ইসলামের মারেফতি জগতে ‘দোয়া ইউনুস’ একটি অলৌকিক প্রার্থনার নাম কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি এক বুকফাটা আর্তনাদের নাম, এক নিঃসহায় মানুষের আত্মসমর্পণের নাম। মাছের পেটের অন্ধকারে নবী ইউনুস (আ.) উচ্চারণ করেছিলেন-‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমিন’, অর্থাৎ ‘তুমি ছাড়া উপাস্য নেই, নিশ্চয়ই আমি নিজেই অন্যায়কারীদের একজন।’ এই আত্মসমীক্ষার সাহসই এ প্রার্থনার মারেফত, আর সেই সততার ফজিলত হলো অন্ধকার থেকে মুক্তির আশা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মাটিতে এলেন আরেক ‘ইউনুস’-নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। জাতি ভেবেছিল, এবার সত্যিই দোয়ার ফজিলতের মতো মুক্তি আসবে। কিন্তু যা এলো তা ছিল ভিন্ন এক ফজিলত-তাঁর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে গড়ে ওঠা একটি মহলের বিশেষ বরকতের অভিযোগ, যা আজ জাতির সামনে হতাশার নিঃশব্দ সাক্ষী। অধ্যাপক ইউনূসের আগমনের অর্থ বুঝতে হলে বুঝতে হবে কোন রক্তস্নাত মাটিতে তিনি পা রেখেছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। মিরপুরের তেরো বছরের কিশোর রিয়াদ নিজের ঘরের ছাদ থেকে শুধু দেখতে চেয়েছিল চারপাশের শহরে কী ঘটছে-সেই মুহূর্তেই একটি ছররা গুলি তার প্রাণ কেড়ে নেয়। জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী সেই সংঘাতে বহু মানুষ প্রাণ হারায়, আর শিশু রিয়াদের মৃত্যু সেই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য পরিবারের নিঃশব্দ কান্নার একটি মুখ। এই রক্তের বন্যা পেরিয়ে ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের এবং সেই শূন্যতায় আসেন অধ্যাপক ইউনূস-জাতির প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। কিন্তু যা পেল এই জাতি, তার দিকে তাকালে আজ চোখে জল আসে।
সমালোচকদের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। রাষ্ট্রীয় নিয়োগে পরিচয়তন্ত্রের আধিপত্য, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিরোধী কর্মীদের হেনস্তা ও সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর ঘটনা-এসব এই সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ, যদিও সমর্থকরা এই মূল্যায়নকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নাকচ করেন। সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিযোগ-কয়েকজন তরুণ, মেধাবী সাংবাদিককে কৌশলে বিদেশে ‘নির্বাসনে পাঠানো’, যাতে তাঁরা সরকারের অনিয়ম কাছ থেকে দেখতে না পারেন। শুরুতে অধ্যাপক ইউনূস নিজেই সমালোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু পরে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের সময় তাঁর নীরবতা একটি করুণ নৈতিক প্রশ্ন জাগায়। আরও অভিযোগ-সরকারের সিদ্ধান্ত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বাইরে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন কেবিনেট’-এর ভিতরে নির্ধারিত হতো, যার সদস্যদের অনেকেই দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন বা বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন এবং মেয়াদ শেষে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া এই কর্মকর্তাদের অনেকের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। কিছু সুযোগসন্ধানী টক শো-আলোচক সরকারের ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন বলেও অভিযোগ এবং এই বিষয় সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাই জনগণের অবিশ্বাসের একটি বড় কারণ।
মারফতি দর্শনে প্রচলিত-সংকটের মুহূর্তে কারও আবির্ভাবকে মানুষ ‘কুদরতি ইশারা’ বলে দেখতে চায়। ২০২৪ সালের আগস্টে অধ্যাপক ইউনূসের আবির্ভাবকেও বহু মানুষ এমনই এক প্রদীপ মনে করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি ঐশী ইশারা, নাকি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিন্যাসের কুশলী মুহূর্ত? একটি অংশের পর্যবেক্ষকদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, প্রচলিত রাজনীতির বাইরের এমন একজন নেতার সন্ধানে দীর্ঘদিন একটি গোষ্ঠী ছিল এবং ড. ইউনূস সেই শর্ত পূরণ করতেন। কুদরতি মহিমার ফলাফল হওয়া উচিত প্রশান্তি ও ন্যায়বিচার-বাস্তবতা যদি বিপরীত হয়, প্রশ্ন জাগে আবির্ভাবের ভাষ্যটি নিখাদ ছিল কি না, এর ফয়সালা পাঠকের বিচারের ওপর। কিছু বিশ্লেষকের আরও পীড়াদায়ক তত্ত্ব-অধ্যাপক ইউনূস ও তাঁর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর মওকুফ, জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ও আইনি সুবিধা দিয়ে তাঁর নৈতিক অবস্থানকে এক অদৃশ্য বাঁধনে আটকে ফেলা হয়েছিল-এক ‘নৈতিক ব্ল্যাকমেল’, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে আসে। পরে সেই ব্যক্তিরাই অনিয়ম করে গেছেন বলে অভিযোগ, আর তখন তিনি বাধা দেওয়ার নৈতিক জায়গায় ছিলেন না। প্রথমে সহযোগিতা, পরে আনুগত্যের প্রত্যাশা-তাহলে কি তিনি সুপরিকল্পিত এক ফাঁদের শিকার? পাঠক নিজেই বিচার করুন।
মারফতি ঘরানায় বলা হয়, ‘অবস্থা বুঝে মুরিদ বদলায়, পীরের তসবি একই থাকে।’ অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে অনিয়মের প্রতিবাদে পদত্যাগ না করা কিছু ব্যক্তি এখন মিডিয়ায় এসে সেই সরকারের ত্রুটির কথা বলছেন, যেন তাঁরা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মাত্র। প্রশ্ন জাগে, তখন প্রতিবাদ না করলে আজকের সমালোচনা কি আত্মসমীক্ষা, নাকি রাজনৈতিক বেঁচে থাকার কৌশল? অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মাসগুলোয় স্বাক্ষরিত একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-বাণিজ্য সমঝোতা, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ। অর্থনীতিবিদ অনু মুহাম্মদ এসব চুক্তিকে ‘অস্বচ্ছ’ বলেছেন এবং টিআইবি সতর্ক করেছে যে নির্বাচনের আগে এমন ত্বরিত সিদ্ধান্ত জবাবদিহিকে দুর্বল করে। এ ছাড়া, মব সন্ত্রাস চলাকালে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ গভীর হতাশা তৈরি করেছে-এই নিষ্ক্রিয়তা ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, নাকি নৈতিক কর্তৃত্বের ব্যর্থতা, এই প্রশ্নের মুখে পুরো জাতি। নোবেলজয়ী, বিশ্বনেতাদের সম্মানিত এই ব্যক্তি কেন নিজেকে এসব বিতর্ক থেকে মুক্ত রাখতে পারলেন না? তিনি যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে মনোযোগ দিতেন এবং সুবিধাভোগী মহলকে দৃঢ় হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাঁর নাম ইতিহাসে গৌরবের সঙ্গে লেখা থাকত। পররাষ্ট্রনীতিতে যে পুনর্বিন্যাস ঘটেছে, তা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য জটিল উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করে, এটি কেবল ইউনূসের সমস্যা নয়-বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এতই দুর্বল যে সর্বোত্তম নেতাও কাঠামোগত সমস্যার শিকার হন। প্রশ্ন থেকে যায়, ব্যক্তির সুনাম কি কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা পূরণ করতে পারে?
উপসংহার : ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া ও জাতির দায়
পাড়াগাঁয়ের পুরোনো গল্প-এক রাতে এক বাড়িতে আগুন লাগল। চারপাশে হইচই, সবাই ‘পানি আনো’ বলে ছুটছে। এমন বিভ্রান্তির মাঝে এক সুচতুর ভদ্রলোক প্রথমে পানি আনলেন না, তিনি দেখলেন উঠানে কারও আলুর বস্তা পড়ে আছে কি না, কয়েকটা আলু পেয়ে তিনি জ্বলন্ত চালার কিনারে গুঁজে দিয়ে নিশ্চিন্তে অপেক্ষা করলেন, যখন সবাই ‘ঘর বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল। আগুন নেভানোর পর, ঘরের মালিক পোড়া সংসারের সামনে চোখে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই তিনি ছাই থেকে আলু তুলে তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন-‘বাহ, পারফেক্ট রোস্ট!’ পরদিন সকালে তিনিই সবার আগে গিয়ে সমবেদনা জানালেন, যেন রাতভর তিনিও সমান কষ্টে ছিলেন।
এই গল্পের প্রতিচ্ছবি যেন হুবহু ফুটে উঠেছে আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায়। জুলাই ২০২৪-পূর্ববর্তী সময়ে যাঁদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে ছিল, সমাজে যাঁদের নামও কেউ জানত না, অভিযোগ অনুযায়ী সেই শ্রেণির বহু মানুষই অধ্যাপক ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’-এর অলৌকিক ছোঁয়ায় আজ অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। যাঁরা একদিন পায়ে হাঁটতেন, তাঁদের কেউ কেউ আজ কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন; কেউ ঢুকে পড়েছেন নীতিনির্ধারণী টেবিলে, আর অস্তিত্বসংকটে থাকা কোনো কোনো দল আজ জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। ঘর পুড়েছিল সাধারণ মানুষের রক্তে, কান্নায়, প্রাণের বিনিময়ে আর সেই আগুনের আঁচেই কারও কারও ভাগ্যের আলু সেঁকা হয়ে গেছে। জ্বলন্ত, নিঃস্ব বাংলাদেশে প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেও অনেকের কাছে এই একই কৌশল প্রতীয়মান হয়েছে কেউ আগুনের আঁচে নিজের স্বার্থের আলু সেঁকে নিয়েছেন, আর পরদিন সবচেয়ে আগে সমবেদনা জানিয়েছেন। দেশবাসীর প্রত্যাশা, বর্তমান তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার প্রতিটি অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখবে, কারণ জবাবদিহি না থাকলে ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়, শুধু অভিনেতার নাম বদলায়, কান্নার সুর একই থেকে যায়। ‘ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমিন-নিশ্চয়ই আমি নিজেই অন্যায়কারীদের একজন।’ দোয়া ইউনুসের এই আত্মস্বীকৃতির সাহস কি অধ্যাপক ইউনূস এবং তাঁর মারফতে ফজিলতপ্রাপ্তরা কখনো নিজেদের জন্য উচ্চারণ করবেন? রাষ্ট্র ও রাজনীতি কি এমন কাঠামো গড়তে পারবে, যেখানে আর কাউকে বিতর্কের কাদায় হারাতে হবে না? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো বাতাসে ভাসছে এবং জাতিকে এর জবাব খুঁজতে হবে কাজ করে, দোয়া পড়ে নয়।
♦ লেখক : গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী, প্যারিস, ফ্রান্স