বর্ষা মৌসুম এলেই দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। একই সময়ে সাধারণ ভাইরাল জ্বরও ব্যাপকভাবে ছড়ায়। সমস্যা হলো—এই তিন ধরনের জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রেই কাছাকাছি হওয়ায় রোগী ও স্বজনরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ফলে কখনও অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক, আবার কখনও বিপজ্জনক অবহেলার ঘটনা ঘটে। 

শুধু উপসর্গ দেখে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, তবে কিছু লক্ষণ রোগ সম্পর্কে ধারণা এবং সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা  রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।

ভাইরাল জ্বর

সাধারণ ভাইরাল জ্বর এ হঠাৎ জ্বর, গলা ব্যথা, সর্দি, কাশি, হাঁচি, মাথাব্যথা ও শরীরব্যথা দিয়ে শুরু হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩–৫ দিনের মধ্যে উপসর্গ কমতে থাকে। রোগীর ক্ষুধামন্দা ও দুর্বলতা থাকতে পারে, তবে রক্তক্ষরণ বা প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাওয়ার মতো জটিলতা সাধারণত দেখা যায় না।

ডেঙ্গু জ্বর

ডেঙ্গুর সবচেয়ে সাধারণ বা ক্লাসিকাল ডেঙ্গুর লক্ষণ হলো উচ্চমাত্রার জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও হাড়ে ব্যথা, বমিভাব, বমি এবং কখনও শরীরে লালচে রাশ ।

এটিকে ‘হাড়ভাঙা জ্বরও’ বলা হয়। কারণ এত বেশি হাড় এ বেশি থাকে যে রোগী ঠিক মতো উঠে দাঁড়াতে পারে না তাই এই ব্যথা কে ব্রেক বোন ফিভারও বলা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও মার্কিন সিডিসির তথ্যানুযায়ী, ডেঙ্গুর বিপজ্জনক দিক হলো জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে।  

চিকুনগুনিয়া

চিকুনগুনিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড জয়েন্ট বা গিঁটের ব্যথা। হাত, পা, কবজি, গোড়ালি ও হাঁটুর ব্যথা এত বেশি হতে পারে যে, রোগীর হাঁটাচলা কষ্টকর হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর সেরে গেলেও কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত জয়েন্টের ব্যথা থাকতে পারে।  

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একই ধরনের মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং শুরুতে লক্ষণ প্রায় একই রকম হতে পারে। তবে ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ, প্লাটিলেট কমে যাওয়া ও শরীরে তরল পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্টের ব্যথা তুলনামূলক বেশি ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

জ্বর হলেই ডেঙ্গু ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। বিশেষ করে বর্ষাকালে জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।

কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত

ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে—

* তীব্র পেটব্যথা

* বারবার বমি

* নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া

* বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া

* অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা

* শ্বাসকষ্ট

* প্রস্রাব কমে যাওয়া

* হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া

এগুলো গুরুতর ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।  

জ্বর হলে কী করবেন?

প্রথমত, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপ, ডাবের পানি বা অন্যান্য তরল খাবার বেশি খেতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  ডেঙ্গুর জন্য সব চেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হলো শরীর এর তরল পদার্থ এর ভারসাম্য রক্ষা করা। আমরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেই এটাই ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট।

জ্বর ও ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা এ ধরনের কিছু ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।  

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া কি একসঙ্গে হতে পারে

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া কি একসঙ্গে হতে পারে

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। কারণ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও অধিকাংশ ভাইরাল জ্বর ভাইরাসজনিত রোগ; অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক কোনো উপকার করে না।

তৃতীয়ত, জ্বরের শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নাওয়া । 

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে CBC, হেমাটোক্রিট, প্লাটিলেট কাউন্ট এবং রোগের সময় অনুযায়ী NS1 বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

কী করবেন না? 

* নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ সেবন করবেন না।

* শুধু প্লাটিলেট সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হবেন না।

* অযথা স্যালাইন নেবেন না।

* জ্বর কমে গেলে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন ধরে নেবেন না।

* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েড বা শক্তিশালী ব্যথানাশক খাবেন না।

প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের মূল উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ করা। বাসা ও আশপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফুলের টব, এসির ট্রে, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা বা খোলা পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। 

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও সাধারণ ভাইরাল জ্বরের অনেক লক্ষণ একে অপরের সঙ্গে মিল থাকলেও কিছু বিশেষ উপসর্গ রোগ সম্পর্কে ধারণা দেয়। ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ ও শক, চিকুনগুনিয়ায় তীব্র জয়েন্ট ব্যথা এবং সাধারণ ভাইরাল জ্বরে শ্বাসনালির উপসর্গ বেশি দেখা যায়। তবে নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার বিকল্প নেই। তাই জ্বরকে কখনোই হালকাভাবে না নিয়ে সচেতনতা, দ্রুত পরীক্ষা এবং সঠিক চিকিৎসাই হতে পারে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

লেখক: ডা. আয়শা আক্তার

উপ-পরিচালক

টিবি হাসপাতাল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews