যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ছয় মাসের যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সক্ষমতা এবং যুদ্ধের চাপ সহ্য করার সামর্থ্য সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী।

এমনকি কয়েক মাস ধরে সংঘাত অব্যাহত রাখার প্রস্তুতিও রয়েছে দেশটির। শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে, যার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটবে। গত কয়েক মাসের লড়াইয়ে ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের নেতৃত্ব মনে করছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামর্থ্য এখনো ধরে রেখেছে। মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের ভাষ্যও এ মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গোয়েন্দা-সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে অবহিত কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাগুলো আগের চেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত এবং হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা তেহরানের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। গোয়েন্দা কমিটির সদস্য জেসন ক্রো বলেন, ইরানের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে যে ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেও তারা দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়াও ইরানের হিসাবের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক মার্কিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এসব অস্ত্রের মজুত যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা। হরমুজ প্রণালি নিয়েও তেহরানের কৌশলগত আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হতো। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ৪ সেপ্টেম্বর মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের ১০ দিনের গড় ছিল ১৫টি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত।

মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশের ধারণা, ইরান নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সংঘাত টেনে নেওয়ার কৌশল নিতে পারে। তেহরানের হিসাব হলো, দীর্ঘ যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এর ফলে মার্কিন জনগণের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও নির্বাচনের আগে যুদ্ধের বড় ধরনের বিস্তার এড়িয়ে চলতে আগ্রহী। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর হবে, ইরানও তত বেশি পাল্টা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং পাল্টা মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে। সব মিলিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের মূল বার্তা হলো যুদ্ধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের নেতৃত্ব এখন আর দ্রুত সামরিক চাপে নতি স্বীকারের অবস্থানে নেই। বরং ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে দীর্ঘ সংঘাতে যাওয়ার মানসিক ও সামরিক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও গোলাবারুদের মজুত, যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির মূল্য এবং নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে। ফলে ছয় মাস পেরিয়েও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

পেন্টাগনের ৫০ কর্মকর্তাকে ‘পলিগ্রাফ’ পরীক্ষা : ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কৌশলগত অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছেÑএমন স্পর্শকাতর ও গোপনীয় তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তীব্র অস্বস্তিতে পড়েছে পেন্টাগন। এই তথ্য ফাঁসের উৎস খুঁজে বের করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদর দফতর পেন্টাগনের জয়েন্ট স্টাফের অন্তত ৫০ জন সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক কর্মচারীকে পলিগ্রাফ (লাই ডিটেক্টর বা মিথ্যা শনাক্তকরণ) পরীক্ষার মুখোমুখি করা হয়েছে। গতকাল দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার মিসাইল সহ গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মুজুদে বড় ধরনের টান পড়েছে। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যমে পেন্টাগনের এ সংক্রান্ত কিছু গোপনীয় নথি ও তথ্য প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয় মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে। তথ্য ফাঁসের এই ঘটনার পেছনে কোনো কর্মকর্তা যুক্ত রয়েছেন কি না, কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশি চরের ভূমিকা পালন করছেন কি না, তা নিশ্চিত করতেই এই অস্বাভাবিক ও ব্যাপকভিত্তিক পলিগ্রাফ পরীক্ষা চালানো হয়েছে বলে সিবিএস নিউজের সূত্রে জানানো হয়। তবে পেন্টাগনের এই পলিগ্রাফ পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা সরাসরি ব্যর্থ হননি বলে জানা গেছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এই ধরনের পলিগ্রাফ পরীক্ষার নির্দিষ্ট তথ্যের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত স্পর্শকাতর তথ্য অননুমোদিতভাবে ফাঁস করাকে পেন্টাগন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত পরিচালনা করে।’

সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ ভ্যান্স, সমর্থন ট্রাম্পের : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ট্রাম্প সংঘাতটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘সামরিক সংঘাত’ আখ্যা দিয়ে একে ‘স্মল পটেইটোজ ’ বা ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভ্যান্স বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলবেন না। তার দাবি, বর্তমানে সক্রিয়ভাবে গুলি বিনিময় হচ্ছে না। তবে একই সময়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র কুয়েতে হামলা চালিয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও অব্যাহত ছিল। ভ্যান্স বলেন, সংঘাতের বড় ধরনের সামরিক অভিযান প্রায় ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসবে না বলেও জানান তিনি। ভ্যান্সের বক্তব্যের বিষয়ে শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, অনেকেই এটিকে যুদ্ধ হিসেবে দেখেন না। তিনি একে ‘সামরিক সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ‘স্মল পটেইটোজ’Ñঅর্থাৎ বড় কোনো বিষয় নয়। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের মধ্যেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সামরিক হামলা-পাল্টা হামলাকে ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়েছে।

খার্গ দ্বীপের কাছে ইরানি ট্যাঙ্কারে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কাছে একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। গতকাল এ হামলার খবর প্রকাশ করা হয়। ইরানের স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্ক (এসএনএন) জানিয়েছে, হামলার শিকার জাহাজটি একটি ছোট তেলবাহী জাহাজ। এতে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, জাহাজটিতে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার পর জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের মূল্যে রেকর্ড : আসন্ন ‘লেবার ডে’ (শ্রম দিবস) উপলক্ষ্যে দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যয়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের বাজারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা ‘গ্যাসবাডি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লেবার ডে-র দিনে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪.০৩ ডলার, যা ২০১২ সালের আগের সর্বোচ্চ ৩.৮৩ ডলারের রেকর্ডকে বহু পেছনে ফেলে দেবে।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার ডে বা শ্রম দিবস পালন করা হয়। এই দীর্ঘ ছুটিতে সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা পরিবারসহ প্রচুর ভ্রমণ করে থাকেন। তবে এবার জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম সেই আনন্দের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। গত বৃহস্পতিবার নাগাদ দেশটিতে পেট্রোলের গড় মূল্য ছিল গ্যালনপ্রতি ৪.১৩ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ ডলার বেশি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ৪ ডলারের এই মাইলফলক একটি বড় ধরনের ‘কষ্টের সীমা’ বা অর্থনৈতিক চাপ। সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা, তাসনিম।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews