জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের সাথে সমন্বয় করে বাস ভাড়া বাড়লো প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা। দূরপাল্লার ভাড়া করা হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা। আর ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রতি কিলোমিটার বাস ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা। নতুন নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হয়ে গেছে। পেট্রোল পাম্প ও স্টেশনগুলোতে অবস্থা আগের মতোই। শুধু মজুত নয়, পাম্পগুলোতে সরবরাহ না বাড়ালে জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না বলে জানিয়েছে পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি। একদিকে সরকারের ভাষ্যমতে, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তেল মজুতের পাশাপাশি বেড়েছে দামও। এমন অবস্থায় জ্বালানি সংকট কেটে যাবার প্রত্যাশা ছিলো। তবে রাজধানী ঢাকায় বাস্তবতা ভিন্ন। প্রয়োজনীয় জ্বালানি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা যায় গ্রাহকদের।
সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জীবন চালানোই কঠিন হয়ে যাবে বলে জানান রাইড শেয়ারিং চালকরা। জ্বালানি স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি ভয়াবহ। রাজধানীর বাইরে ৮-১০ ঘণ্টা লোডেশডিং চলছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, জ্বালানির কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বাস্তবে মানুষ প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকে তেল পাচ্ছে না। যারা পাচ্ছে, তারা চাহিদার তুলনায় কম পাচ্ছে। জ্বালানির দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাড়ানো হলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারের একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর তেল মজুতের কারণে একদিকে পাম্পগুলোতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে ভারতে তেল পাচার হচ্ছে। পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি অবশ্য অন্য একটি কারণ উল্লেখ করেছেন। সরকার যে হারে তেল দিচ্ছে, তা আগের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। একদিনের তেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্প নিয়মিত তেল পাচ্ছে না। সে কারণে আমাদের ওপর চাপ পড়ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল যে অবৈধভাবে মজুত করছে, তা মজুতবিরোধী অভিযানে প্রমাণিত হয়েছে। ঘরে, এমনকি গোয়াল ঘরে পর্যন্ত তেল পাওয়া গেছে। তেল ভারতে পাচারের হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। বিজিবিকে সীমান্তে প্রহরা ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তেল পাচার হতে না পারে। কিন্তু যতই প্রহরা ও নজরদারি বাড়ানো হোক, সীমান্তপথে তেল পাচার সম্পূর্ণ নিরোধ করা সম্ভব নয়, বাস্তব কারণেই। ভারতে সব ধরনের তেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। যতদিন এখানে তেলের দাম ভারতের সমান বা বেশি না হয় ততদিন পাচার বন্ধ হবে না। এদিকে, বোরোর এই পিক সিজনে সেচের জন্য জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। সেচযন্ত্র তেলে ও বিদ্যুতে চলে। বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকছে। এতে তেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ছে।
একই সময়ে দেশের অর্থনীতি পড়ে গেছে চরম চাপে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলছে। মানুষের আয় চাপে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগেও খরা। জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপ সেখানে সামষ্টিক অর্থনীতিকে অস্থির করে দিয়েছে। গোটা বাস্তবতা এমন দিকে এগোচ্ছে, যেখানে শুধু নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দিয়ে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে গেছে। জ্বালানির দাম শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে মানুষের সংসার, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, বাজারদর এবং রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে কূটনীতিও রয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাত, শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনীতির উত্তেজক পরিস্থিতি। জুলাই সনদ প্রশ্নে বিএনপিকে কাহিল করে ফেলা হচ্ছে। জুলাই চেতনাবিরোধী তো বলা হচ্ছেই। সেখানে কোট করা হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বের একটি পুরোনো কথা: ‘এটি কেবল ছাত্রদের আন্দোলন এবং এর সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ কদিন ধরে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো সরকার প্রত্যাখ্যান করছে, এ অভিযোগ প্রায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। স্থগিত-রহিত ধরনের শব্দ ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ‘ভালো আইন’ করবে, এ কথার বাজার ধরানো কঠিন। নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং এটিকে রাজনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেছিল।
নির্বাচনের আগে গণভোটের মতো ইস্যু জনসমর্থন অর্জনের একটি কার্যকর হাতিয়ার ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সরকার হয়তো এড়াতে চেয়েছে। সরকার যেসব অধ্যাদেশকে প্রয়োজনীয় মনে করেছে, সেগুলোর অধীনে গৃহীত কার্যক্রম সুরক্ষা দিয়েছে; আর যেগুলো পছন্দ হয়নি, সেগুলো বাতিল করেছে। একদিকে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই বারোয়ারি জ্বালা-যন্ত্রণায় সরকার। বিরোধী দল এবং ক্ষমতার শীর্ষপদে আসীন একটি মহল কারণে-অকারণে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে সরকারকে। তা কি কোনো ম্যাটিকুলাস? ম্যাটিকুলাস বা ক্যালকুলাস যা-ই হোক হাল নমুনা বলছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার যত দেরি করবে, ততই জামায়াত-এনসিপির মার্কেটিং জমবে। এত দ্রুত সরকারের জন্য মাঠ এমন হয়ে যাবে বলে ধারণা করা যায়নি। ধারনার বাইরের এ সুযোগটাই নিচ্ছে বিরোধী জোট। সরকারের এ অবস্থান কি বাস্তবতা ও শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনে? নাকি রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী কৌশলগত?
