প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন বেতন স্কেল গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল প্রণয়নের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই জাকির খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্যের এক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নিকট তাদের সুপারিশমালা পেশ করেন। পেশকৃত সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে সুপারিশের ভিত্তিতে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদের সভায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অনুমোদিত পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়ন করা হবে না। জুলাই ২০২৬ থেকে জুলাই ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে বর্ধিত মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হবে। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভাতা কার্যকর করা হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এ উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে। বর্তমান উচ্চ বাজারমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন স্কেলে বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে অস্টম জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২০টি গ্রেডে ভাগ করে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। নতুন বেতন স্কেলে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল বেতন বেড়েছে ১০০ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। মূল বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উচ্চ পদের তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হার বেশি। এ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো খুবই জরুরি ছিল। সরকার সে আবশ্যকতাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছেন। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধাও বেড়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় সর্বনিম্ন ক্যাটাগরির একজন কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বেড়েছে ১৫৪ গুণ। অস্টম পে-স্কেলে একজন কর্মচারীর সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন বেতন স্কেলে তাদের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ তাদের মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ দশমিক ৪১ শতাংশ। অষ্টম পে-স্কেলে প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন ছিল ৭৮ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে তা ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ অষ্টম পে-স্কেলের তুলনায় প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার মূল বেতন বেড়েছ ১০০ শতাংশ। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা হচ্ছে ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২জন। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের মধ্যে শূন্যপদের সংখ্যা হচ্ছে ৫ লাখ ১২ হাজার ৯২২টি। অবসরপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে পেনশনভোগী রয়েছেন ৯ লাখ ২৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। কর্মরত এবং অবসরভোগী মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্ধিত বেতন-ভাতার সুবিধা পাবেন।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক নানা সমস্যার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল তখন ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। একই বছর জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক এক শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এটা ছিল দেশটির বিগত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিশ্বের মোট দানাদার খাদ্যের ৩০ শতাংশ যোগান দেয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের খাদ্যভর্তি জাহাজগুলো বন্দরে আটকে পড়ে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান, বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রটণ্ড খাদ্যাভাব দেখা দেয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) বারবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি আরো কার্যকর নানা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বারবার বাড়াতে থাকে। এর মাধ্যমে অন্তত ৬০টি দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার পলিসে রেট বাড়াতে থাকে। এক পর্যায়ে পলিসি রেট ৫শতাংশ হতে বাড়াতে বাড়াতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে পলিসি রেট কিছুটা কমানো হয়েছে। কিন্তু নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমস্যাগ্রস্ত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা যে সাফল্য প্রদর্শন করেছে তা অনেকের জন্যই অনুকরণীয় হতে পারে। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এ বছর জুন মাসে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সাফল্য প্রদর্শন করতে পারছে না। ফলে মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যারা দরিদ্র এবং নিম্নআয়ের মানুষ তারা বড়ই অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করছে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছিল, করোনাকালীন সময়ে অন্তত ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কর্মচ্যুৎ হয়ে অথবা উচ্চ মূল্যস্ফীতি অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে শহর থেকে গ্রামে চলে গেছেন। গ্রামে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে কত শতাংশ আবার শহরে ফিরে আসতে পেরেছেন তা জানা যায় নি। উচ্চ আয়ের মানুষগুলো মূল্যস্ফীতির কারণে খুব একটা সমস্যায না পড়লেও যার নিম্ন এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ তারা খুবই জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যয় কাঁটচাট করে তারা সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামমুখি অভিবাসন বেড়েছে।

রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন বাড়ানো হয়েছে এটা তাদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। এ দুর্মূল্যের বাজার তারা সংসারের ব্যয়ভাব নির্বাহের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ স্বস্তিদায়ক অবস্থা কতজন মানুষের জন্য? কর্মরত এবং পেনশনভোগী অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে মোট ২৪ লাখের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন বর্ধনের এই সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। কিন্তু যারা ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন তাদের কী হবে? তারাও তো বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য কর্তৃপক্ষের উপর চাপ দিতে পারেন। বর্তমানে দেশে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কল-কারখানাগুলো ঠিক মতো তাদের উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই অবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি মজুরি বৃদ্ধির জন্য কর্তৃপক্ষের উপর চাপ দেয় তাহলে তাদের চাকরিচ্যুৎ করা হতে পারে।

নতুন পে-স্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে এটা অত্যন্ত যৌক্তিক একটি সিদ্ধান্ত। কারণ বিদ্যমান অবস্থায় ৮ম পে-স্কেলের আওতায় একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যে বেতন-ভাতা পাচ্ছিলেন তা দিয়ে ঠিক মতো সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করা কঠিন ছিল। নবম পে-স্কেলে সব গ্রেডে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পাবার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন যাত্রায় কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসবে। এদের সংখ্যা মাত্র ২৪ লাখের মতো। তাহলে দেশের অবশিষ্ট ১৮ কোটি মানুষের কি হবে? তারা কিভাবে তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করবেন? এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে, নতুন পে-স্কেলের প্রভাবে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য আর এক দফা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কোন অজুহাত পেলেই জিনিষপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। সরকার নতুন পে-স্কেল জারি করে একটি শ্রেণির জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছেন কিন্তু দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কি হবে? আমাদের দেশের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অজুহাতে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সেটা প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। অতীতে আমরা দেখেছি, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সামান্য কোন অজুহাত পেলেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে থাকে।

বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চেয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের উপর তেমন কোন অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারবে না যদি তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যায়। যেমন কোন একটি পণ্যের মূল্য হয়তো ১০০ টাকা। একজন মানুষের আয় ১১০ টাকা। তাহলে প্রয়োজনীয় দ্রব্যটি ক্রয়ের পরও তার হাতে ১০ টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে। পরের বছর বর্ণিত পণ্যটির দাম হয়তো পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেল। তাহলে দ্রব্যটির মোট মূল্য হবে ১১০টাকা। একই সময়ে ব্যক্তিটির আয় যদি ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১৩০ টাকা হয় তাহলে তার কোন অসুবিধা হবে না। কারণ বর্ধিত আয় দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি ক্রয় করার পরও তার হাতে আরো ২০ টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশে একটি প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তা হলো মূল্যস্ফীতি বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মজুর বা আয় বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মোতাবেক, বিগত ৫৪ মাস বা সাড়ে চার বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে মূল্যস্ফীতি যেহারে বৃদ্ধি পেয়েছে মজুরি বৃদ্ধি বা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তার চেয়ে কম হারে বেড়েছে। ফলে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর আওয়তায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পাবে। এ বেতন বৃদ্ধির সুযোগ পাবে সামান্য কিছু পরিবার। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য এটা কোন উপকারে আসবে না। বরং বেতন বৃদ্ধির অজুহাতে যদি বাজার পণ্য মূল্য বৃদ্ধি করা হয় তাহলে তার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ।

বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। কয়েকবছর পরপর নতুন বেতন স্কেল ঘোষণার মাধ্যমে তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে তারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে পারেন না। এর পরিবর্তে প্রতি বছর যে হারে মূল্যস্ফীতি ঘটে তার সঙ্গে মিল রেখে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো যেতে পারে। এটা করা হলে তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ঘটার আশঙ্কাও কম থাকবে।

এ মুহূর্তে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিগত ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা প্রত্যক্ষ করেছিল কিভাবে সরকার সমর্থক এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যমূল্য নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করে। মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে কোন পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রেক্ষাপটে বাজারে ব্যবসায়ি সিন্ডিকেটের তৎপরতা কিছুটা কমেছে সত্যি তাই বলে সিন্ডিকেটের দৌড়াত্ব শেষ হয়ে গেছে এটা ভাবার কোন কারণ নেই। তারা সুযোগ পেলেই আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বা উঠার অপেক্ষায় রয়েছে। একটি সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করার জন্য মূল্যস্ফীতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিঃশব্দ ঘুনে পোকার মতো ভেতর থেকে সরকারের জনপ্রিয়তাকে নষ্ট করে দেয়। কাজেই সরকারের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং জনসন্তুষ্টির জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের নিত্য পণ্যের মাত্র ২৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। কাজেই দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার উৎপাদেন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার যদি কঠিন থেকে কঠিনতর উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে জনগণ তা সমর্থন করবে। কিন্তু কোনভাবেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘায়িত হতে দেয়া যাবে না।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক লেখক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews