জীবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছুলে শরীরখানি যেন রংবাজ হয়ে ওঠে। অবস্থার প্রভাবে নানাবিধ ছবি দেখতে পাওয়া যায়। সূর্যোদয়ের আগে যে মনটা ফুরফুরে, সেটাই ভরদুপুরে খিটখিটে। পড়ন্ত বিকেলে যে মন ব্যাকুলিত হয় আকাশে নীরব সুরের রংধনু অনুভব করতে, সে মনই সন্ধ্যায় স্মৃতিকাতরতায় কাঁদে আর কাঁদে। শেষ বয়সে আমার বাবাও শরীর-মন সংঘাতের শিকার হয়েছেন। ফলত তিনি কখনো জরাজনিত সমস্যায় ন্যুব্জ থাকতেন, কখনো আবার ফুর্তিতে গুনগুন করে গাইতেন তাঁর যৌবনকালের প্রিয় গানগুলোর কোনো কোনোটির তিন/চার চরণ।
রক্তচাপজনিত হাঁপানিতে কোনো কোনো মাসে টানা নয়/দশ দিন ভুগতেন বাবা। ও সময় তাঁর যে কষ্ট হতো, তা দেখে তাঁর সন্তানরা মনমরা হয়ে যেত। বাবার প্রতি ছেলেদের দরদ নাকি তেমন দৃশ্যমান হয় না। বিদঘুটে শব্দ ‘দৃশ্যমান’। লেখাপড়া জানা কিসেমের বাঙালিরা এই শব্দটাকে তাদের কলিজার অংশ করে নিয়েছে। সুযোগ পেলেই তারা শব্দটির প্রয়োগে তৎপর। এভাবেই দৃশ্যমান উন্নতি, দৃশ্যমান অপচয়, দৃশ্যমান দুর্নীতি, দৃশ্যমান জনকল্যাণ, দৃশ্যমান আত্মকেন্দ্রিকতা, দৃশ্যমান অভদ্রতা ইত্যাদির লিখিত রূপ ধরা পড়ছে। আমার বোনদের অভিযোগ : তোরা ভাইয়েরা বাবার স্বাস্থ্যোদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো কাজ করছিস না।
বাড়ি থেকে সাড়ে পাঁচ মাইল পুব-দক্ষিণে জগৎপুর গ্রামে বাস করেন সাধকপুরুষ মুফতি জুবায়ের হাসান বাগদাদী। পরীরা তাঁর চাকরবাকর হয়ে হুকুম পালন করে। প্রত্যেক বৃহস্পতিবার রাতে তিনি পরীর আসর বসান এবং পরীকে দিয়ে মানুষের যাবতীয় কঠিন সমস্যার প্রতিকার করেন। দুর্ভাগা ভাই আমরা, বাবার দৃশ্যমান সেবা করছি, এটা প্রমাণ করার জন্য অদৃশ্যমান পরীর কাছে ধরনা দিতে বলল বোনেরা। জগৎপুর যায় তিন ভাই। গিয়ে নতুন এক জগতের মুখোমুখি হয়। জুবায়ের হাসান ইরাকের রাজধানী বাগদাদ নগরীতে জন্মাননি, কখনো সেখানে যানওনি। তবু তিনি বাগদাদী। কারণ ওই নগরীর বুকে তাঁকে দাফন করার জন্য তিনি কুড়ি বছর আগে আল্লাহর দরবারে রুহানি দরখাস্ত করে রেখেছেন।
জগৎপুরে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাওয়ার কথা ছিল চার ভাই। তার মধ্যে অফিসের জরুরি তলব পেয়ে এক ভাই ঢাকায় ছুটে যেতে বাধ্য হয়। এই ভাইকে চিঠিতে তিন ভাই তাদের অভিজ্ঞতার যে বিবরণ দেয় তার মধ্যে চারটি বিষয় প্রাধান্য পায় :
(১) আমাদের এলাকার লোক সোলেমান আলী, বয়স ৩০, মুফতি বাগদাদীর প্রচারচক্রের প্রধান। সোলেমান দ্বারা প্রভাবিত বোনেরা নিশ্চিত হয় যে আমেরিকা থেকে পরী ওষুধ এনে দেবে এবং তা খেয়ে বাবা হবেন হাঁপানিমুক্ত। ওষুধের মূল্য ২ হাজার টাকা। মুফতির ফিস ১ হাজার টাকা। বিকাল ৩টায় ৩ হাজার টাকা দেওয়া হলো মুফতি জুবায়ের হাসান বাগদাদীর হাতে। এরপর ভাইয়েরা নাশতা খেতে যায় স্থানীয় বাজারে। চা-দোকানে পরিচয় হয় সেই এলাকার কলেজশিক্ষক বরকত সাদিকের সঙ্গে। কলেজশিক্ষক বলেন, সময় আর টাকা নষ্ট করার জন্য এত দূরে কেউ আসে! শিক্ষিত সজ্জনরাই যদি ধাপ্পাবাজদের ফাঁদে পা দেওয়ার জন্য দিওয়ানা হয়, নির্বোধ মূর্খরা তো এই তস্করদের চাপাতির নিচে তাদের কল্লা গর্দান এগিয়ে দেবেই।
(২) বরকত সাদিক কথাগুলো বলছিলেন ফিসফিস করে। কারণ বাগদাদীর এজেন্টরা কড়া নজরদারিতে রাখে তাদের শিকারদের। সত্য বলে দিতে দেখলে ওই বক্তাকে পিটুনি দিতে তারা প্রস্তুত। চা-নাশতা খেয়ে তিন ভাই পরীর আসরে হাজিরা দিতে বাগদাদী বাড়িমুখো হতেই তাদের পিছু নেয় মাঝবয়সি দুই ব্যক্তি। তাদের প্রশ্ন, বরকত স্যারের লগে আমনে গো কী কথা হইল? উত্তরে তাদের বলা হয়, কী কথা হয়েছে সেটা আপনাদের জানাতে হবে কেন, মাঝবয়সিদের একজন বলে, বরকত প্রফেসার সব সময় মুফতি হুজুরের বদনাম করেন। হাতেনাতে ধরতে পারলে উনারে একটু পালিশ করতাম আরকি!
(৩) গাঢ় রং কাচের শিশি ভর্তি তরল ওষুধ, লেভেলে লেখা-মেড ইন ইউএসএ। অন্ধকার ঘরে বসা আসরে সুমিষ্ট গলায় পরী বলে, মুফতি সাহেব, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এই ওষুধ এনেছি। রোগীকে রোজ রাতে দুই চামচ খাওয়াবেন। ভুলেও যেন তিন চামচ না খায়। খেলে কিন্তু লাইফ খাল্লাস।
(৪) বাগদাদী-নিয়ন্ত্রিত পরী যে ওষুধ দিয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি নয়। ওটা ছিল পাবনায় স্থাপিত নামি এক কোম্পানির ওষুধ, যার মূল লেভেল উঠিয়ে সেখানে সাঁটানো হয় জাল লেভেল। এক ডোজ খেয়েই নকল বুঝতে পেরে বাবা শিশিটি নর্দমায় ছুড়ে ফেলেছেন।
দৃশ্যমান বন্দিত্ব : বাড়ি গিয়ে (জুন, ১৯৭৭) সোলেমান আলীকে ডেকে আনি। তাকে বলি, মুফতি জুবায়ের হাসান বাগদাদী খুবই গুণী মানুষ। তাঁর পরীর দেওয়া ওষুধ খেয়ে বাবা উপকার পেয়েছেন। তাঁকে কি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে। সোলেমান বলে, কোনো সমস্যা না। বাগদাদী হুজুর জমির মামলায় হাজিরা দিতে আগামীকালই শহরে আসছেন। কাল বিকালেই হ্যাতেনরে আমনে গো বাড়িত লই আমু।
কথা রেখেছে সোলেমান। যথাসময়ে বাগদাদীকে আমার সামনে হাজির করেছে। কালো জোব্বা পরা মধ্য উচ্চতার সুঠামদেহী প্রায় ৬০ বছর বয়সি গাল ভর্তি লম্বা দাড়িসমেত হাস্যমুখ মানব একখানা। পরিচয়পর্ব শেষে বললাম, তিন হাজার টাকা ফেরত দিন। বাগদাদী বলে, আশ্চায্য কথা! একটু আগে কইলেন ওষুধ খাইয়া আব্বাজানের উবকার অইছে। আর এখন টাকা ফিরত দাবি করতেছেন। আমাদের এক ভাগ্নে আবদুল হালিম বলে, হ্যাঁ, নানাজান উপকার পাইছেন। বুঝদার হওনও এক ধরনের উপকৃত হওয়া। আমনের ভুয়া পরীর ভুয়া ওষুধ খাইয়াই তো উনি বুইঝা ফেলছেন আমনে একটা ফোরটুয়েন্টি দ্বিগুনা আটশ চল্লিশ।
কথিত দাওয়াইবাহক পরীর কুহক রচনায় দক্ষ সোলেমান আলী আপত্তি জানায়, না মামু এরকুম করে না। এত বড় গুনিনরে এভাবে অপমান করলে উনার পরী রাইগা যাবে। পরীর বদ নজরে পড়লে আপনে গো সব্বনাশ হয়া যাবে। হাকিম বলে, অ! সব্বনাশ হবে? এতক্ষণ তো মামলা গোপনে চলছিল। এখন ওপেন টু অল কইরা দিতাছি। গুনিনরে পিছমোড়া হাত বাইন্দা চিৎ করে রাখব। দেখি গুনিনের পরী কী অ্যাকশনে যায়।
গুনিন বলে, ভাইগো ভাই, একটু মেহেরবানি করেন। সময় দেন। তিন দিনের মধ্যে টাকা দিয়া দিমু। আমি বললাম, হাকিম! কাজ শুরু করে দাও। হাকিম খাতাকলম নিয়ে আসে। বাগদাদীকে বলে, নেন আপনার বউর কাছে চিঠি দেন। সোলেমানের হাতে যেন ৩ হাজার টাকা দেয়। বাগদাদী চিঠি লিখল। সোলেমান জগৎপুর রওনা দেয় সাইকেলে। এদিকে পিছমোড়া হাত বেঁধে বাগদাদীকে চেয়ারের সঙ্গে দৃশ্যমান করে বেঁধে রাখা হয় রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত।
আমরা ভয়ে ভয়ে ছিলাম কখন না জানি বাগদাদীর পোষা পরী এসে আমাদের আছাড় মারে। দেখলাম, পরী রাগ করেনি। পরীরা নিজেরা দৃশ্যমান থাকে না, তাদের রোষ তো দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ ছিল। হলো না কেন?
শব্দশক্তির ধাক্কা : অফিসে ওভারটাইম শ্রমদান বাবদ সাড়ে ৫ হাজার টাকা পাবেন আদিনাথ চক্রবর্র্তী; যাকে তাঁর সহকর্মীরা ভক্তিবশত ‘এএনসি দাদা’ বলে ডাকেন। বিল পাস হয়ে গেছে দুই মাস প্রায়, অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রমোদ কুমার বিশ্বাস ওভারটাইম বিল দিচ্ছি দিচ্ছি করে দিচ্ছেন না। বেলা এগারোটায় চাইলে বলেন, লাঞ্চের পর আসুন। লাঞ্চের পর গেলে বলেন, স্যরি! ক্যাশ একটু কম আছে। কাল লাঞ্চের পরে আসুন।
‘আসুন/আসুন’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা এএনসি দাদার। যে কামরায় প্রমোদ বিশ্বাসের রাজত্ব সেই কামরায় তাঁর অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী বসে তেরোজন। তাদের মধ্যে অন্যতম অফিস একজিকিউটিভ খুরশিদা আলম। খুরশিদার টেবিল প্রমোদের টেবিলের পাঁচ ফুট দূরে। তাই খুব সহজেই এএনসি-প্রমোদ সংলাপ তাঁর কানে ধাক্কা মারে।
খুরশিদা জানান, সেদিন ছিল বুধবার। লাঞ্চ শেষে প্রমোদ স্যার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে পান চিবোতে চিবোতে সিগারেট ফুঁকছিলেন। এমন সময় কামরায় এএনসি দাদার প্রবেশ। প্রমোদের মুখোমুখি বসে তিনি বলেন, বিশ্বাস মশয় শইলখান ভালানি? প্রমোদ বিশ্বাস বলেন, নারায়ণের কৃপায় আছি মোটামুটি। আপনি কেমন চক্কোত্তি দা? আদিনাথ চক্রবর্তী বলেন, ভালোই থাকতাম যদি টাইমলি ওভারটাইমটা পাইয়া যাইতাম। তা তো নারায়ণ দিতাছেন না। নারায়ণের কথা বাদ দেন। আপনেও তো চরংবরং করতেছেন।
এ পর্যন্ত বলবার পর এএনসি তাঁর কণ্ঠস্বর খুব নিচুমাত্রায় নামিয়ে বললেন, কেস্্ কী? টাকাটা দেন না ক্যান্? টাকা গুলান কি আপনের বাপের?