রাজস্বসহ সকল আয়ের কমতির ধারার মধ্যেই যথাসময়ে, যথানিয়মে, যথারীতি বাজেট প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে সরকারকে। বিদায় নেয়া ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী ও শেখ হাসিনা, দুটি সরকারের দায়ই টানতে হচ্ছে এ সরকারকে। অনিবার্য দায়দেনাসহ বাস্তবতাটা বড় নিষ্ঠুর। ঝুঁকিও অনেক। একদিকে, বৈশ্বিক তাড়না, আরেকদিকে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি। তারওপর রয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননসহ নানা কর্মসূচি। এগুলোর বাস্তবায়নে টাকা লাগবে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এসব কাজে পূরণে সরকারের ব্যয় কমিয়ে আনার কোনো সুযোগ নেই। রাতারাতি রাজস্ব আয় বাড়ানোর অবস্থাও নেই।
এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। অথচ, এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। অর্থের এ অকুলানের মাঝে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বাড়তি দাম, গেল সরকারের বিদায়ের আগে ঘোষিত সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতনও অগ্রাহ্যের সুযোগ নেই। তাদের নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাতাগোষ্ঠীর প্রকল্প অনুদান এবং বৈদেশিক সাহায্যের কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা নিয়েও ঘুরছে নানা শঙ্কা। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাজেট বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতি, রপ্তানি-আমদানির ভারসাম্য, বিনিয়োগের পরিবেশ সরকারকে বাইরের কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। সরকার এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেবে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির অপচয়, অতিরিক্ত ব্যবহার, অবৈধ মজুত ও পাচার রোধ করার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলে এখন জ্বালানির এ সংকট ও হাহাকার দেখা যেত না। সরকার অবশ্য বর্ধিত দামে হলেও জ্বালানিসংগ্রহের চেষ্টা করছে। তা এখন আর কতোটা কাজে দেবে সেই নিশ্চয়তা নেই।
তেল নিয়ে তেলাসমাতিতে লিপ্তরা দলীয় নেতাকর্মী হোক, পেট্রল পাম্পের মালিক হোক, অসৎ ব্যসসায়ী ও মজুতদার হোক কিংবা পাচারকারী হোক, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে শূন্য সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে হবে। তবে এ রকম অবস্থায় কিছুটা হলেও আশা জাগিয়েছে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার ও বিরোধীদলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে এ কমিটি সংকট নিরসনে কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সংসদের নবযাত্রা উল্লেখ করে কমিটিতে নিজেদের পাঁচ সদস্যদের নাম দিয়েছে বিরোধীদল। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জ্বালানির সংকট বৈশ্বিক সমস্যা। তবে, জনদুর্ভোগ কমাতে বুধবার সংসদে বিরোধী দল যে নোটিশ দিয়েছে তা বেশ ইতিবাচক। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর নেতৃত্বে সমন্বিত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদকে সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার আশাবাদ জানান। এ প্রত্যাশায় জামায়াত-এনসিপির সমন্বয়ে প্রস্তাব করেন ৫ সদস্যের নাম। ক’দিন ধরে নানা তিক্ত কথায় পরিবেশ ঘোলাটে করার পর মন্দের ভালো হিসেবে দেখা যায় দু’দলের এ অবস্থাটি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]