রংপুর মহানগরীতে চাঞ্চল্যকার চার খুনের ঘটনায় ঘটনাস্থলে খবর সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের লাঞ্চিত করেছেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও তার বড় ভাই পার্থ দাস।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধায় নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় ঘটনাস্থলে এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, ঘটনাস্থলে খবর সংগহের জন্য যান কয়েকজন সাংবাদিক। সংবাদ সংগ্রহ শেষে ফেরার সময় সেখানে উপস্থিত সিদ্ধার্থ দাসের বড় ভাই পার্থ দাস দৈনিক খবরের কাগজের রংপুর ব্যুরো প্রধান সেলিম সরকারের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে চাবি কেড়ে নেন। তার সাথে যোগ দেন সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাসও।
এ সময় সাংবাদিক সেলিম সরকারের ব্যাগে আলামত আছে বলে চিৎকার করে মব তৈরি করেন তারা। পার্থ দাস মোবাইলফোনে ভিডিও ধারণ করে তা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। পরে সেখানে উপস্থিত হয় ডিবি পুলিশ। তাদের সামনে সাংবাদিক সেলিমের ব্যাগ চেক করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে সেখানেই মৌন মানববন্ধন করেন সাংবাদিকরা।
সাংবাদিক সেলিম সরকার জানান, চার খুনের ঘটনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে ও সংবাদ সংগ্রহ করতে তিনজন সহকর্মীর সাথে তিনি ঘটনাস্থলে যান। পরে পাশের বৈরাগীপাড়া এলাকায় যাওয়ার সময় পার্থ দাস তার মোটরসাইকেল আটকে দেন এবং চাবি কেড়ে নেন।
তিনি বলেন, ‘এ সময় পার্থ দাস চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে জড়ো করেন। পরে উপস্থিত লোকজনের সামনে পার্থ আমাকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেন এবং বলেন, আমি গলিতে ঢুকেছিলাম এবং আমার ব্যাগে কিছু আলামত রয়েছে। এরপর আমার সাথে উগ্র আচরণ করেন তারা।’
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় কয়েকজন সেখানে জড়ো হন। পরে ঘটনাস্থলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল উপস্থিত হয়। ওই সাংবাদিকের ব্যাগে কী রয়েছে, তা পরীক্ষা করতে পার্থ দাস পুনরায় উগ্র আচরণ শুরু করলে ডিবি সদস্যরা ব্যাগটি খুলে দেখান। তবে সেখানে সন্দেহজনক কিছু না পাওয়ায় সাংবাদিককে যেতে দেয়া হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই পার্থ দাস ও তার বাবা বিনয় দাস একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছেন এবং মাঝেমধ্যে উগ্র আচরণ করছেন। তাদের এমন পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলেই তারা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষেপে যাচ্ছেন। তারা চাচ্ছেন না এখানে সংবাদকর্মীরা কাজ করতে আসুক।’
ঘটনাস্থলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) জসিম উদ্দিন জানান, সাংবাদিক সেলিম সরকারকে আটক করে হেনস্থা করা হলে ডিবির কর্মকর্তারা গিয়ে তার ব্যাগ খুলে দেখান। ব্যাগে ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিক সেলিম সরকারকে হেনস্থার খবর ছড়িয়ে পড়লে কর্মরত অন্যান্য সাংবাদিকরা সপরিবারে খুন হওয়া রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির মূল ফটকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মৌন প্রতিবাদ জানান।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরপিইউজে)। সংগঠনটির সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক ও সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহারুল মান্নান তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে এ ধরনের লাঞ্ছিত ও আটক করে রাখা শুধু ব্যক্তির ওপর নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের ওপর চরম আঘাত।
তারা বলেন, ‘কোনো সভ্য সমাজে একজন সাংবাদিককে এভাবে রাস্তায় আটকে ‘মব জাস্টিস’-এর নামে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কোনো নাগরিকের গাড়ির চাবি কেড়ে নেয়া বা ব্যক্তিগত ব্যাগ তল্লাশি করার আইনগত অধিকার কারো নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি, চরম ধৃষ্টতা ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তারা আরো বলেন, যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত, তারা মূলত দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চায়। সত্য প্রকাশে ভীত একটি কুচক্রী মহলই এ ধরনের কাপুরুষোচিত কাজ করতে পারে। সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে বা হেনস্থা করে সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে মৌন প্রতিবাদ মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সাংবাদিকরা বলেন, সাংবদিকদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে সিদ্ধার্থ পরিবার। অবিলম্বে এর সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে সাংবাদিকদের দাবির মুখে পার্থ দাস ও বিনয় দাসকে সেখান থেকে আটক করে ডিবি হেফাজতে নেয় গোয়েন্দা পুলিশ। সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘ঘটনাটি আমরা শুনেছি। সেখানে আমাদের ডিবি পুলিশ ছিল। সাংবাদিক লাঞ্ছিতের ঘটনা নিন্দনীয়। এরই মধ্যে আমরা পার্থ দাস ও বিনয় দাসকে হেফাজতে নিয়েছি। আমরা এ ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এছাড়াও আমরা বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য তাদেরকে ফোন করতেছি, খবর পাঠাচ্ছি। কিন্তু তারা ডিবি কার্যালয়ে আসছে না। তাদেরকে বেশকিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে।‘