ফরিদপুরের বিএনপির রাজনীতিতে জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া ও ইয়াসমিন আরা হক পরিচিত নাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এই দম্পতি। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থাকলেও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কখনো যাননি বলে দাবি তাদের অনুসারীদের। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পরও কাঙ্খিত মূল্যায়ন না পাওয়ার আলোচনা এখন বিএনপির স্থানীয় অঙ্গনেই বেশি শোনা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি দীর্ঘদিন ফরিদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা এই নেতা ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। পরে ১৯৯৯, ২০১১ ও ২০১৭ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দলীয় নেতাদের মতে, শাহজাদা মিয়া বর্তমানে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে বিএনপির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন। কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। একসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-শিল্পবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাঁকে সৎ, পরিচ্ছন্ন ও ত্যাগী রাজনীতিক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়াননি; বরং নিজের ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ দলীয় কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের পেছনে ব্যয় করেছেন।
বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে শাহজাদা মিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৯৭ সালে তাকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি।
স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ফরিদপুরে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন শাহজাদা মিয়া। স্থানীয় নেতাদের দাবি, এরশাদ সরকারের সময় তাঁকে দল পরিবর্তনের জন্য নানা ধরনের চাপ দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ওই সময় তাঁর বাসভবনে হামলার ঘটনাও ঘটে।
দলীয় সূত্র জানায়, আন্দোলন-সংগ্রামের পথে একাধিকবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন শাহজাদা মিয়া। ১৯৯৯ সালে ঢাকার জনকণ্ঠ ভবনের সামনে বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তার পায়ে আঘাত লাগে। পরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও কেন্দ্রীয় নেতারা তাকে দেখতে যান বলে দলীয় নেতারা জানান। অন্যদিকে, ইয়াসমিন আরা হক দীর্ঘদিন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সভানেত্রী, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দলীয় নেতারা জানান।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিএনপি হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ওই বছরের ৬ জুন ঢাকার মহাখালী এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হলে পুলিশ ইয়াসমিন আরা হককে আটক করে। এ সময় তাঁকে লাঠিপেটা করা হয়। ঘটনাটির ছবি সে সময় বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া ২০১৭ সালে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালনের সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের হামলায় গুরুতর আহত হন ইয়াসমিন আরা হক। দলীয় সূত্রের দাবি, ওই হামলায় তাঁর পা ও মেরুদ-ে গুরুতর আঘাত লাগে, যার শারীরিক ভোগান্তি তিনি এখনো বহন করছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, ফরিদপুর ও ঢাকায় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব কর্মসূচিতেই শাহজাদা মিয়াকে সামনের সারিতে দেখা যেত। বিশেষ করে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচির দিনগুলোতে ভোরবেলা নেতাকর্মীদের নিয়ে সড়কে অবস্থান, মিছিল ও অবরোধ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে তাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিলেন। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে শাহজাদা মিয়া পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ১৯৮৩ সালে ফরিদপুর সফরে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথমে শাহজাদা মিয়ার বাসভবনে যান। পরবর্তী সময়ে ফরিদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন রাজনৈতিক সফর ও কর্মসূচির সময়ও তিনি একাধিকবার তাঁদের বাড়িতে গেছেন। স্থানীয় নেতাদের মতে, ফরিদপুরে দলীয় কর্মসূচি শেষে খালেদা জিয়া প্রায়ই এই দম্পতির সঙ্গে সময় কাটাতেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০০৭ সালের এক-এগারোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই দম্পতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। সে সময় তাঁদের ঢাকার বাসভবনে বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা অবস্থান করে দলীয় কর্মকা- পরিচালনা করেছেন বলেও দাবি করেন স্থানীয় নেতারা।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ২০১৫ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় শাহজাদা মিয়া দীর্ঘ সময় ফরিদপুরে অবস্থান করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ওই সময় তাঁর বাসভবনে হামলা ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তারের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ তার মালিকানাধীন রপ্তানিমুখী পাটের সুতা উৎপাদনকারী একটি শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে দলীয় নেতারা দাবি করেন।
একই সময়ে ঢাকায় তার বাসভবনেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক মামলা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায়ও তাঁদের নাম আসে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
ফরিদপুর-৪ আসনের রাজনীতিতেও শাহজাদা মিয়া দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। বিএনপির নেতারা বলেন, অতীতে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও তিনি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়েও ওই আসনে অন্য একজনকে দলীয় প্রার্থী করা হলে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী না হয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
মনোনীত প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচারণার বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, ইয়াসমিন আরা হককে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারেএমন আলোচনা দলীয় অঙ্গনে একাধিকবার থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ত্যাগের পরও এই দম্পতি প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাননি বলে মনে করেন তাঁদের অনুসারীরা। রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক কর্মকা-েও সম্পৃক্ত রয়েছেন শাহজাদা মিয়া।
তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ফরিদপুরের বিভিন্ন সামাজিক, ক্রীড়া ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। করোনা মহামারির সময় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, চিকিৎসাসহায়তা, অক্সিজেন সরবরাহ ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাসহ নানা মানবিক কর্মকা-ে অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। ফরিদপুরের বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মতে, আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, মামলা-হামলা, কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য—সব মিলিয়ে শাহজাদা মিয়া ও ইয়াসমিন আরা হক দম্পতি বিএনপির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথচলার পর তাঁদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও দলীয় মূল্যায়ন নিয়ে এখনো স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।