পরিবার থেকেই মানব সভ্যতার ভিত্তি রচনার সূচনা। কুরআন মজিদ শিল্প ও দর্শনের মিশেল দিয়ে বর্ণনা দিয়েছে মানব জীবনের মধুর এই পর্বটির। ‘আর তার (আল্লাহর) নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গীনিদের, যাতে তোমরা ওদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য তাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ সূরা রূম: আয়াত-২১।
কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী মানব সভ্যতার ভিত্তি রচনার দুটি মূল উপাদান ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাত) ও মায়া-দয়া (রহমত)।
ইসলামে নারী-পুরুষ আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তখন তাদের উপর নেমে আসে ভালোবাসা ও দয়া-মায়ার আসমানী উপহার। এই উপহার সামগ্রী নিয়ে গড়ে ওঠে মায়াময় পরিবার, সুন্দর সংসার ও সমাজ সভ্যতা।
তবে একটি অভিশাপ সাজানো এই পরিবার, সংসার, মানব সভ্যতার ভিত্তিভূমিকে ধ্বংস, তছনছ করে দিতে পারে। তাতে আশার স্বপ্নগুলো ধূলিস্যাৎ আর সন্তানদের ভবিষ্যত অন্ধকারে ছেয়ে যেতে পারে। সেই অভিশাপে আজ আধুনিক সভ্যতার চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যের মধ্যেও পরিবারগুলো নরক যন্ত্রণায় জ্বলছে। সন্তান জানে না তার পিতা কে। তাই তাদের পরিচয় মায়ের নামে। পরিচয়পত্রে বাবার নাম লেখা হয় না। বাবাহীন সন্তানদের সান্ত¦না দিতে পালিত হয় বাবা দিবস। সন্তান বয়োপ্রাপ্ত হয়ে ভাবে, একজন নারী ও পুরুষ ফুর্তি করেছিল, তাতে আমি বা আমরা নেমে এসেছি পৃথিবীর বুকে। জীবনকে উপভোগ করতে হলে আমাদেরও চলতে হবে সেই পথ ধরে।
এক সাংবাদিক ইউরোপীয় এক দেশে সাঁঝের বেলার বিনোদন পার্কের বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন, রোদের তেজ কমে আসার সাথে সাথে শত শত বয়োবৃদ্ধ মানুষ পার্কে আসছে, প্রত্যেকের হাতে একটি করে দড়ি। দড়ির ওপ্রান্তে বাঁধা সখের পোষা কুকুর, একাকী জীবনের একমাত্র সঙ্গী। নিঃসঙ্গ বিলাসবহুল ফ্লাটে একদিন মারা গেলে অন্তত লাশটি পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াবে না, বাইরে গিয়ে কুকুর ঘেউ ঘেউ করবে, পুলিশ এসে লাশটি নিয়ে সৎকার করবে। কুকুরই তাদের জীবনের শেষ ভরসা।
আমাদের দেশে শহরে-গ্রামে বুড়ো-বুড়িরা বউঝি, নাতি-নাতনি-বেষ্টিত জীবনে কী পরম সুখে দিনযাপন করছে তা তখনই বুঝবে যখন পশ্চিমা সভ্যতায় বেড়ে ওঠা রাজধানীর অভিজাত এলাকার আধুনিক শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের কাছে অবহেলিত ও বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত বৃদ্ধ মানুষগুলোর তপ্ত দীর্ঘশ্বাসের বেদনাবিদুর গল্প তারা শুনতে পাবে।
যে অভিশাপের কথা বলছি তার নাম স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ। বিবাহ বন্ধনের বাইরে পরকীয়া বা পরপুরুষ কিংবা পরনারীর প্রতি আসক্তি থেকে জন্ম নেয় এই অবিশ্বাস, সন্দেহ, অভিশাপ। এটিই জীবন ও সংসারে সকল সমস্যার মূল। এ কারণেই মহানবী (সা.) অত্যন্ত কঠোর শাসনের মাধ্যমে এই সমস্যার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। বিবাহবহির্ভূত যেকোনো যৌন সম্পর্ককে জ্বেনা-ব্যভিচার সাব্যস্ত করে তার জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। এই অভিশাপ সম্পর্কে কুরআন মজিদের সতর্কবাণী: ‘তোমরা জ্বেনার নিকটবর্তী হইও না, কারণ তা নির্লজ্জ অশ্লীলতা, জঘন্য পাপ ও নিকৃষ্ট পথ।’ সূরা বনি ইসরাঈল; আয়াত-৩২।
যাদের জীবনে পরকীয়া বা ব্যভিচারের পাপ স্পর্শ করেনি তারাই আল্লাহর দেয়া ভালোবাসা ও দয়ার মর্ম বুঝতে সক্ষম হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমলিন্য বা মান অভিমান স্বাভাবিক। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে স্ত্রীর কোনো দোষত্রুটি স্বামীর চোখে অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে, যা দাম্পত্য জীবনকে বিষাদময় করতে পারে। এমন পরিস্থিতির জন্য স্বামীর সামনে চিন্তার একটি দিগন্ত খুলে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। কুরআন মজীদে বলেছেন, ‘তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন কর। অতঃপর তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দও কর, তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।’ সূরা নিসা: আয়াত-১৯।
হাদীস শরীফে এই আয়াতের তাফসীর এসেছে এভাবে: ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণরূপে ঘৃণা না করে। তার কোনো একটি স্বভাব যদি তার অপছন্দ হয়, তাহলে তার অন্য কোনো স্বভাবে সে সন্তুষ্ট থাকবে।’ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৯।
স্ত্রী যদি একান্ত অবাধ্য হয়, মান-অভিমানের মাধ্যমে কীভাবে সমাধান করবে সে পথ বাতলে দিয়েছেন নবীজি। বলেছেন, স্ত্রীর প্রতি রাগ দেখাও, প্রয়োজনে বিছানা আলাদা কর, তবে ঘরের বাইরে গিয়ে রাত যাপন করতে পারবে না। স্ত্রী একান্ত অবাধ্য হলে শাসন কর, তবে মুখম-লে চড় মারার অধিকার তোমাকে দেয়া হয়নি। সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হলে উভয় পক্ষের বুঝমান দুজন লোক দিয়ে আপোসের ব্যবস্থা করো। মনে রেখো, বিবাহবিচ্ছেদ আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয় একটি বিকল্প পথ।
দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রী কার গুরুত্ব কতখানি, তা নিয়েও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আল্লাহপাক সে সমস্যার সমাধান দিয়েছেন পরস্পরের গুরুত্ব ও ভূমিকা নির্ণয় করে দিয়ে: ‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক...।’ সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭।
পোশাক মানুষকে শীত-গ্রীষ্ম, জলবায়ুর প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়, তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করে, দেহের সৌন্দর্য প্রকাশ করে, চতুর্থত সমাজের সামনে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে। আল্লাহ বলছেন যে, স্বামী বা স্ত্রীও পরস্পরের জীবনে পোশাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। হাদীস শরীফে এই গুরুত্বের কথাটি ব্যক্ত হয়েছে অন্যভাবে। ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। ... পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল; তাকে তার পরিবারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানদের দায়িত্বশীল; তাকে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে....।’ (বুখারি, হাদিস নং ২৫৫৪; মুসলিম, হাদিস নং ১৮২৯)।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর ভূমিকা অনুধাবনের জন্য একটি উপমার আশ্রয় নেব। পরিবারকে যদি কোনো কোম্পানির শিল্প-কারখানার সাথে তুলনা করি, তাহলে স্বামী হল কোম্পানির চেয়ারম্যন, বাইরের দৌড়ঝাপ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য বাজারজাতকরণ স্বামীর দায়িত্ব। আর কারখানার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, পণ্য উৎপাদন, শ্রমিক ও কর্মপরিচালনা প্রভৃতির দায়িত্ব স্ত্রীর উপর। অন্যকথায় স্বামী পরিবারের চেয়ারম্যান আর স্ত্রী ম্যানেজার।
মানব সংসারে একসময় নেমে আসে আকাশের চাঁদ। মায়ের কোলে দোল খায় সেই চাঁদনি। তার রৌশনীতে আলোকিত, মুখরিত থাকে পুরো পরিবার। আসমানী এই মেহমানকে কীভাবে বরণ করা হবে তার সমাধানও দিয়েছেন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। নবজাতকের মাথার চুল কামিয়ে সমান ওজনের রূপা বা স্বর্ণ কিংবা তার মূল্য সদকা করতে হবে। আল্লাহ, রাসূল ও ইসলামী ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে সন্তানের সুন্দর নাম চয়ন করতে হবে। নতুন অতিথিকে বরণ করার জন্য সম্বর্ধনার আয়োজন থাকতে হবে। সে আয়োজনে আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে, আত্মীয়-স্বজন আসবে আনন্দ ভাগাভাগি করবে, তার নাম আকীকা।
এই আনুষ্ঠানিকতার পর সন্তানের ভবিষ্যত রচনার দায়িত্ব পালন করতে হবে মা-বাবাকে। তার চলন-বলন, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন করতে হবে, তার জীবনকে বিকশিত করতে হবে স্বভাবধর্ম ফিতরাতের উপর, যাতে সে ভবিষ্যত জীবনে পৃথিবীতে মহান সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের যোগ্য হয়।
নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন: ‘প্রত্যেক মানব শিশু জন্ম নেয় ফিতরাতের উপর; কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নিউপাসক হিসেবে গড়ে তোলে।’ বুখারী, ২৬৫৮; মুসলিম, ১৩৫৮।
ফিতরাত মানে স্বভাবধর্ম, ইসলাম। একজন মানব শিশুকে যদি স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া হয়, পারিপাশির্^কতার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা হয়, সে অবশ্যই নিজের সৃষ্টিকর্তার পরিচয় ও তার প্রতি আনুগত্যের ভাবধারা নিয়ে বেড়ে উঠবে। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী, তাওহীদবাদী ও মুসলমান হিসেবে গড়ে উঠবে। এই হলো হাদীসের মর্মবাণী। এই হাদীসে নবীজি তাগাদা দিয়েছেন, তোমরা সন্তানদের সুশিক্ষা দাও, আপন সৃষ্টিকর্তার পরিচয় দাও, সুন্দর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের নিরিখে গড়ে তোলো, একজন খাঁটি মুমিন মুসলমান হিসেবে আল্লাহর খলিফার মর্যাদা ও ভূমিকা নিয়ে জীবন গড়ার ব্যবস্থা করো।
সন্তান মহান আল্লাহর দেয়া বড় নেয়ামত। কেউ হয়ত মনে করবে, ছেলে সন্তান বুঝি নেয়ামত আর কন্যাসন্তান বোঝা। আল্লাহর নবী (সা.) একাধিক হাদীসে বলেছেন: মেয়ে বা কন্যাসন্তান একেকটি বেহেশত। সতর্ক করেছেন, আদর উপহারের বেলায় খবরদার ছেলেদেরকে মেয়েদের উপর প্রাধান্য দিও না।
পরিবারে সবাই উপার্জন করে না, সম্ভবও নয়। অনেক পরিবারে বিধবা, অসহায় প্রতিবন্ধি থাকতে পারে। কেউ যেন মনে না করে যে, এরা একেকটি বোঝা। আল্লাহর নবী বলেছেন, ‘তোমাদের যে রুজি-রোজগার দেয়া হয়, তোমাদের যে সাফল্য বা বিজয় দান করা হয় তার নেপথ্যে তোমাদের দুর্বলদের অদৃশ্য ভূমিকা আছে।’ আহমদ: ২১৭৩১; তিরমিযী: ১৭০২; আবু দাউদ: ২৫৯৪।
পারিবারিবক জীবনে বড় সমস্যাটি দেখা দেয় বার্ধক্যে। জীবনের শেষপ্রান্তে যৌবন যখন অতীতের স্মৃতি, আয়-রোজগার নাই, অসুখ-বিসুখে নিজেই নিজের কাছে বোঝা, মেজাযটাও খিটখিটে তখন অন্যের উপর বোঝা হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এই পরিস্থিতির জন্য পশ্চিমা সভ্যতার একমাত্র সমাধান বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
ইসলাম এই সমস্যার যে সমাধান দিয়েছে, তা নিয়ে আজকের দিনেও মুসলমানরা দুনিয়ার সামনে গর্ব করতে পারে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার কথা চিন্তা করুন। আমাদের প্রাচুর্য নেই; কিন্তু উদার মন আছে। এখানে বউঝি, নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত দাদা-দাদি, নানা-নানির জীবন যেন বেহেশতের জলসা। মা-বাবার ¯েœহের ছায়াঘেরা এই পরিবার ও সংসার পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে স্বপ্ন। আমাদের সমাজ এই নেয়ামত পেয়েছে আল্লাহ ও তার রাসূলের শিক্ষা থেকে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মা-বাবা তোমার বেহেশত ও দোযখ। মা-বাবা তোমার উপর সন্তুষ্ট থাকলে তোমার বেহেশত নিশ্চিত। এর বিপরীত হলে তোমার জন্য জাহান্নাম অপেক্ষমান।’ তিনি বলেছেন, ‘মা-বাবার পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত।’
মা-বাবার সাথে প্রতিটি মুহূর্তে বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে কী ধরনের আচরণ করতে হবে তা অক্ষরে অক্ষরে বুঝিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ পাক। ইরশাদ হয়েছে: ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তাদেরকে উফ্ বলো না। তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল। তাদের জন্য তোমার বিনয় ও মমতার ডানা বিছিয়ে দাও এবং বল যে, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।’ সূরা বনি ইসরাঈল; আয়াত: ২৩-২৪।
আসুন, পারিবারিক জীবনকে বেহেশতী আবহে গড়ে তোলার মানসে মসজিদে মাহফিলে শিক্ষা ব্যবস্থায় সিলেবাসে, পাঠ্যবইতে আল্লাহ ও রাসূলের এই বাণীগুলো তুলে ধরি।
লেখক: আমির, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন।