বিশ্বজুড়ে স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ছোট বাজেটের গল্পনির্ভর সিনেমাগুলো যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়াচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশেও নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা ভিন্নধর্মী গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সেই ধারার সাম্প্রতিক সংযোজন আকাশ হক পরিচালিত ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’।
গত ১২ জুন মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে রনো আনোয়ারের ছোটগল্প ‘ঝরাপাতার দুঃখবিলাস’ অবলম্বনে। মুক্তির আগেই এটি ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বাংলাদেশ প্যানোরামা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পায়। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র’ উৎসবে অর্জন করে হীরালাল সেন পদক।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে ‘চানখাঁরপুল’ নামের একটি কাল্পনিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ভেতরের জীবন, র্যাগিং, গেস্টরুম সংস্কৃতি, ছাত্ররাজনীতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব গল্পের মূল উপজীব্য। নতুন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া গল্প ধীরে ধীরে উন্মোচন করে ক্ষমতার নানা স্তর ও তার প্রভাব।
যদিও গল্পের প্রেক্ষাপট কাল্পনিক, তবে এর ঘটনাপ্রবাহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে সহজেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক, পদ-পদবির প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সুবিধা লাভের সংস্কৃতিকে নির্মাতা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি এর সংলাপ। হাস্যরসের আড়ালে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক মন্তব্য দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সিনেমাটি দেখায়, কীভাবে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সেই কাঠামোর মধ্যেই আটকে পড়ে।
এটি কোনো একক চরিত্রনির্ভর চলচ্চিত্র নয়। বরং বিভিন্ন স্তরের ছাত্রনেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে একটি সামগ্রিক চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। নির্মাতা ইচ্ছাকৃতভাবেই চরিত্রগুলোর নাম ব্যবহার করেননি, যা গল্পের প্রতীকী দিককে আরও জোরালো করেছে।
অভিনয়ে বেশিরভাগ শিল্পীই নতুন বা অপেশাদার হলেও তাঁদের পারফরম্যান্স প্রশংসনীয়। বিশেষ করে হর্সম্যান চরিত্রে দেবদ্যুতি আইচ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির ভূমিকায় রকি খান নজর কাড়েন। স্বল্প উপস্থিতিতেও আখতারুজ্জামান আজাদ দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সিনেমার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো হর্সম্যান চরিত্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া ফ্যান্টাসি উপাদান। বাস্তবধর্মী রাজনৈতিক ব্যঙ্গ থেকে গল্পটি এক পর্যায়ে কল্পনার জগতে প্রবেশ করে, যা চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
সংগীত ও আবহসংগীতও সিনেমার শক্তিশালী দিকগুলোর একটি। বিশেষ করে ‘রাজনীতির ময়দান ও সহমত ভাই’ এবং ‘সহমত ভাই ২’ শিরোনামের র্যাপ গান দর্শকদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করতে পারে।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মাঝামাঝি অংশে গল্পের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে যায় এবং সম্পাদনায় আরও সংযম থাকলে সিনেমাটি আরও প্রভাবশালী হতে পারত।
চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও পরিচালনা- সবকিছুই একাই সামলেছেন আকাশ হক। সীমিত বাজেট ও কিছু কারিগরি দুর্বলতা সত্ত্বেও ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ সমসাময়িক ছাত্ররাজনীতি ও ক্ষমতার বাস্তবতাকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরার একটি সাহসী প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।