আশুরা শব্দটি এসেছে আরবি আশারা থেকে। যার অর্থ হলো দশ। হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররমের দশম তারিখকে বলা হয় আশুরা। আজ ১৪৪৮ হিজরি বর্ষের আশুরার দিন। এদিনটি ইসলামের ইতিহাসে নানা কারণে মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই মহিমার অন্তরালে যে গভীর শিক্ষণীয় দিকগুলো রয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম ইসলামের স্বাতন্ত্র্যবোধের শিক্ষা। নবী করিম (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তিনি দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বললেন, এদিন মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এদিন তারা রোজা রাখেন। তখন নবীজি (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর ব্যাপারে ইহুদিদের চেয়ে মুসলমানদের হক বেশি। অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখতে বললেন। (বুখারি, ২০০৪)।
এ সময় তিনি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। সেটি হলো স্বাতন্ত্র্যবোধের শিক্ষা। রসুল (সা.) নির্দেশ দিলেন, তোমরা ইহুদিদের থেকে ব্যতিক্রম করো; আশুরার রোজার সঙ্গে নবম অথবা একাদশ তারিখে আরও একটি রোজা রাখো। এখানে লক্ষণীয় যে ইহুদিদের মধ্যে মুসা (আ.)-এর বিজয়ের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ যে কল্যাণকর আমলটি প্রচলিত ছিল, নবীজি (সা.) সেটিকে অনুমোদন করেছেন। কিন্তু তা পালনের ক্ষেত্রে হুবহু অনুসরণ না করে মুসলমানদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন। অথচ আজ যদি আমরা আমাদের জীবনাচারের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে এর চরম বৈপরীত্য দেখতে পাই। নবীজি (সা.) যেখানে ইবাদতের ক্ষেত্রেও বিধর্মীদের থেকে আলাদা থাকার তাগিদ দিয়েছেন, সেখানে বর্তমান মুসলমানদের যাপিত জীবন, পোশাক-আশাক, কৃষ্টি-কালচার, মূল্যবোধ এমনকি পাপকাজেও ইহুদি-খ্রিস্টানদের অন্ধ অনুকরণের ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শুধু অনুকরণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনেকে এতে গর্ববোধও করেন।
এ যেন রসুল (সা.)-এর সেই সতর্কবাণীরই জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি, যেটি আজ আমাদের চোখের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রসুল (সা.) বলেছিলেন, এমন একটা সময় আসবে যখন মুসলমানরা তাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর পদে পদে অনুসরণ করবে। তারা যদি এক বিঘত এগোয়, মুসলমানরাও এক বিঘত এগোবে; তারা যদি এক গজ যায়, মুসলমানরাও এক গজ যাবে। এমনকি তারা গুইসাপের গর্তে ঢুকলে সেখানেও তারা ঢুকে পড়বে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কি ইহুদি-খ্রিস্টান? নবীজি (সা.) বললেন, তবে আর কারা? (বুখারি, ৩৪৫৬)। বর্তমান মুসলিম সমাজব্যবস্থায় নবীজি (সা.)-এর এই ভবিষ্যদ্বাণী যেন প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে। শিক্ষা, বিনোদন, জীবনযাপন, পরিবার ও সমাজ সর্বত্রই বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রাবল্য। এতটা অধঃপতনের পরও আমরা কীভাবে নবীজি (সা.)-এর উম্মত বলে দাবি করতে পারি! এটি এখন আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন।
আশুরার দিনে রোজা রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর (আশুরার রোজা) দ্বারা আগের এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (মুসলিম)। তাই আশুরার রোজা পালন করা এবং এর ফজিলত অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানেরই উচিত। এর সঙ্গে আশুরার চেতনা ধারণ ও উপলব্ধি করাও প্রত্যেকের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ মহররম, অর্থাৎ আশুরার দিন ইসলামি ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো দাম্ভিক ফেরাউন ও তার বাহিনীর সলিলসমাধি। এদিন মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ফেরাউনের জুলুম-নির্যাতন থেকে মুক্তি দান করেন। এ ছাড়া ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা কারবালার ট্র্যাজেডিও সংঘটিত হয়েছিল এদিন।
এর মধ্য থেকে আমরা বুঝতে পারি চূড়ান্ত বিজয় সব সময় সত্যের। বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে নবী-দৌহিত্র হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত তো পরাজয়। বাস্তবতা কিন্তু তা নয়। হুসাইন (রা.) নিজের আদর্শে বলীয়ান থেকে শহীদ হয়েছেন, কিন্তু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ফলে তিনি আজ সবার কাছে সমাদৃত আর তাঁর খুনিরা সারা পৃথিবীতে ধীকৃত। এটাই আশুরার চেতনা। সত্যের বলে বলীয়ান থাকা। পৃথিবীর ইতিহাসে অল্পসংখ্যক মানুষ যাদের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য, সত্য ও ন্যায়ের বার্তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে। সংখ্যায় তারা অল্প ছিল, কিন্তু আদর্শিক চেতনায়, দৃঢ়তায় ছিল ইস্পাতকঠিন। কিন্তু আজ আমরা সংখ্যায় বিপুল হলেও আদর্শিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছি। ফলে বিজাতীয় আদর্শ, সংস্কৃতি আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসেছে। যতদিন আমরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যবোধের আদর্শে বলীয়ান হতে না পারব, ততদিন বিজাতীয় সংস্কৃতি ও আদর্শের প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। বর্তমান সময়ে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হলো এটি। তাই বিজাতীয় সংস্কৃতি বর্জন এবং ইসলামের স্বাতন্ত্র্যবোধের আদর্শে বলীয়ান হওয়াই হোক এবারের আশুরার দীপ্ত শপথ।
♦ জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম