২০২৪ সালে একটি জনাকীর্ণ ক্রিসমাস মার্কেটের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষকে আহত করার দায়ে এক সৌদি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে শুক্রবার (২৬ জুন) রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে জার্মানের একটি আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা অভিযুক্ত ৫১ বছর বয়সী তালেব জাওয়াদ আল-আব্দুলমোহসেনের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছেন। পাশাপাশি অপরাধের ‘বিশেষ গুরুত্ব’ বিবেচনায় নিয়ে এমন রায় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তিনি জীবনের বাকি সময় কারাগারেই কাটান।
তবে সরকারি আইনজীবীরা তার ওই দাবিটিকে অযৌক্তিক বলে বর্ণনা করেছেন।
দীর্ঘ কয়েক মাসের বিচার চলাকালে আবদুলমোহসেন ইসলামবিরোধী আন্দোলনের সমর্থক এবং ডানপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত। তিনি ম্যাগডেবুর্গ শহরের মার্কেটের মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে চাপা দেননি বলে দাবি করেন।
একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অভিযুক্তকে নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করেছেন। তিনি পুরোপুরি মানসিকভাবে দায়ী এবং সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলেও মত দেন।
বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ম্যাগডেবুর্গ শহরের বাইরে বিশাল একটি অস্থায়ী আদালতকক্ষ নির্মাণ করা হয়। সেখানে শত শত ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা অংশ নেন।
শুনানির সময় মামলার ২০০ জন বাদীপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী ১০০ জনেরও বেশি সাক্ষী এবং প্রায় ৪০ জন আইনজীবী অংশ নেন।
ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনজীবী টমাস ক্লাউস বলেন, অভিযুক্তকে সম্ভবত ‘তার জীবনের বাকি সময় কারাগারেই কাটাতে হবে।’
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর অভিযুক্ত ভাড়া করা শক্তিশালী বিএমডব্লিউ এক্স৩ গাড়ি নিয়ে শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় স্কোয়ারে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন।
হামলার সময় তিনি ঘণ্টায় প্রায় ৪৮ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালান বলেও জানা গেছে। এই হামলায় নয় বছর বয়সী এক শিশু এবং ৪৫ থেকে ৭৫ বছর বয়সী পাঁচ নারী নিহত হন। মোট ছয়টি হত্যার অভিযোগ এবং ৩৩৮টি হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউটর ম্যাথিয়াস বোয়েটচার বলেন, এই হামলা ‘মানবিক বোধের বাইরে’ এবং ভুক্তভোগীদের পরিবার ‘অকল্পনীয় যন্ত্রণা’ ভোগ করছে।
‘কোনো অনুশোচনা নেই’
এই গাড়ি হামলা জার্মানিতে অভিবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
এক বছর পর ম্যাগডেবুর্গের সেই ক্রিসমাস মার্কেট কংক্রিটের ব্যারিকেড ও সশস্ত্র পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় আবার চালু হয়। কিছু দর্শনার্থী জানান, এখন জায়গাটিকে একটি দুর্গের মতো মনে হয়।
বিচারের সময় তার বক্তব্য অনেক সময় অসংলগ্ন ছিল এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ভরপুর ছিল বলে জানা যায়। এক পর্যায়ে তিনি অনশন ধর্মঘটও করেন, যার ফলে কিছু সময় তাকে ছাড়াই বিচার কার্যক্রম চালানো হয়।
২০০৬ সালে জার্মানিতে আসা ওই চিকিৎসক অভিযোগ করেছিলেন যে, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসা সৌদি নাগরিকদের যথাযথভাবে সুরক্ষা দিতে জার্মান কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে।
এর আগে কর্তৃপক্ষের সাথে তার একাধিকবার বিরোধ হয় এবং অপরাধমূলক সহিংসতার হুমকি দেয়ার অভিযোগে তাকে জরিমানাও করা হয়েছিল।
প্রসিকিউটরদের মতে, একটি শরণার্থী সংস্থার সাথে আইনি বিরোধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তিনি এই হামলা চালান। পাশাপাশি আলোচনায় থাকার ইচ্ছাও পোষণ করতেন।
প্রসিকিউটর বলেন, বিচার চলাকালে তিনি কোনো অনুশোচনা, দুঃখ বা আত্মসমালোচনার লক্ষণ দেখাননি।
সূত্র: বাসস