গর্জে ওঠেন প্রমোদ, এটা ভদ্রলোকের ব্যবহার! বাপ তুলে কথা বলছেন। বাপ তুলে কি আমি কিছু বলতে পারি না মনে করেন? উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকেন তিনি। এএনসি অনুত্তেজিত গলায় নিচু গ্রামে আওয়াজ দেন, খাড়াইলি ক্যান্্? বইসা পড় কইলাম। আমার হাতে কী দেখেছিস! পেপারওয়েট। মারব ছুড়ে ফাটবে তোর টাক।
দেখলে, দেখলে? আমারে অ্যাসল্ট করবে হুমকি দিচ্ছে! চিৎকার করেন প্রমোদ। কামরার শ্রোতারা সবাই নীরবে নরমভাষী এএনসির পক্ষে চলে যায়। আহারে! প্রমোদবাবুর তর্জনগর্জন সত্ত্বেও দাদার কি চমৎকার সহিষ্ণুতা! খুরশিদা আলম বলেন, বিনা পয়সায় এমন আমোদময় দৃশ্য এর আগে উপভোগ করিনি। ঘটনার পরদিনই বিলের টাকা পেয়ে গেলেন আদিনাথ চক্রবর্তী।
মধু দিয়ে তেতো : দৃশ্যমান সুন্দরের নিচে অসুন্দরকে লুকিয়ে রাখার কৌশলকে তুলনা করা যায় তেতো আড়াল করা মধুর সঙ্গে। যাদের চরিত্র আগাগোড়া পরশ্রীকাতরতায় মোড়া তারা অন্তরের বিষ গোপন রেখে মুখে ছড়ায় জুঁই-চামেলীর সুবাস। এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক এম জে আকবর (ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) বলিউডের বিখ্যাত দুই চিত্রনায়িকার বৈরী সম্পর্কের বিবরণ দেন। এরা হলেন বেটি ডেভিস (জন্ম : ৫ এপ্রিল ১৯০৮, মৃত্যু : ৬ অক্টোবর ১৯৮৯) ও জোয়ান ক্রফোর্ড (জন্ম : ২৩ মার্চ ১৯০৬, মৃত্যু : ১০ মে ১৯৭৭)।
অভিজাত এক হোটেলে চিত্রজগতের লোকদের পানভোজন উৎসব চলছিল। রাত দশটায় খবর আসে হৃদরোগে আক্রান্ত জোয়ান ক্রফোর্ড মারা গেছেন। অতিথিরা শোকস্তব্ধ হয়ে গেলেন। সবার চেহারায় বিষণ্নতা। ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু একজন। তিনি বেটি ডেভিস। প্রতিক্রিয়া জানার জন্য রিপোর্টাররা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। বেটি বলেন, ‘মৃতজন সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা অনুচিত। বলতে হয় শুধু ভালো। তাই বলছি, জোয়ান ক্রফোর্ড আর বেঁচে নেই। ভালোই।’
লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন