প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে এবারের দিনটি বিএনপির জন্য অন্যবারের চেয়ে ভিন্ন। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবার দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে দলটির সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এবার সামনে এসেছে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার অনুপস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ পথচলার প্রশ্ন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থাকা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক সংকট- সব পর্যায়েই বিএনপির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।



বিএনপির দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তিনি। ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর প্রায় চার দশক দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থেকে বিএনপিকে পরিচালনা করেন তিনি।

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

বিএনপি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্ব তার হাতেই ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে আবারও সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি।

আরও পড়ুন

তবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতা ও নির্বাচনি সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতি, আন্দোলন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তাকে যেতে হয়েছে। ২০০৭ সালের পর দেশের রাজনৈতিক সংকটের সময় থেকে মামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হন তিনি। ২০১৮ সালে ‘দুর্নীতির মামলায়’ সাজা হওয়ার পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে পড়ে। এসব মামলা ছিল তার বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পলায়নের পর মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে আর ফিরতে পারেননি খালেদা জিয়া। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটে।

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এবার বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহে তাই স্বাভাবিকভাবেই এসেছে আবেগের ছোঁয়া। দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু চেয়ারপারসন নন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতীক। ফলে তার অনুপস্থিতিতে দলের ঐক্য ও সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে নতুন করে।

বিএনপির রাজনীতিতে এ অবস্থায় তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তার দেশে ফেরাকে ঘিরে দলটির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখাই এখন তার সামনে বড় দায়িত্ব বলে মনে করছেন দলটির সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও পুনর্গঠনের বার্তা দেওয়ার সুযোগ। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামকে ভিত্তি করে নতুন নেতৃত্বে দলটি কীভাবে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের অবর্তমানে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন ভারসাম্য তৈরি করা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলে থেকেও বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দলটি দেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে। সেই দীর্ঘ পথচলায় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটি তৈরি হয়েছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।

এবার সেই নেত্রী খালেদা জিয়া নেই। আছে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। আর সেই উত্তরাধিকার সামনে রেখে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি এখন নতুন অধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে। প্রতিষ্ঠার দিনটি তাই দলটির জন্য শুধু অতীতের গৌরব স্মরণের নয়, বরং খালেদা জিয়ার পরবর্তী বিএনপির রাজনৈতিক পথচলার দিকনির্দেশনা দেওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

আরটিভি/এমএ







আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে





আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews