‘কলা রুয়ে না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত’- খনার এই বচন মনে করিয়ে দেয় কলা চাষ করে কৃষকের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান সম্ভব ছিল সেই সুপ্রাচীনকালেও। অতীতে কৃষিপ্রধান এই বঙ্গীয় বদ্বীপে স্বয়ম্ভর অর্থনীতি অনায়াসসাধ্য ছিল না। পরবর্তী দীর্ঘ উপনিবেশবাদের কালে কৃষি অর্থনীতির আন্তসহায়ক সলিলা শক্তিতে ফাটল ধরে, অতিমাত্রায় একঘরে হয়ে পড়ে স্থানীয় পণ্য, বাজারব্যবস্থা হয় সঙ্কুচিত, উৎসাহে ভাটা পড়ে কৃষি উৎপাদনে, সৃজনশীলতায়, বুননে, কর্ম-কুশলতায়।

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশে কৃষি খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। আর এতে যেমন বিকশিত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি, আবার বিকশিত গ্রামীণ অর্থনীতিই এই উন্নতির পেছনে অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সুতরাং এটি অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতির পেছনে গ্রামীণ অর্থনীতি তথা ‘লাঙলের পেছনে যে মানুষ’ সেই পরিশ্রমী আমজনতার অনবদ্য অবদান ছিল বা আছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭১-৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, একই সীমা-পরিসীমার সেই বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৮ কোটি। ১৯৭১-৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে শুধু নয়, বৈশ্বিক মন্দার কারণেও তীব্র খাদ্য ও সম্পদ সঙ্কটে ছিল যে দেশ, সেই বাংলাদেশ ৫৫ বছর পর এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও ইতোমধ্যে চাষযোগ্য জমি কমেছে এবং ভোক্তার সংখ্যা ও চাহিদা বেড়েছে আড়াই গুণ। এই নীরব বিপ্লবের নায়ক বাংলাদেশের কৃষক এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অপ্রচলিত পণ্য উৎপাদনে, বিপণনে, ব্যবহার উপযোগিতায় ঘটে যাওয়া ব্যাপক পরিবর্তন বা উন্নতি। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্র্রের কৃষি দফতরের (ইউএসডিএ) প্রত্যয়ন মতে, বাংলাদেশ এখন চাল, পুকুর-খাল-বিলের উন্মুক্ত পানিতে মাছ এবং শাকসবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, অ্যাকুয়াকালচার অর্থাৎ- মাছ চাষে পঞ্চম এবং মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম অবস্থানে।

সংবিধানের ১৬ নং অনুচ্ছেদে ‘নগর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি-বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা, কুটিরশিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’ বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচি তথা গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই নিরন্তর কাজ চলছে, উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে। বলা বাহুল্য, অপ্রচলিত পণ্য বিকাশে নানান উদ্ভাবনী কর্মযজ্ঞে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার পারঙ্গমতায় আজকের এই টেকসই সাফল্য। এ সাফল্য ধরে রাখতে হবে, করতে হবে আরো বেগবান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যুরোর মতে (বিবিএস) ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যা-২০১৯’ উপাত্ত অনুযায়ী, দেশের মোট ১৬ কোটি ৫৭ লাখ জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে, বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। অর্থনৈতিক মুক্তি তথা স্বয়ম্ভর জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক শক্তি বিকাশের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন অপরিহার্য। লক্ষণীয়, সেখানে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এই বিকাশ ত্বরান্বিত করছে। এসএমই ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) পরিচালিত ‘ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত-২০১৭’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ২০০৯ সালে শিক্ষিত ২০ শতাংশ নারী ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০১৭ সালে তা বেড়ে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার হওয়ায় বাড়ছে নারীর সম্পৃক্ততা। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অকৃষি খাতের অবদানও বাড়ছে। মাইক্রোক্রেডিটের দেশ বাংলাদেশ। মাইক্রোক্রেডিট গ্রামীণ অর্থনীতিতে অপ্রচলিত পণ্যের বিকাশ এবং সেখানে নারীর অংশগ্রহণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। বর্তমানে পাইলট পর্যায়ে পরীক্ষা প্রয়োগ পর্যবেক্ষণাধীন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এই যাত্রাকে, অগ্রগতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বৈচিত্র্য ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের অগ্রসরমান গ্রামীণ অর্থনীতিতে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বাড়ছে বিনিয়োগ। কৃষিজ ও অকৃষিজ কর্মকাণ্ডের বহুগুণ এবং বহুমুখী সম্প্রসারণ হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং ব্যবসাবাণিজ্য প্রসার পাওয়ায় গ্রামীণ জনপদে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও চাঞ্চল্য বেড়েই চলছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে অকৃষি খাতের অবদানও বাড়ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে একজন উদ্যোক্তা ক্ষুদ্র মূলধন গঠনের পাশাপাশি সমাজে সম্পদ তৈরি করেন এবং এ প্রক্রিয়ায় বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য হ্রাস পায়। গ্রামপর্যায়ে উদীয়মান উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় যেমন- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কুটির শিল্প, কৃষিকাজ এবং অর্থনৈতিক বিকাশের শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করেন। দেশীয় সম্পদ অর্থাৎ, স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে স্থানীয় জীবনযাত্রার মান উন্নীতকরণের মাধ্যমে স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে তাদের রয়েছে তাৎপর্যপূণ অবদান। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে এটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে যে, গ্রামীণ অঞ্চলের বিকাশ ক্রমেই ঊর্ধ্বগামী হয়ে অর্থনীতির সহায়ক সলিলা শক্তি বা সহনশীলতা (রেজিলিয়েন্স) দিন দিন বেড়েছে। ব্যক্তি, পরিবার এবং সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে এবং একটি স্বাস্থ্যকর অর্থনীতি ও পরিবেশ বজায় রাখতে সেই সহনশীল শক্তি প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। মহামারী করোনায় বিপর্যয় মোকাবেলায় ধকল সইবার সক্ষমতা গ্রামীণ অর্থনীতি দেখাতে পেরেছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে এই সক্ষমতা ছিল বেশ দুর্বল। বর্তমানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দেশজ মোট উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান ২৫ শতাংশ, সেখানে সব শিল্প খাতের রয়েছে ৩৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ৭৮ লাখ উদ্যোক্তাই জিডিপিতে এ অবদান রাখছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অপ্রচলিত পণ্যের তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে- মৎস্য ও হিমায়িত চিংড়ি, ব্যাঙের পা, শুঁটকি, কাঁকড়া, কুঁচে, শাকসবজি, শাকসবজির বীজ, নারিকেলের ছোবড়া ও খোল দিয়ে তৈরি পণ্য, ফলমূল, পান-সুপারি, গোলআলু, মসলা, হাতে তৈরি কার্পেট, অলঙ্কার ও অন্যান্য হস্তশিল্প দ্রব্য, টেরিটাওয়েল ও স্পেশালাইজড টেক্সটাইল, পরচুলা, গরুর নাড়িভুঁড়ি, চারকোল, টুপি, মাছ ধরার বড়শি, মশারি, শুকনা খাবার, পাপড়, হাঁসের পালকের তৈরি পণ্য, লুঙ্গি, জুতা, কাজুবাদাম, চশমার ফ্রেম, কৃত্রিম ফুল, গলফ শাফট, খেলনা, আগর, ছাতার লাঠি, ব্লেড, রেশম, রাবার, ফেলে দেয়া কাপড় থেকে তৈরি পণ্য, ভবন নির্মাণসামগ্রী, সিরামিক পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, গ্যাস, পেট্রোলিয়াম উপজাত, দিয়াশলাই, গুড়, পার্টেক্স, রেয়ন, ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্যাদি, বইপুস্তক, সাময়িকী, ফিচার ফিল্ম, তোয়ালে, শরীর থেকে রক্ত নেয়ার পাইপ (ব্লাড টিউবিং সেট), অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই), সিআর কয়েল, তামার তার ইত্যাদি।

বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল জন্মে । প্রচলিত ফলের মধ্যে কলা, আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, লেবু, বাতাবিলেবু, লিচু, কুল ও নারিকেল উল্লেখযোগ্য। অন্য দিকে কামরাঙ্গা, লটকন, সাতকরা, তৈকর, আতা, শরিফা, জলপাই, বেল, আমড়া, কদবেল, আমলকী, জাম, ডালিম, সফেদা, জামরুল, গোলাপজাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য অপ্রচলিত ফল। স্থানীয় ও বিদেশী ফল এ দেশের উষ্ণ-অব উষ্ণ জলবায়ুতে জন্মে বিধায় স্বাদে, গন্ধে, আকারে ও ফলনে নানা বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়।

গ্রামীণ সেবা খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিউটি পার্লার, বিকাশ, নগদ, এজেন্ট ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও ফার্মেসি সেবা, ফটো স্টুডিও, সার্ভিসিং-ভিত্তিক কার্যক্রম, পাম্প মেরামত ও সার্ভিসিং-সহ জ্বালানি ইঞ্জিন পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত, মোবাইল, রেফ্রিজারেটর, যানবাহন মেরামত, খুচরা বা পাইকারের দোকানে সরবরাহকৃত পরিষেবা, মুদ্রণ, হোটেল ও রেস্তোরাঁ, চা-স্টল, সার, কীটনাশক এবং বীজ বিক্রির দোকান, মাছ-গোশতের ব্যবসায়, টেক্সটাইল-ভিত্তিক কাজগুলোর মধ্যে বুনন, কাটা এবং টেইলারিং ও মেরামত অন্তর্ভুক্ত।

সাম্প্রতিক হিসাবে বাংলাদেশের মোট রফতানিতে অপ্রচলিত পণ্যের অবদান ৮০ শতাংশেরও বেশি। একদম অপরিচিত পণ্যও রয়েছে এ তালিকায়। যেমন- এসব পণ্যের কারখানা সাধারণত বড় হয়, বিনিয়োগও একটু বেশি। তালিকার অন্য কারখানাগুলো ছোট ছোট। আবার এমন পণ্যও রয়েছে, যার একটিমাত্র কারখানা রয়েছে দেশে। প্রধান রফতানিপণ্য পোশাকের পাশাপাশি দেশের আনাচেকানাচে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে নানামুখী রফতানি পণ্যের ছোট ছোট কারখানা। কেউ দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে, আবার কেউ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন।

কোনো কোনো পণ্যের রফতানির পরিমাণ খুব বেশি নয়, কোনো পণ্যের রফতানির পরিমাণ বেশ ভালো। কিছু পণ্য আছে বিশ্ববাজার খুব বড় নয়, আবার কিছু আছে অনেক বড় বাজার, তুলনায় বাংলাদেশ রফতানি করছে সামান্যই। কমবেশি যা-ই হোক, দিন দিন রফতানির ঝুড়িটি বড় হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান যেমন বাড়ছে, অর্জিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাও। প্রতিবেশী দেশের পাশাপাশি ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার দেশগুলোতেও যাচ্ছে বাংলাদেশের অপ্রচলিত পণ্য। অপ্রচলিত পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান। এ বাজার আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য নিয়ে বিশ্ব-অর্থনীতির দুই মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সাম্প্রতিককালে যে লড়াই চলছে, তা থেকে ইতোমধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, চীন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওই দেশটির পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়। এই পেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা চীনে না গিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকেছেন।

লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews