দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি’র ২০২৬-২৭ সেশনের নির্বাচনের প্রথম দিনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। তবে দিনজুড়ে ভোটকেন্দ্রে আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিল বিগত বছরের তুলনায় কম। বুধবার সকাল ১০টায় শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ দুপুরে এক ঘণ্টার বিরতির পর বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে। প্রথম দিনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ১ হাজার ৭৭১ আইনজীবী। একইভাবে বৃহস্পতিবারও যথাসময়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রথম দিনে ভোট পড়েছে ১৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আওয়ামী সমর্থকদের অংশগ্রহণ ছাড়া এবার অনেকটাই নিরুত্তাপ ভোটগ্রহণ হচ্ছে। অন্যবারের তুলনায় ভোটার উপস্থিতি ও ভোট প্রদানের হারও কম। এবারের নির্বাচনে মোট ১১ হাজার ৯৭ জন আইনজীবী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন উপ-কমিটি। নির্বাচনের মাঠে রয়েছে তিনটি প্যানেল। এগুলো হলো- বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (নীল প্যানেল), জামায়াত সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য প্যানেল (সবুজ প্যানেল) এবং এনসিপি সমর্থিত (লাল-সবুজ) প্যানেল। তবে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। সমিতির বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের জমা দেয়া মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট বারের গঠনতন্ত্র ও প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের ৪২ জন প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
এদিকে, বিকালে ভোট চলাকালে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছেন জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। তাদের অভিযোগ একটি কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ধরা পড়েছে। ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলারও অভাব ছিল। ইসলামী ল-ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক শীর্ষ নেতা এডভোকেট মো. সাইফুর রহমান বলেন, একজন ভোট দিলে পাঁচটি ভোট কাউন্টিং দেখানো হয়। এ ধরনের অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে নির্বাচনে অনিয়ম হলে আমরা কমিশনের প্রতি অনাস্থা দেবো। নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেবো। তবে পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ দেননি।
জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী এডভোকেট আব্দুল বাতেন বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তার সবগুলো বার কাউন্সিল এবং প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। সেই সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনেই যদি আইনজীবীদের সংগঠনের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে আইন-আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সবার নৈতিক দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনকে সব ধরনের প্রশ্নবিদ্ধতার ঊর্ধ্বে রাখা।
ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী বলেন, এবারের নির্বাচন ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে আগের মতো উৎসাহ নেই। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি বড় রাজনৈতিক ধারার আইনজীবীরা নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটের পরিবেশ অনেকটা একপেশে হয়ে গেছে। এ কারণেই উপস্থিতি কম। আরেক আইনজীবী বলেন, সকাল থেকে কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে ভোটার উপস্থিতি খুবই সীমিত। সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বারের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। নির্বাচনের নামে একতরফা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে, ভোটদান পর্ব শেষে নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে অভিযোগ তুলেন আইনজীবী মডেল পিয়া জান্নাতুল। তিনি বলেন, অনেকের নমিনেশন বাতিল হয়েছে, তাদের নিয়ে যদি একসঙ্গে ভোট দেয়া হতো, আইনজীবীদের নেতা কে হবেন, তারা ভালো করে দেখতে পারতেন। কাকে তারা নির্বাচিত করবেন। পিয়া জান্নাতুল আরও বলেন, এখানে অনেক স্বতন্ত্রও ছিল। তাদেরও নমিনেশন দেয়া হয়নি। আওয়ামীপন্থি, বিএনপিপন্থি, এই পন্থি ওই পন্থি এটা নিয়ে কোনো কথা নেই। আমরা এখানে সবার আগে আইনজীবী। আমি বলতে চাই, আইনজীবী হিসেবে আমরা এখানে এসেছি। তিনি আরও বলেন, হয়তো অনেকে অনেক প্যানেল থেকে দাঁড়ায়। আমি চাইবো, আইনজীবীদের জন্য যারা কাজ করবো, তারা যেই প্যানেল থেকেই আসুক না কেন, কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে জামায়াত এটা আমার দেখার বিষয় নয়।
এদিকে, ভোটগ্রহণ পরিদর্শনে এসে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাংবাদিকদের বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে ঢাকা বারের পুনরাবৃত্তি হলে আইনজীবীরা মেনে নেবেন না। নির্বাচন কমিশন গঠনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নির্বাচনের ঐতিহ্য হচ্ছে দু’টি প্যানেল থেকে সমানসংখ্যক সদস্য নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা। কিন্তু ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে যেভাবে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে সিংহভাগ সদস্য নিয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছে, একইভাবে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন নির্বাচনেও ৭ জন কমিশনারের মধ্যে ৬ জনই বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল থেকে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ল-ইয়ার্স কাউন্সিল সমর্থিত সবুজ প্যানেল থেকে মাত্র একজন কমিশনার নেয়া হয়েছে। ফলে অধিকাংশ কমিশনার দলীয় আনুগত্যে পক্ষপাতিত্বের ভূমিকা রাখছে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ল-ইয়ার্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় যে বৈষম্য ও অনিয়ম করা হয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি নির্বাচনে পড়ছে। পেশাজীবী সংগঠনে ক্ষমতাসীনদের দলীয় প্রভাব নির্লজ্জতার নিকৃষ্ট উদাহরণ।
তবে এবারের সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল। তিনি বলেন, জামায়াত সমর্থিত আইনজীবীদের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। মূলত তাদের ভরাডুবির পক্ষে একটি ঠুনকো অভিযোগ আগে থেকেই উত্থাপন করছেন।
সুপ্রিম কোর্ট বারে প্রতি বছর মার্চের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে নির্বাচনের আয়োজনের রেওয়াজ রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের বারে সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে। ওই নির্বাচনে সভাপতি ও তিন কার্যনির্বাহী সদস্যসহ চারটিতে বিএনপি সমর্থকরা এবং সম্পাদকসহ ১০টিতে আওয়ামী সমর্থকরা জয়ী হন। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বারের আওয়ামীপন্থি নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। এতে কার্যনির্বাহী কমিটির কাজে স্থবিরতা দেখা দেয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে রেখে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের বিভিন্ন পদে অন্তর্ভুক্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। তবে, ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট বারে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। দুই বছর পর এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।