসের অনেক দৃষ্টান্ত আছে; সেগুলো বৈচিত্র্যময় ও তাৎপর্যপূর্ণ। আফ্রিকার মাসাই যোদ্ধাদের মধ্যে একসময় খালি হাতে সিংহ শিকারকে বীরত্বের পরীক্ষা হিসেবে ধরা হতো; এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে পূর্ণ মর্যাদা পাওয়া যেত না। তবে বর্তমানে এই প্রথা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংরক্ষণ আইন ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে তা আর পালন করা হয় না। স্পার্টার যোদ্ধারা সাত বছর বয়স থেকেই শুরু করত ‘অ্যাগোগে’ নামক কঠোর প্রশিক্ষণ শীতের রাতে খালি পায়ে পাথরের ওপর ঘুমানো, খিদে পেটে মাইলের পর মাইল হাঁটা, শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে মনকে শান্ত রাখা। থার্মোপাইলির যুদ্ধে তিনশো স্পার্টান সৈনিক লক্ষাধিক পার্সিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনদিন লড়াই করেছিল সাহস ও শৃঙ্খলার জোরেই। সেই যুদ্ধ তারা হেরেছিল, কিন্তু সেই হার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয়গাঁথার একটি হয়ে আছে।
মঙ্গোল যোদ্ধাদের বৈশিষ্ট্য ছিল তারা অল্প বয়স থেকেই ঘোড়া চালানো ও যুদ্ধের কৌশলে দক্ষ হয়ে উঠত। চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে তারা ইতিহাসের বৃহত্তম স্থলসাম্রাজ্য গড়েছিল ভূমধ্যসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত। তাদের তীরন্দাজি দক্ষতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সেই যুগের সবচেয়ে আধুনিক। অ্যাজটেক যোদ্ধারা মেক্সিকোর উপত্যকায় যে সামরিক সংস্কৃতি গড়েছিল, তাতে বীরত্ব ছিল ধর্মের সমতুল্য। জাপানের সামুরাইরা তলোয়ার ও দর্শন দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিত। বুশিদোর নীতিমালা যুদ্ধের নিয়মের পাশাপাশি জীবনযাপনের দর্শনও ছিল—বিশ্বস্ততা, সম্মান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে।
মুসলিম পুরুষের ইতিহাস আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। খালিদ বিন ওয়ালিদ যাকে রাসুল (সাঃ) ‘সাইফুল্লাহ’ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দিয়েছিলেন তিনি তাঁর সামরিক জীবনে একটিও যুদ্ধে পরাজিত হননি। ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করা ছিল সামরিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৌশলগত বিজয়। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি সেনাপতি হিসেবে যেমন পরিচিত, তেমনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবেও সম্মানিত। যিনি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেছিলেন মহানুভবতা দিয়ে। মুসলিম বিশ্বের স্বর্ণযুগে ইবনে সিনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, আল খাওয়ারিজমি যে বীজগণিত আবিষ্কার করেছিলেন, ইবনে বাতুতা যে ভ্রমণ করেছিলেন এগুলো কেবল ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, এগুলো একটি সভ্যতার বৌদ্ধিক শক্তির প্রমাণ।
পুরুষের মেধার ইতিহাস লিখতে হলে গ্রীসের দার্শনিকদের কথা বলতে হয়। সক্রেটিস মানুষের চিন্তা, সামাজিক কাঠামো এবং প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। সক্রেটিস, তাঁর শিষ্য প্লেটো এবং প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলএই তিনজনের চিন্তাধারা মিলেই পশ্চিমা দর্শন ও বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একাধিক ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন; তিনি ছিলেন শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, অ্যানাটমিস্ট ও সংগীতজ্ঞ এই কারণেই পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে “রেনেসাঁসের মানব” বলে অভিহিত করেছে। (অসমাপ্ত)
লেখক: আসাম, ভারত: পেশা: শিক্ষকত।