একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে মানব সভ্যতার সবচেয়ে ভয়ানক উপকরণ হয়ে উঠছে তথ্য ও প্রযুক্তি। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের এই চূড়ান্ত পর্বে আমরা প্রবেশ করছি এক কৃত্রিম সাম্রাজ্যে যার রূপ বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে; তার ওপর সমগ্র মহাবিশ্ব প্রবেশ করছে এক নতুন দানবীয় ভবিষ্যতে, যার নাম ডিজিটাল দাসত্ব। কীভাবে AI, Big Data, Surveillance state কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতিয়ার হয়ে উঠছে? কীভাবে Metaverse ও Neuralink মানুষের আত্মাকে বন্দি করার উপকরণ? কীভাবে Great Reset ও Climate Agenda একটি কেন্দ্রীভূত বিশ্ব শাসনের আড়ালে? কিভাবে ইসরাইল হচ্ছে এই কৃত্রিম সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনস্থল? AI, ChatGPT, কিংবা Neuralink Palantir Technologies এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয় বলা যেতে পারে মানুষের চিন্তা, পছন্দ, বিবেক ও আচরণ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের এক সূক্ষ্ম যন্ত্র। আজকের Surveillance ব্যবস্থা প্রতিটি মানুষের উপর নজর রাখছে আন্তর্জালিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। এআই এখন যুদ্ধ চালায়, বিচারের রায় দেয়, এমনকি শরীরের কোষ নিয়ন্ত্রণেও কাজ শুরু করছে। China-এর ‘সোশ্যাল ক্রেডিট সিস্টেম’ তার বাস্তব রূপ, যা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। প্রযুক্তির সবচেয়ে বিপদজনক ষড়যন্ত্র হলো, মানুষের আত্মাকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কৃত্তিম জগতে আটকে ফেলা। Metaverse-আমাদের এক ভার্চুয়াল জগতে বন্দি করতে চায়, সেখানে বাস্তবতা নেই, কিন্তু সবকিছুই মস্তিষ্কে অনুভূত হবে। Neuralink (এলেন মাস্কের প্রকল্প) মস্তিষ্কে চিপ বসিয়ে চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এভাবে এক ভবিষ্যতের রোবটিক জনগণ তৈরি হবে, যারা ভাববে তারা স্বাধীন অথচ চিন্তা করার ক্ষমতাটুকু থাকবে না। এটা শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটা হলো- মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা হরণকারী এক ষড়যন্ত্রকারী চুম্বক।

অতীতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বড় অস্ত্র ছিল তলোয়ার। এখন তলোয়ারের ব্যবহার নেই। এখন প্রযুক্তি, মিসাইল, পারমাণবিক অর্থাৎ নিউক্লিয়ারসহ নানা রাসায়নিক অস্ত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হবে। আরো আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তির উৎকর্ষ হিসেবে সামনে আসবে। একটা বাটন চাপ দিয়ে তছনছ করে দেয়া হবে একটা বৃহৎ অঞ্চল। এআই যোদ্ধা থাকবে ময়দানে, পরিচালিত করবে তারা। সে এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের বাস্তবতা। তখন মানুষের সামনে থাকবে এক চোখে দেখার অপশন AR Goggles, VR Helmet, Face Recognition দিয়ে শাসিত নগররাষ্ট্র, আর অও দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে মানব আচরণ। বাস্তবতা হবে তার মস্তিষ্কে প্রোগ্রামড। তখন সত্য-মিথ্যার বিভাজন বিলুপ্ত হবে, এটাই প্রযুক্তির আসল শক্তি। নতুন কিছু মনে হলো? মনেহয় তা বিজ্ঞ পাঠকদের কাছে মনে হবে। কারণ সবকিছু দৃশ্যমান। AI, Big Data, Machine Learning প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের চিন্তা-ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ, ধর্মবিশ্বাস এবং সামাজিক গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যা একদিন কল্পকাহিনীর বিষয় ছিল। আজ তা রিয়েলটাইম প্রোফাইলিং। আজ AI Chatbots, Digital Avatars এবং Quantum Computers যে গতিতে মানুষকে প্রভাবিত করছে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিক চেতনা পর্যন্ত বিধ্বস্ত করছে। Netflix, YouTube, Spotifz-এর অ্যলগরিদম আর যে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আহ্বান প্রচারে যথেষ্ট।

Neuralink, CRISPR এবং Transhumanism নামের প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষকে ঈশ্বরতুল্য করে গড়ে তোলার এক ভয়ঙ্কর প্রয়াস চলছে। ইলেন মাস্ক, হারারির মতো ব্যক্তিরা স্পষ্ট করে বলেন, ‘মানবজাতির ভবিষ্যৎ তাদের হাতে নয়, যাদের বিশ্বাস আছে-বরং আমাদের হাতে, যারা কোড লিখতে পারে’ এমন এক সময় আসবে, যখন বায়োচিপ ছাড়া কেউ চিকিৎসা পাবে না, ডিজিটাল আইডি ছাড়া শিক্ষা পাবে না, আর ইথারনেট ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করা হবে না। Bill & Melinda Gates Foundation, Google DeepMind, Amazon Web Services-সবই মানবজাতির এক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এদের কোন একজন বলেছিলেন, ‘কোন মুদ্রা বা রাষ্ট্রের নেতাকে নিয়ন্ত্রণের দরকার নেই, যদি আমি তার তথ্য-প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।’ তথ্য এখন অস্ত্র এবং সেই অস্ত্রের কারখানাগুলো হলো: WEF (world economic forum), UN 2030 agenda, WHO pandemic Accord, ISO Digital ID Framework প্রভৃতি। পোপ ফ্রান্সিসের আমলে ভ্যাটিকান খোলাখুলি বলেছিলো, ‘এআই ও প্রযুক্তি মানবতার অংশ, একে কল্যাণ বিবেচনা করতে কোন আপত্তি নেই’। ২০২০ সালে, ভ্যাটিক্যান পোপ ফ্রান্সিসের উপস্থিতিতে Rome Call for AI ethics নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে। এই উদ্যোগে মূলত তিনটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট, আইবিএম ও গুগলের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন। কিছু তথ্য বলছে, অ্যামাজনও ছিল। সকলেই পোপের ডাটা এথিক্স সেমিনারে অংশ নেয়। এ যেন ‘সাইবার ঈশ্বরের অভিষেক’। এখানে ভ্যাটিকান নতুন এক দর্শন গঠনের পথে-নতুন উপাস্য: তথ্য, নতুন বাহক: অ্যালগরিদম, নতুন গ্রন্থ: কোড।

আধুনিক যুগে তথ্যই শক্তি। তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করলেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভাব মানুষ ও সমাজের গতিপথ। টেম্পলার ও তাদের উত্তরসূরি গোপন সংঘগুলো এখনো শক্তিশালী। কারণ, তারা বিশাল ডিজিটাল নজরদারি নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, তথ্য ফাঁস থেকে শুরু করে তথ্য রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, বিশ্ব-অর্থনীতি ও রাজনীতির গোপন ডেটা হাতিয়ে নেয় এবং বৃহৎ তত্ত্ব সংগ্রহ ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে বিশ্বনেতাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে। টেম্পলারদের আধিপত্য কেবল নজরদারি বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধ নয়, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই ও মেশিন লার্নিং এর মাধ্যমে মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। সামাজিক মাধ্যম ও ডিজিটাল platform-এর মাধ্যমে জনমত গঠন করে। বিগ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। বিশ্বের ক্ষমতার মঞ্চে যারা এই প্রযুক্ত প্রযুক্তিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই বর্তমান যুগের সিংহাসনের অধিকারী। ঐতিহাসিকভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান গোপন বিদ্যার অধিকারী ছিল, তারা আজ আধুনিক প্রযুক্তির কারিগর। ভ্যাটিকান সিটির প্রাচীন লাইব্রেরির মতো গোপনীয়তা আজ ডিজিটাল সিকিউরিটির মাধ্যমে অক্ষুন্ন রাখা হয়েছে, গোপন তথ্যাদি নিরাপদ রাখার জন্য উন্নত প্রযুক্তি; তথ্যের অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করছে। টেম্পলার নেটওয়ার্ক আজ গভীর রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তারা বিভিন্ন দেশের সরকার ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে, সংকট সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক গোপন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে। এমনকি বিশ্বের বড়-বড় অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ বা শান্তির ঘটনাও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। টেম্পলার নেটওয়ার্কের আধিপত্য আজ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো সময়ে প্রকাশ পেতে পারে। তাদের গোপন বিদ্যা ও আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণই আজ বিশ্ব রাজনীতির পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews